প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজীবের মৃত্যু: দুই বাস ও হাসপাতালকে দায়ী করে প্রতিবেদন

বিডি নিউজ: সাত মাস আগে রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় হাত হারানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলেজছাত্র রাজীব হোসেনের মৃত্যুর জন্য স্বজন পরিবহন, বিআরটিসি ও শমরিতা হাসপাতালকে দায়ী করেছে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত কমিটি।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের এই দায় নিরূপণ কমিটির প্রতিবেদন রোববার বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাই কোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়।

সোমবার হাই কোর্ট আদেশে বলেছে, এ বিষয়ে গত মে মাসে জারি করা রুলের ওপর আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে শুনানি শুরু হবে।

দায় নিরূপণ কমিটির প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজলও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

চলতি বছরের ৩ এপ্রিল বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হাসানের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ৪ এপ্রিল হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৮ মে হাই কোর্ট এক আদেশে রাজীবের পরিবারকে কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি রুল জারি করে।

এক মাসের মধ্যে দুই বাসের (বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহন) কর্তৃপক্ষকে ২৫ লাখ করে ৫০ লাখ টাকা দিতে বলা হয় হাই কোর্টের আদেশে।

ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহন। পরে ২২ মে আপিল বিভাগ ওই আদেশ স্থগিত করে হাই কোর্টকে দুর্ঘটনার দায় নিরূপণ করতে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে সিভিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ‘‘বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের বাসের চাপায় কীভাবে রাজীব হাত হারিয়েছেন সেই বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ দুর্ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী তা চিহ্নিত করা হয়েছে।”

আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “যে প্রতিবেদন কমিটি দাখিল করেছে, তাতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে- ওই পরিণতির জন্য তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের কোনো দায় কমিটি পায়নি। দ্বিতীয়ত, বিআরটিসি ও স্বজন পরিহনের দুই বাসের চালকদের ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স ছিল না।”

কমিটির প্রতিবেদনে শমরিতা হাসপাতালকেও দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, শমরিতা হাসপাতাল দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারেনি। তাদের কিছু ‘অবহেলা’ ছিল।

কাজল বলেন, “দায়ীদের জরিমানা করার পাশাপাশি সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শৃঙ্খলায় আনার জন্য কিছু সাধারণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কমিটির প্রতিবেদনে। চূড়ান্ত রুল শুনানিতে এসব বিষয় আসবে।”

৪৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে এ দুর্ঘটনার জন্য স্বজন পরিবহনের চালকের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করে বলা হয়েছে, “হালকা বাহন চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার পরও স্বজন পরিবহন ওই চালককে নিয়োগ করায় রাজীবের মৃত্যু ও দুর্ঘটনার মূল দায় মূলত স্বজন পরিবহনেরই।

“এছাড়া হালকা বাহন চালানোর লাইসেন্স থাকার পরও চালককে বিআরটিসি ডাবল ডেকার বাস চালানোর অনুমোদন দেওয়ায় এই দুর্ঘটনার দায় কিছুটা বিআরটিসিরও। বিআরটিসির বিদ্যমান লিজভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় গণপরিবহনে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।”

দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চালক নিয়োগ করে গণপরিবহন চালানো এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছে দায় নিরূপণ কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আহত রাজীবের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ার পরও শমরীতা হাসপাতাল তার চিকিৎসায় সময় ক্ষেপণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) ‘গোল্ডেন আওয়ার রুলস’ অনুযায়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে সঙ্কটাপন্ন রোগীর অস্ত্রোপচার করার নিয়ম রয়েছে। কারণ সঙ্কটাপন্ন রোগীর জীবন-মরণ ওই এক ঘণ্টার ওপর অনেকটা নির্ভর করে।

“শমরীতা হাসপাতাল রাজীবের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযথা সময় নষ্ট করেছে; সে কারণে শমরীতা হাসপাতাল রাজীবের মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।”

প্রতিবেদনে রাজধানীর গণপরিবহণ ব্যবস্থার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে, ঢাকার জনসংখা প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ। তার বিপরীতে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বাহনের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ; যা মোট যানবাহনের ৭৪ শতাংশ।

এছাড়া ঢাকার তিনশর মত রুটে ৩ হাজার ৮০০ মালিকের প্রায় ৫ হাজার গণপরিবহন চলে; যা মোট যানবাহনের ০.৫ শতাংশ।

বেপরোয়া গাড়ি চালনা রোধে কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, “দৈনিক বা ট্রিপ ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দ্রুত নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কোম্পানির অধীনে চালক নিয়োগ করতে হবে।”

চলাচলকারী গণপরিবহনের রুট পারমিটের ক্ষেত্রে ‘ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেম’ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সেখানে বলা হয়েছে, “অনুমোদিত চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোকে একটি কোম্পানির অধীনে এনে ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেমে রুট পারমিট দিতে হবে। প্রত্যেকটি রুটের কালার কোড থাকলে বাস কোম্পানি ও পরিবহনের চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযেগিতা ঠেকানো যাবে।”

রাজধানীতে গণপরিবহনের, বিশষ করে ব্যক্তি মালিকানা বা সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসির বাসগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনের বলা হয়, ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকার পরও অনেক বাসেই ইন্ডিকেটর, উয়াইপার, হেডলাইট, টায়ার, বাসের দরজা-জানালা এবং অবস্থা ভয়াবহ।

সুপারিশে বলা হয়েছে, কোনো বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকলেই চলবে না, সেফটি ফিচারগুলো রঙ করা থাকতে হবে। ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো যানবাহনই চলতে দেওয়া উচিৎ না।

কমিটি বলেছে, বাস চলার সময় দরজা অবশ্যই বন্ধ রাখতে হবে। নির্ধারিত স্টপেজে থামার পর বাসের দরজা খুলতে হবে। বাস চলার সময় কোনো যাত্রীকে দরজার সামনে দাঁড়াতে দেওয়া উচিৎ না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক রুটের বাস স্টপেজ বা ‘বাস বে’ গুলোর পরিচিতি থাকা উচিৎ। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই যাত্রী ছাউনি স্থাপন করতে হবে। ছেড়ে যাওয়ার সময় বা চলতি অবস্থায় যাত্রী ওঠা-নামা করা বন্ধ করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশকে কঠোরভাবে তা পালন করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে দুর্ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা, বিশ্লেষণে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা হয় না বললেই চলে। সীমিত যোগান নিয়ে এআরআই বিজ্ঞানসম্মতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার গবেষণা, বিশ্লেষণ, তদন্তের কাজগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করে যাচ্ছে। এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।”

এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা তদন্তে পুলিশ, বিআরটিএ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, এআরআই, নিরাপদ সড়ক চাইয়ের মত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টেকনিকেল টিম রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি। সেই টিমের জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের যোগান দিতে হবে। বড় দুর্ঘটনা তদন্তে এই টিম কাজ করবে। দুর্ঘটনার পরপরই দ্রুততার সঙ্গে এই টিমকে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হবে এবং তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

চালকদের প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স ব্যবস্থানা সংক্রান্ত সুপারিশে বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার মানদণ্ড কী হবে তা বিআরটিএ’র ড্রাইভিং স্কুলকে নির্ধারণ করতে হবে। সে মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলে কাউকে ড্রাইভিং পারদর্শিতা পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া উচিৎ না।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পথচারী, সাইকেল আরোহী, রাস্তার চিহ্ন, রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুন ও অন্যান্য রাস্তা ব্যবহারকারী প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’র মত তাত্ত্বিক বিষয় যুক্ত করতে হবে। বিআরটিএর উদ্যোগে বুয়েট চালকদের তাত্ত্বিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে।

এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় পড়া মানুষের জন্য সরকারকে একটি জরুরি ‘ট্রমা ব্যবস্থাপনা নীতি’ প্রণয়ন করার এবং তাতে চিকিৎসা ও আর্থিক ব্যায়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রাখার সুপারিশ করেছে দায় নিরূপণ কমিটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ