প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যতো বড় নগর, ততো বেশি নিঃসঙ্গতা এবং বন্ধুহীনতা

আবেদীন কাদের : নিউইয়র্ক নির্মম নিঃসঙ্গ অনন্ত বেদনার এক কসমোপলিটান শহর। আমি এশহরে গত আড়াই দশক ধরে ভীষণভাবে একাকীত্ব বোধ করি, এবং নিঃসঙ্গতা আমাকে আজ বহুদিন ধরেই গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করে। আমার নিঃসঙ্গতা কিছুটা হলেও আমার বন্ধুরা নিরাময়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটা আমার জন্য দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধি, নিরাময়ের অতীত, তাই আমি শত ক্ষরণের মাঝেও এটা নিয়তি ভেবেই নিজেকে নিজের কাজে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছি!

আমি জন্মেছিলাম একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ে। আমার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘দ্বীপান্তরের গান’ এর ভূমিকা লিখতে গিয়ে নিজের গ্রাম ও তার অতি পশ্চাৎপদতার বয়ানে আশঙ্কার সুর বেজেছিল, লিখেছিলাম হয়তো আগামী পঞ্চাশ বছর সেখানে বিদ্যুতের আলো জ্বলবে না। বইটিতে কয়েকজন ল্যাটিন আমেরিকান লেখকের ওপর প্রবন্ধ ছিলো, সেটার মুদ্রণ ও প্রুফ সংশোধনের জন্য সাহায্য নিয়েছিলাম আজকের বিখ্যাত কবি-প্রাবন্ধিক-অনুবাদক বন্ধু রাজু আলাউদ্দিনের। তিনি আমার সেই শঙ্কার বাক্য দেখে ভ্রু তুলেছিলেন, আমার অহেতুক দুশ্চিন্তা দেখে। সেটা মাত্র সেদিনের কথা, ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর। সত্যিই আমার ধারণা অমূলক ছিলো, আজ সেই শরীয়তপুরের নিভৃত গ্রামে অনেক ‘আলো’ এসেছে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে কলকাকলিতে মুখর করে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতির মতো। সেই নিভৃত গ্রামে আমি কাটিয়েছি জীবনের প্রথম এগারো বারো বছর। তারপর প্রায় আড়াই দশক ‘তিলোত্তমা’ ঢাকা নগরীতে। ঢাকার গ্রাম্যতা-মেশানো নাগরিকতা আমার রক্তে দোলা দিয়েছে, আমাকে ‘পশ্চিমমুখী’ করে তুলেছে আশৈশব। ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল, ঢাকা কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরিজীবন সব মিলিয়ে আড়াই দশকের বেশি সময়ে আমাকে কাদা থেকে তুলে মূর্তির রূপ দিয়েছে ভিন্ন আলোতে। ঢাকার পরই আমার প্রিয় শহর কলকাতা। আমি বার বার ফিরে যেতাম কলকাতায় বইপত্র ঘাঁটতে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, শারীরিক বৈকল্যের চিকিৎসা নিতে। তখনও, মানে ছত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত, বেশি সংখ্যক পশ্চিমা নির্মম নগর দেখা হয়নি। চলে এলাম নিউইয়র্ক। এসেই এর দুর্ভেদ্য প্রেমে পড়েছিলাম এর নাটক, অপেরা, লাইব্রেরি, মুজিয়াম, মননশীল পত্রপত্রিকা আর আমার অসাধারণ সব শিক্ষকদের জন্য। এশহর আমার দুর্দান্ত প্রিয় শহর। আমি একে ছেড়ে চলে যাবো নিশ্চয় একদিন মায়ের কাছে, কারণ এই দুইয়ের টান দুর্দমনীয়, কিন্তু মায়ের নৈকট্যই আমার কাম্য এই গোধূলি বেলায়। নিউয়র্কে পৌঁছানোর দিন কয়েক পরই আমার প্রিয়তম মানুষ প্রিয়তম লেখকদের একজন হাসান ফেরদৌস গাড়ি চালিয়ে কথাশিল্পী বন্ধু আনোয়ার শাহাদাতের উডসাইডের বাড়ি থেকে তার কুইন্সের ভিলেজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে বলছিলেন কেন নিউইয়র্ক তার প্রিয় শহর! আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের দুজনের চাহিদা, বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা প্রায় কাছাকাছি। সে কারণেই এ শহর হাসান ভাই, বন্ধু সৈয়দ শহীদ আর আমার এতো প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। নিউইয়র্কের বৈচিত্র্য বোঝাতে গিয়ে হাসান ভাই আমাকে বলেছিলেন এশহর সবচেয়ে প্রিয় হতে পারে আমাদের প্রিয় কবি বেলাল ভাইয়ের। কারণ তার মনোজগৎ নিউইয়র্কের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। জানি না কেন হাসান ভাই সেদিন সেটা বলেছিলেন, হতে পারে বেলাল ভাইয়ের মনের ঝোঁক বা স্বভাবের নাগরিক বাউলতার জন্য। সে আজ প্রায় পঁচিশ বছর আগের এক ডিসেম্বরের শীতের রাতে সারাটা নির্ঘুম সময় রানু ভাবিকে কষ্ট দিয়ে আমি হাসান ভাই ও ভাবি এন্তার সাহিত্য রাজনীতি আরও বহু অর্থহীন বিষয়য়ের মাঝে অর্থ খোঁজার আড্ডায় কাটিয়েছিলাম। সে এক দুর্মর বন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষুধার সময় ছিলো আমাদের। আমি হাসান ভাই, আনোয়ার সেনটুদা, জেসমিন শীলু, শাহীন, গালিব, রানু ভাবি, পূরবীদি, জ্যোতিদা, মীনাক্ষীদি-জ্যোতিদা কতো সন্ধ্যায় বাংলা কবিতা নিয়ে বাংলার রাজনীতি নিয়ে অকারণ হুল্লোড়ে মেতেছি। আজ মনে হয় এই প্রায় তিনটা দশকের কাছাকাছি সময় হুট করে চলে গেলো।

যে কারণে আজ এই কথাগুলো মনে পড়লো তা হলো, এই দীর্ঘ সময়ে কতো মানুষের এবং কতো অমানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, মানুষরূপী লম্পট চ-াল অসভ্য বর্বর দুএকজনও আমাদের কারো কারো জীবন সামান্য সময়ের জন্য বিষাক্ত করেছে। আমার প্রিয় বন্ধু সৈয়দ শহীদ স্বল্পবাক মানুষ, কতো সাবধান করেছেন, শুনিনি, অকারণে অনেক তুচ্ছ বর্বরকে প্রশ্রয় দিয়েছি। নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি তাদের সময় দিয়ে। আজ ভাবতে কষ্ট হয়। কারণ গত কয়েকটি মাস দক্ষিণ বাংলার এক বর্বর অশিক্ষিত লম্পট কী ভয়াবহভাবেই না আমার ভেতরটাকে রক্তাক্ত করেছে মিথ্যাচার দিয়ে! আমি তাকে নিয়ে, আমার দুই বান্ধবী, যাদের একজন লঙ আইল্যান্ড ও অন্যজন ভূতপূর্ব নিউইয়র্কবাসী, বর্তমানে ঢাকায়, বিখ্যাত আবৃত্তিকার, তাদের সঙ্গে এই লম্পটের নিদারুণ লাম্পট্য নিয়ে অবশ্যই লিখবো, কিন্তু এই অসহনীয় অর্থহীন সময় অপচয় নিয়েও ভাবি। কিন্তু তারপরও এশহর, এই তিলোত্তমা নিউইয়র্ক আমাকে সত্যিকার অর্থেই অনেক দিয়েছে। অসাধারণ কয়েকজন শিক্ষক, কিছু সহপাঠী, কিছু বন্ধু, যা এজীবনে ভোলার নয়। মেক্সিকোর হেকটার, মারিসল, মেলিসা, নিউয়র্কের রিচি, জাপানের ফুসাকো ও আইসল, ইরানের বাহার, তুরস্কের আরতুর, ব্রাজিলের লিলিয়ান ও সারজিও, এরা নিউ স্কুলের সহপাঠী। এদেরকে কোনদিন ভোলা যাবে না। ভোলা যাবে না আমার শিক্ষক পিটার পেরিসি, অ্যান্ডরু এঁরাটো, হোশে কেসানভা, চার্লস টিলি, নেন্সি ফ্রেজার, আনোয়ার শেখ, আলেন টওরেন, রিচারড বারন্সটেইনসহ আরও কতজন। সত্যিকার অর্থে আমি যদি সামান্য শিক্ষিত হওয়ার সুযোগও পেয়ে থাকি জীবনে, তাহলে আমি তা পেয়েছি নিউ স্কুলে ও সিটি ইউনিভারসিটির হান্টার কলেজের কয়েকজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সহযোগিতায় ও ক্লাসরুমের শিক্ষায়।

 

 

আজ হাজারটা কথা মনে পড়ছে এই পঁচিশ বছরের বিশাল শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়ানোর মুহূর্তগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে। নিজের নিউ স্কুল ছাড়া কলাম্বিয়া ও এনওয়াই ইউএর অসংখ্য সমাজবিজ্ঞানীদের সেমিনারে গিয়ে নীরব শ্রোতা হওয়া ছিলো আমার ছাত্রজীবন ও পরে শিক্ষক জীবনের এক আনন্দময় অভ্যাস। আমি আমার সময়কে তেমন অপব্যয় করিনি। গত পঁচিশটা বছর আমি সত্যিকার ভাবেই নিজেকে কিছুকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছি আমার সাধ্যমতো, হয়তো পারিনি। যদিও আমার মেধা অতি সামান্য, কিন্তু এশহর আমাকে দুহাতে দিয়েছে। আমি আমার সকল ভাইপো ভাইঝিদের বলি, এশহর দারুণ উদার, এদেশও। বিদ্যার্জনের জন্য সত্যি এশহর বা এদেশ উত্তম।

হ্যাঁ, এশহর আমাকে কয়েকজন বন্ধু দিয়েছে, যাদের কেউ কেউ আমার ঢাকার বন্ধু, কিন্তু তাদেরও আমি এশহরে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। তারা সোনালি হৃদয়ের মানুষ, শিক্ষিত উজ্জ্বল দুর্লভ মানুষ, বড় বন্ধু। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় জ্যোতিদা, মানে জ্যোতির্ময় দত্ত, মীনাক্ষীদি, সেনটুদা, মানে চিত্রনির্মাতা মৃত্যুঞ্জয় রায়, হাসান ফেরদৌস, শাহীন খান, গালিব মাহমুদ, রানু ভাবি, জেসমিন, শীলু, শিবলী আজাদ, আদনান সৈয়দ, আহমদ মাযহার, রওশন জামিল, মিথুন আহমেদ ও আমার নিউ স্কুলের সব তীব্র তার্কিক বন্ধুরা। আমার দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে এদের সবার কাছে আমার ঋণ সীমাহীন।

আমি ‘আড্ডা’ নামক এক স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে ঢাকা এবং নিউইয়র্ক এই দুই শহরের বন্ধুদের অকুণ্ঠ অবদান বার বার আমার মনে পড়ছিলো, এদের সবাইকে আমার গভীর শ্রদ্ধা।