প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এই রায়ের পরও কি বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকবে?

চিররঞ্জন সরকার : একুশে আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন।

তবে তাতে নিহত হন আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন শতাধিক। অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি।

এই গ্রেনেড হামলার দায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসির আদেশ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সেদিন পরিকল্পিতভাবে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়েছিলো, তা কেবল একা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার লক্ষ্যেই নয়, সমগ্র জাতির স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে অন্ধকারে নিক্ষেপের এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে।

এই মামলার পর্যবেক্ষণে আদালত যথার্থই বলেছেন, রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? এই রাজনীতি দেশের জনগণ চায় না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে?

এই প্রশ্নটি আজ দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষের কাছেই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এরপরও কি আমরা বাংলাদেশে যারা হত্যার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যারা এই দলগুলোর সঙ্গে জোট করছে, তাদের সমর্থন করে যাব? এ কথা এখন দিনের আলোর মত পরিষ্কার যে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যেমন আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবার ও জেলখানায় চার শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল, ২১ আগস্টও তেমনি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য হামলা চালানো হয়।

ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এমন হামলার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। বনানীর হাওয়া ভবন ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির ৫/এ সড়কের ৬১ নম্বর সরকারি বাসভবনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা হয়, যা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই হাওয়া ভবন। এখান থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বড় ছেলে ও বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

রায়ে বলা হয়েছে, তারেক রহমান এই হাওয়া ভবনে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। হামলার আগে পিন্টুর বাসভবনে দফায় দফায় হামলার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক হয়। হামলার ব্যাপারে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক, বাবর ও পিন্টু। আসামিদের জবানবন্দি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত এ রায় দেন।

এই মামলায় খালেদা জিয়া রেহাই পেলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। ‘একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিলো আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল। আমরা অপরাধীকে চিহ্নিত করেছি। মূল আসামি জজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ ২০০৫ সালের ১১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই বক্তব্য যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্ভেজাল মিথ্যাচার, তা আদালতের রায়ে প্রমাণ হয়েছে।

প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকে সে সময়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কোনো তদন্ত করতে নিষেধ করেছিলেন। তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার পছন্দের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের দিয়ে ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত করতে বলেছিলেন। তাহলে এই মামলা থেকে খালেদা জিয়া বাদ পড়লেন কীভাবে? খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বয়ং এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন। অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। তারপরও কী খালেদা জিয়া এই ঘটনায় মাফ পেয়ে যাবেন?

আমরা দেখেছি, ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পক্ষ থেকে এমন অবিশ্বাস্য কথাও প্রচার করা হয়েছিল যে আওয়ামী লীগ নিজেরাই জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন পেতে ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, গ্রেনেড হামলা এমনভাবে করা হয়েছে যেন শেখ হাসিনা বেঁচে যান এবং জোট সরকারকে একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা যায়।

২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদেও জোট সরকারের এমপিরা ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে ব্যর্থ হয়ে এখন নৈরাজ্যের মাধ্যমে তারা (আওয়ামী লীগ) ক্ষমতায় যেতে চায়। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ঘটানো হয়েছে। তখন বিএনপি ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতিও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিল।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশবাসীকে এটা বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেছিল যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছে। কলকাতায় পলাতক শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের পরিকল্পনায় ১৪ জনের একটি দল এই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। চারদলীয় জোট সরকার ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে ওই সব মিথ্যা তথ্য জোট সরকারের সমর্থক পত্রপত্রিকায় প্রচারও করা হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমর্থক লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা সভা-সেমিনারে একই সুরে বক্তব্য দিয়ে, পত্রিকায় কলাম লিখে সেই মিথ্যা প্রচারে সহায়তাও করেছিলেন। জোট সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তখনকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ ধরনের মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন, প্রচার করেছিলেন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর, সশস্ত্র বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের দেড় বছরে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনার নেপথ্যের অনেক তথ্যই বেরিয়ে এসছে। সর্বশেষ আদালতের রায়ের মাধ্যমে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার জেনেশুনে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটনা ঘটিয়েছিল এবং উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী ও প্রকৃত আসামিদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল।

বিএনপির নেতারা এখন গণতান্ত্রিক রাজনীতির নামে মায়াকান্না কাঁদেন। কিন্তু একুশে আগস্টের এই কলঙ্ক থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন? সভ্যজগতে কোনো সরকার বা দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য এমন বর্বর পন্থাকে মদদ জোগাতে পারে তার উদাহরণ বিরল।

বিএনপি কি এরপরও রাজনৈতিক দল হিসেবে বহাল থাকবে? নেতাকর্মীরা এই দলকে আঁকড়ে পড়ে থাকবেন? ভারতে হিন্দু মহাসভার মতো শক্তিশালী দল মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত হয়ে শুধু বেআইনি দল হওয়া নয়, দেশের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশে যে দলটি ক্ষমতায় থাকার সময় প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাসহ গোটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে যে দলটি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী এরপরও বহাল থাকবে?

২১ আগস্টের মতো ভয়ংকর ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের এই ভূমিকাকে আদালতের রায়ে আবারও নতুনভাবে প্রমাণ হয়েছে। দেশের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে? এ ঘটনা বিএনপির বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে। বিএনপির সঙ্গে জোট করে আগামীদিনের রাজনীতিতে কারা এই কলঙ্কের ভাগীদার হতে চান-এখন সেটাই দেখার বিষয়!

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।
সূত্র : বার্তা২৪.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত