প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিষেধাজ্ঞা ভেঙে চুক্তিতে ইলিশ শিকার

কালের কন্ঠ : মানিকগঞ্জের পদ্মা ও যমুনা নদীতে একদিকে চলছে অভিযান, অন্যদিকে চুক্তিতে শিকার হচ্ছে মা ইলিশ। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদ আর ইলিশ শিকারিদের কৌশলের কাছে মার খাচ্ছে অভিযান।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা ও পদ্মা নদী। দৌলতপুর থেকে হরিরামপুর পর্যন্ত প্রায় ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে মা ইলিশের বিচরণক্ষেত্র। জাল ফেললেই ওঠে মা ইলিশ। এই তিনটি উপজেলার পদ্মা যমুনা নদীতে রয়েছে অসংখ্য চর। মূলত এই চর থেকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ ধরার নৌকা নামছে নদীতে। একটি হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে ৫০০ থেকে ৭০০ নৌকা ইলিশ শিকারে জড়িত। আর এদের মদদ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধিরা।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিবালয় উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা চর শিবালয়ের ইলিশ শিকারি হোসেন, আদম, আফসার, বাবুল, ইউসুফ আইনুদ্দিনসহ ২০ জনের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চার লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের নির্বিঘ্নে ইলিশ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী নদীতে অভিযান পরিচালনার আগেই ইলিশ শিকারিদের মোবাইল ফোনে সতর্ক করা হয়। আরিচা ঘাট থেকে ভাড়ায় স্পিডবোটে অভিযান পরিচালিত হয়। এ কারণে ওই নেতা আগেই অভিযানের খবর পেয়ে যায়। এ ছাড়া ধরা পড়লেও ছোটখাটো জরিমানার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থারও আশ্বাস দেওয়া হয়।

স্থানীয় লোকজন জানায়, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে আরিচা ঘাটে ডাকবাংলোতে বসে চার লাখ টাকা চুক্তির দুই লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। ওই চুক্তি এবং টাকা লেনদেনের সময় এক শ্রমিক নেতা ও এক ছাত্র নেতা উপস্থিত ছিলেন।

মধ্যনগর চরের ৩০ জন ইলিশ শিকারির সঙ্গে প্রায় একই ধরনের চুক্তি হয়েছে শিবালয় উপজেলার এক নেতার সঙ্গে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন প্রতিটি নৌকা থেকে এক হাজার টাকা দেবে ওই নেতাকে। বিনিময়ে সতর্ক করে দেওয়া এবং হঠাৎ ধরা পড়ে গেলেও কম সাজায় ছাড়িয়ে আনবে প্রভাব খাটিয়ে।

আনুলিয়া চরের ৩০ জন ইলিশ শিকারির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এক পুলিশ সদস্যের ভাতিজা বাবুল ফকিরের। তার সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি হয়েছে। এই পুলিশ সদস্যের আরেক ভাতিজা শামিম ফকিরের সঙ্গে ২৫ ইলিশ শিকারির চুক্তি হয়েছে।

এদিকে দৌলতপুর উপজেলার বাঁচামারা, বাঘুটিয়া ও চরকাটারি ইউনিয়নের তিনজন জনপ্রতিনিধির মদদে চলছে ইলিশ শিকার। তাদের মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে ইলিশ শিকারিরা নদীতে নৌকা নামাচ্ছে। দুর্গম এই অঞ্চলে খোলামেলাভাবে ইলিশ শিকার চলছে। চরকাটারি ইউনিয়নে বাড়ি একজন মৎস্য কর্মকর্তাও নির্বিঘ্নে ইলিশ ধরার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করেছেন। বিষয়টি এলাকায় বহুল আলোচিত এবং ওপেন সিক্রেট (সবাই জানে, কেউ বলে না)।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বরফকলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলেও গোপনে বরফ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে একজন নেতার মদদ আছে বলে জানা গেছে। ওই নেতা প্রকাশ্যে বরফকল বন্ধ রাখার বিরোধিতা করেছিলেন। গোপনে বরফ উৎপাদন হওয়ায় ইলিশ সংরক্ষণে সুবিধা পাচ্ছে শিকারিরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ থেকে ইলিশ কিনে এনেছেন মানিকগঞ্জ শহরের হাসনা বেগম। তিনি জানান, গত শুক্রবার তিনিসহ আরো চার নারী ইলিশ কিনতে ওই গ্রামে যান। নদীর পাড়েই বিভিন্ন বাড়ি থেকে তাঁরা সবাই মিলে প্রায় ২০ কেজি ইলিশ মাছ কেনেন। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কিনেছেন দুই থেকে আড়াই শ টাকা কেজি দরে। তিনি আরো জানান, তাঁদের মতো অনেক লোককে সেখান থেকে মাছ কিনতে দেখেছেন। সুটকেস, স্কুল ব্যাগ, মাটির কলস, টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে এসব ইলিশ পাচার করা হচ্ছে। গত শুক্রবার একটি যাত্রীবাহী ট্রলার তল্লাশি করে ১০টি কাপড়ের ব্যাগ থেকে প্রায় ২০০ কেজি ইলিশ মাছ উদ্ধার করা হয়েছে।

শিবালয় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘প্রায় ৪০-৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় নজরদারি করার মতো জনবল ও নৌযান নেই। নৌযান ভাড়া করার জন্য আমাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। অথচ স্পিডবোটের এক ঘণ্টার জ্বালানি খরচ চার হাজার টাকা।’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যদি মা ইলিশ না ধরায় সহযোগিতা করতেন তা হলে আমাদের প্রয়োজন হতো না।’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বরফকল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গোপনে চালু হয় কি না খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা করা হবে।’

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদি হাসান বলেন, ‘মা ইলিশ শিকারের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স। সামর্থ্য অনুযায়ী এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ