প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে বিএনপি?

বিভুরঞ্জন সরকার : নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে চলছে নানা রকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। জাতীয় ঐক্য, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ইত্যাদি বিভিন্ন নামে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঐক্য গড়তে গিয়ে অনৈক্যের ঘটনাও ঘটছে। সরকারবিরোধীরা তৎপর হওয়ায় সরকারও নিষ্ক্রিয় নেই। বিএনপি’র দলভারী করার চেষ্টায় সর্বশেষ অগ্রগতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন। এই ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি যেমন আছে, তেমনি আছে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার ঐক্য প্রক্রিয়া এবং কামাল হোসেনের গণফোরাম। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা এই ফ্রন্টে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে; তারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। কামাল হোসেন, রব, মান্না – সবাই সাবেক আওয়ামী লীগার। এরা এখন বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়তে কোনো অস্বস্তি বোধ করছেন না। কামাল হোসেন তার বক্তৃতায় বারবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করছেন। উপস্থিত বিএনপি নেতারা কি তাতে খুব স্বস্তিবোধ করছেন? তিনি বলতে পারেন যে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এক নয়। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা থেকে বর্তমান আওয়ামী লীগ বিচ্যুত হয়েছে।

তার এই বক্তব্য সত্য বলে ধরে নিলে প্রশ্ন আসে; ড. কামাল কি মনে করেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি চলবে বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে? বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন করবে বিএনপি? ড. কামাল অনেক উঁচু মাপের আইনজীবী হতে পারেন কিন্তু তাকে খ্যাতিমান করে তোলার পেছনে আওয়ামী লীগের অবদান বেশি। আওয়ামী লীগে থেকেই তিনি কামাল হোসেন হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে তিনি তো চেষ্টা করে দেখলেন, পারলেন কি তার দল গণফোরামকে কোনো গণভিত্তি দিতে? শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে হারাতে না পেরে কামাল হোসেনের মধ্যে যে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একটি বিদ্বিষ্ট মনোভাব তৈরি হয়েছে, সেটাই তাকে বিএনপির কাছাকাছি যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

শেখ হাসিনার প্রতি নানা কারণে ক্ষোভ-অভিমান-জ্বালা-যন্ত্রণায় যারা জর্জরিত, মূলত তাদের একটি মিলনকেন্দ্র হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। যারা মনে করছেন, এই ফ্রন্ট সরকারবিরোধী একটি কার্যকর প্লাটফরম হিসেবে কাজ করবে, তারা রাজনীতির অ আ ক খ-ও বোঝেন না। সুবিধাবাদী, দলছুট কিংবা বারবার দল বদলকারীদের আহ্বানে মানুষ সাড়া দেবে না। যদি কামাল হোসেন, মান্না, রবদের উদ্দেশ্য সৎ হতো, তাহলে তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করতে চাইতেন না। ভালো শাসনব্যবস্থা বা সুশাসন উপহার দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়, তারা চান যেকোনো মূল্যে শেখ হাসিনাকে সরকার থেকে নামিয়ে দিতে।

সরকার বদলের নিয়মতান্ত্রিক উপায় নির্বাচন। গণআন্দোলনের মাধ্যমেও সরকার বদল করা যায়। তবে সেটা হতে হয় ক্ষমতা জবরদখলকারী স্বৈরাচারী সরকার। আমাদের দেশে কেউ কেউ এখন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেও ‘স্বৈরাচারী’ সরকার বলে এক ধরনের তৃপ্তি পেয়ে থাকেন, আনন্দবোধ করেন। কেন তারা এটা করেন? এর একটি কারণ হতে পারে, গত নির্বাচনটা ভালো হয়নি। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ১৫৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আবার বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করার নামে দেশজুড়ে সন্ত্রাস-সহিংসতা চালানোয় মানুষ ভোটকেন্দ্রেও উপস্থিত হতে পারেনি। ফলে একটি ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনকেও আমরা মেনে নিয়েছি গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতার স্বার্থে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও শেখ হাসিনার সরকারকে হরেদরে আইয়ুব-ইয়াহিয়া-জিয়া-এরশাদের মতো ‘স্বৈরাচারী’ সরকার বলা যায় না। আওয়ামী লীগ একটি জনসমর্থনপুষ্ট দল। এই দলের শিকড় এদেশের মাটির গভীরে পোঁতা। বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে এই দলের সমর্থক। এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাজেই বিতর্কিত নির্বাচন করলেও এই দলের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না। মানুষ জানে, গত নির্বাচনটা ভালো না হওয়ার দায় অনেকাংশেই বিএনপির। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে রাজনীতির চিত্র পাল্টে যেত।

দেশের এক অংশের মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির চাহিদা আছে। কিন্তু উপযুক্ত, বিশ্বস্ত ও সাহসী নেতৃত্বের অভাবে সেটা হচ্ছে না বা হয়ে উঠছে না। কামাল হোসেন বা বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সামনে রেখে মা. র. মান্না যে ঐক্যউদ্যোগ নিয়েছেন; তার বড় দুর্বলতা হলো, এরা সবাই জনবিচ্ছিন্ন এবং অবিশ্বস্ত হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত।

সব মিলিয়ে এটা বলা যায় যে , জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সরকার বা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং এই জোট মাঠে গড়ালে বিএনপির সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংকট বাড়বে। কামাল-রব-মান্নার খরবদারি বিএনপির নেতা-কর্মীরা মেনে নেবেন, এতোটা ‘সুশীল’ তারা হলে দেশের রাজনীতির চেহারা এখনকার চেয়ে ভালো হতো। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় বিএনপিকে অনেক প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। কামাল হোসেন ও তার সহযোগীদের সম্পর্কেও আছে অনেক প্রশ্ন। দুই মাসে অন্তহীন প্রশ্নের জবাব দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট সামনে আগাবে বলে অনেক রাজনৈতিক-বিশ্লেষকই মনে করেন না। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব