প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতায় বেড়ে উঠছে সেই বাঘশাবক

সমকাল: চোখ, কান, নাক- সবই সাদা। পুরো শরীরে সাদার মধ্যে কালো ডোরাকাটা। দেখতে অনেকটা বিড়ালের মতো, তবে এটি সাদা বাঘশাবক। এমন ব্যতিক্রমী একটি শাবকের জন্ম হয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। যেটি দেশে জন্ম নেওয়া প্রথম কোনো সাদা বাঘ। বাবা রাজ ও মা পরীর মমতায় আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছে শাবকটি।

এটি নিয়ে বর্তমানে পুরো চিড়িয়াখানায় সাজ সাজ রব। একনজর দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে ছুটে আসছেন চিড়িয়াখানায়- শিশু, তরুণ, বয়স্করাও। বন্যপ্রাণী ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাদার মধ্যে কালো ডোরাকাটা এমনবাঘের জন্ম খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। জন্ম নেওয়া প্রতি ১০ হাজার বাঘের মধ্যে একটি এমন হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ’ সাদা বাঘ রয়েছে। যার মধ্যে শ’খানেক রয়েছে ভারতে। উড়িষ্যা রাজ্যের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় রয়েছে ৩৪টি। সাদা লোমের জন্য এ ধরনের বাঘ দেখতে বেশ দৃষ্টিনন্দন।

সাধারণত দুটি কারণে যে কোনো প্রাণী সাদা রঙের হতে পারে। একটি হচ্ছে শ্বেতী রোগ, অন্যটি জিনগত কারণে। মানুষের শরীরে শ্বেতী রোগ হয়, বাঘেরও হতে পারে। তবে এ ধরনের রোগ হলে বাঘের গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকার কথা নয়। সাদা রঙ ও ডোরাকাটা দাগ থাকলে বুঝতে হবে এটি জিনগত কারণে হয়েছে। শরীরে সাদা লোমের কারণ হলো ফিওমেলানিনের অনুপস্থিতি। অন্যান্য রয়েল বেঙ্গল বাঘের লোম সাধারণত কমলা বা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। রয়েল বেঙ্গল ও সাদা বাঘের তুলনা হলো- সাদা বাঘ তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়, ওজনও হয় বেশি। জন্মের সময় কিছুটা বড় হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হয় মাত্র দুই থেকে তিন বছরে।

চিড়িয়াখানায় সরেজমিন দেখা যায়, শাবকটি কখনও দুই পা মাটিতে, দুই পা খাঁচায় দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। খাঁচার চারপাশে ঘোরাফেরা করে ফিরে আসছে আবার মায়ের কাছে, নীরবে দুধ পান করে। শাবকটির এদিক-ওদিক ছোটাছুটি দারুণভাবে উপভোগ করছে সবাই। মুঠোফোনে তার ছবি তুলতে কেউ ব্যস্ত, সেলফিও তুলছেন অনেকে। নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা জহুর তিন সন্তানকে নিয়ে এসেছেন চিড়িয়াখানায়। দীর্ঘক্ষণ সাদা শাবকের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। তিনি বলেন, ‘এক আত্মীয়ের কাছে সাদা বাঘশাবকের কথা শোনার পর থেকেই সন্তানরা এখানে আসার অধীর আগ্রহে ছিল। আজ আসার সুযোগ হয়েছে। সত্যি নিজ চোখে সাদা বাঘশাবক দেখার অনুভূতি অন্যরকম। সন্তানদের মতো আমিও অনেক খুশি।’ বাবার সঙ্গে আসা সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শ্রাবন্তী চৌধুরী বলে, ‘চোখ, কান, নাক সবই সাদা। পুরো শরীরে আবার সাদার মধ্যে কালো ডোরাকাটা। সবমিলিয়ে একেবারে অন্যরকম। শাবকটির এদিক-ওদিক ছোটাছুটি চমৎকার লাগছে।’

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘চিড়িয়াখানার টিকিট বিক্রির টাকা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়েছিল। সেই বাঘ দুটিই চট্টগ্রাম তথা সমগ্র দেশকে প্রথমবারের মতো একটি সাদা বাঘশাবক উপহার দিয়েছে। পুরো চিড়িয়াখানার চিত্র পাল্টে দিয়েছে এটি। আগামীতে বাইরের দেশ থেকে আরও কিছু প্রাণী আনা হবে।’ চিড়িয়াখানার সদস্য সচিব মো. রুহুল আমিন বলেন, “২০০৩ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে দুটি বাঘ আনা হলেও ২০০৬ সালে বাঘ ‘চন্দ্রা’ ও ২০১২ সালের অক্টোবরে একমাত্র বাঘিনী ‘পূর্ণিমা’ মারা যায়। এতে বাঘ ও বাঘিনীর খাঁচা দুটি শূন্য হয়ে পড়ে। প্রায় চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একজোড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়। দেশে এর আগে এ ধরনের বাঘের বাচ্চা জন্মের খবর জানা যায়নি।”

চট্টগ্রামের পাহাড়বেষ্টিত ফয়’স লেকের পাশে ছয় একর ভূমির ওপর ১৯৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় চিড়িয়াখানাটি। ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৩৩ লাখ টাকা দিয়ে দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়। পরে বাঘের নাম দেওয়া হয় ‘রাজ’, বাঘিনীর নাম ‘পরী’। বর্তমানে বাঘটির বয়স ৩৩ মাস ও বাঘিনীর ৩১। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্যানথার টাইগ্রিস’। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় আনার প্রায় আট মাসের মাথায় গত ১৯ জুলাই দেশের প্রথম সাদা বাঘশাবকটির জন্ম হয়। সঙ্গে আরও দুটি শাবকের জন্ম দেয় মা পরী। এর মধ্যে একটি জন্মের পরদিন মারা যায়। বেঁচে থাকা দুটির একটি হলো সাদা। ঝামেলাবিহীনভাবে বেড়ে তুলতে এই খবর গোপন রাখে কর্তৃপক্ষ। চিড়িয়াখানায় ৬৭ প্রজাতির তিন শতাধিক দেশি-বিদেশি পশুপাখি রয়েছে।

কী খাচ্ছে সাদা বাঘ :জন্মের পর থেকেই সাদা বাঘশাবকটি নিয়মিত মা বাঘিনীর দুধ পান করছে। ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই শাবকের প্রধান খাবারের তালিকায় থাকবে। পাশাপাশি মাকে দেওয়া গরু ও মুরগির মাংসও একটু একটু করে খাচ্ছে। মায়ের স্বাস্থ্যের বিষয়টি চিন্তা করে আস্তে আস্তে মাংস খাওয়ায় অভ্যস্ত করে তোলা হবে তাকে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ