প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে রাজনীতির লাভ-ক্ষতি

ড. তারেক শামসুর রেহমান: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে এ ফ্রদ্ধন্টের যাত্রা শুরু হয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এ কারণে যে, বিএনপি ২০ দলের বাইরে কয়েকটি ব্যক্তিনির্ভর দলকে একজোটে নিয়ে এসেছে। এ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ঐক্য হবে কি-না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। এর মধ্যে আবার বিকল্পধারা বেরিয়ে গেছে। যদিও বিকল্পধারার ঐক্যফ্রন্টের বাইরে থাকায় কোনো ক্ষতি হবে না বলেই আমার মনে হয়। কারণ একদিকে তাদের সে অর্থে সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আবার বিএনপির সঙ্গেও যে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ঐক্য হবে- সেটাও বলা যায় না। এমনিতেই জাতীয় ঐক্য গড়ার শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিকল্পধারার মতপার্থক্যের কথা সংবাদমাধ্যমের তরফে আমরা জেনেছি। বিকল্পধারার নানা শর্তও ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগী নেতাদের পক্ষে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে টানাপড়েন। সর্বশেষ শুক্রবার যুক্তফ্রন্টের শরিক জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসভবনের বৈঠকেও বাকবিতণ্ডার খবর আমরা জানি। শেষ পর্যন্ত অন্য শরিকদের ঐকমত্যে বি. চৌধুরীকে বাদ দিতে বাধ্য হন ড. কামাল হোসেন।

বিকল্পধারার দুটি দাবিতে অনড় থাকায় বলা চলে তাদের এ ঐক্যফ্রন্টের বাইরে অবস্থান। প্রথমত, জটিলতা দেখা দেয় স্বাধীনতাবিরোধী শব্দ নিয়ে। দ্বিতীয়ত, বিকল্পধারা জাতীয় সংসদের ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’র জন্য ঐক্য গড়ে তোলার আগে ‘আসন বণ্টনে’র নিশ্চয়তা চেয়েছিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দলটি বিএনপিকে দেড়শ’ আসন দিয়ে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে দেড়শ’ আসন দেওয়ার দাবি তোলে। এর মাধ্যমে তারা মূলত বিএনপির একক প্রভাব দেখতে চায় না। এটি অবশ্য বিকল্পধারার বি. চৌধুরীর বারিধারার বাসভবনে শনিবারের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যেও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতির শর্ত মেনে নিতে হবে। জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর ‘চক্রান্তে’র সঙ্গে বিকল্পধারা নেই। সঙ্গত কারণেই বিকল্পধারার সঙ্গে দূরত্বের কারণ স্পষ্ট।

কথা হলো, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আদৌ রাজনৈতিক কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি-না- সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে এটা ঠিক, বিষয়টি মিডিয়ায় যেভাবে কাভারেজ পাচ্ছে, এ ব্যাপারে মানুষের মধ্য যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাতে নিশ্চিতই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে, বিএনপি এখন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাইরে একটি পথ খুঁজে পেল। ড. কামাল হোসেনকে তারা সামনে পেল। বলা চলে, এর মাধ্যমে বিএনপি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান-সংকট কাটাতে পারছে। যদিও এখানে এ দু’জন মাইনাস হয়ে গেলেন।

বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সম্মিলিত এ যাত্রা প্রকারান্তরে এটা বোঝাচ্ছে যে, তারা জামায়াতে ইসলামীকেও মেনে নিল। যেহেতু জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে, তারা নিজেদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না। তবে জামায়াত স্বতন্ত্রভাবে কিংবা অন্য দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে। স্থানীয় নানা নির্বাচনে তাদের সেভাবে নির্বাচন করতে আমরা দেখেছিও। এখন জাতীয় নির্বাচনেও হয়তো তারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলেও তারা যে বিএনপি জোটকেই সমর্থন দেবে, তা বলা বাহুল্য। তাহলে বিকল্পধারার বিকল্প কী? ১৪ দল ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। আমার মনে হয়, তারা ১৪ দলের সঙ্গেই এখন জোট বাঁধবে। এর বাস্তব কারণ রয়েছে। কারণ মাহী বি চৌধুরী ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে ব্যবসা করেন; আবার মেজর (অব.) মান্নান ১৪ দলের সঙ্গেই জোট করতে চাইবেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি নির্বাচনী জোট হয়; গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার অবস্থান শক্তিশালী হবে বলেই মনে করি। বিশেষ করে ভোটের রাজনীতিতে তারা ব্যাপক লাভবান হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হবে।

নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তিসহ সাত দফা দাবি এবং সংসদ ও সরকারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ ১১ দফা লক্ষ্যের কথাও ঘোষণা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ৭ দফার প্রথম দফায় যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে; সংবিধানের নিরিখে তা দেখতে হবে। দ্বিতীয় দফায় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। এসব ব্যাপারে সরকার কতটা আন্তরিক হবে, সেটি দেখার বিষয়। তবে সরকার নিশ্চয় কিছু দাবি মেনে নিতে পারে। যেমন বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের দাবি মেনে নেওয়াও কঠিন নয়।

আমি তো মনে করি, বরং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে সরকারেরই লাভ হলো। এর মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনে আসার পথ উন্মুক্ত হলো। যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা সবাই বলে আসছে, এর মাধ্যমে আমরা তার আশা দেখতে পাচ্ছি। এ জন্য সরকারকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসা দরকার। এ ফ্রন্টকে সাধুবাদ জানিয়ে তাদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্ত আস্থার সংকট চলছে। বড় দুই দলের মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে রাজনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই আস্থাহীনতা দূর না হলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। আস্থাহীনতা দূর করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক জোটের মধ্যে আলোচনার বিকল্প নেই। ফলে আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। ১৪ দলীয় জোট ও এই ফ্রন্টের মধ্যে সমঝোতা অসম্ভব নয়। এখানে সরকারের দায়িত্বই বেশি। সরকারকে বেশি বেশি সমালোচনা না করে বরং কীভাবে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, সে জন্য সচেষ্ট হতে হবে। নির্বাচন কাছে চলে আসছে। মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। সে সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সে বিষয় মাথায় রেখেই সরকারের উচিত হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সাধুবাদ জানানো।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

(সমকাল থেকে নেয়া)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ