প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাতছানি দিচ্ছে পদ্মা সেতু

কালের কন্ঠ : আমাজান নদীর পরই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা ও প্রমত্তা নদী পদ্মা। এই নদীর ওপরই দেশের সবচেয়ে বড় সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মূল পদ্মা সেতুসহ পুরো প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। আর মূল সেতুর কাজ এগিয়েছে ৭০ শতাংশ।

জাজিরা ও মাওয়ার মধ্যে ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর ৮৫০ মিটার এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। জাজিরায় পাঁচটি ও মাওয়ায় একটি স্প্যান বসানো হয়েছে। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

দোতলা কাঠামোর এ সেতুর ওপর দিয়ে চলবে গাড়ি, নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে রেলপথ হবে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

আজ রবিবার রেল সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাওয়া প্রান্তে সেতুটির নামফলকও উন্মোচন করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে নামকরণের জনদাবি থাকলেও তিনি তাতে রাজি হননি। সেতুর নামকরণ হচ্ছে পদ্মা সেতু। জানা গেছে, আজ সেতু চালুর নতুন তারিখ ঘোষণা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশে প্রথমবারের মতো পদ্মা সেতু হয়ে ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগিয়েছে ৭০ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী নিজের চোখে আজ এ প্রকল্পের অগ্রগতি দেখবেন। তিনি মাওয়ায় এক হাজার ৩০০ মিটার নদী রক্ষা কাজেরও উদ্বোধন করবেন।

কাজের অগ্রগতি : মূল পদ্মা সেতু বসানো হবে ৪২টি পিলারের ওপর। এসব পিলার বা খুঁটিতে বসানো হবে ৪১টি স্প্যান। এ পর্যন্ত ১৪টি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। বসানো হয়েছে ছয়টি স্টিলের ধূসররঙা স্প্যান। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে সেতুর ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ছয়টি পিলার নির্মাণের পর বসানো হয়েছে পাঁচটি স্প্যান। গত বছরের সেপ্টেস্বরে প্রথম স্প্যান বসানো হয়েছিল জাজিরায়। গত বুধবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে প্রথম স্প্যান বসানো হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুতে ৪১টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হলে ট্রেন চালানোর জন্য এগুলোর ওপর দুই হাজার ৯৫৯টি রেল

স্ল্যাব বসানো হবে। এর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে আটটি বসানো হয়েছে। সেতুর ৪২টি পিলারের জন্য ২৯৮টি পাইলের দুই-তৃতীয়াংশের নির্মাণ শেষ হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরায় উড়ালপথের (ভায়াডাক্ট) জন্য যথাক্রমে ৪০টি ও ৩৭টি পিলার নির্মাণ করতে হবে। এগুলোর জন্য যথাক্রমে ১৯৩টি ও ১৭২টি পাইল নির্মাণ করার কাজ চলছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে গাড়ি চালানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে নদীর তলদেশের জটিল অবস্থাসহ চারটি কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূল সেতু নির্মাণে ২৩ মাস অতিরিক্ত সময় দাবি করেছিল চায়না মেজর ব্রিজ কম্পানি লিমিটেড। নদীশাসনের জন্য সিনোহাইড্রো করপোরেশন চেয়েছিল অতিরিক্ত ১৮ মাস। যুক্তি দেখাতে না পারায় সেতু বিভাগ তা আমলে নেয়নি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞদলের প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কাজ এগোচ্ছে। পদ্মা নদীর মতো এমন খরস্রোতা নদীতে এই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হচ্ছে জটিলতা অতিক্রম করে। নদীর তলদেশের মাটির স্তর নরম, স্রোতও প্রবল। আমি বলব, পদ্মা সেতুর কাজ আমাদের জন্য ল্যান্ডমার্ক। ২০১৯ সালের মধ্যে যাতে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়ে যায় তার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আনপ্রেডিকটেবল নদীতে চার বছরে সেতু নির্মাণের সময়সীমা ঠিক করে তা সম্পন্ন করা কঠিন।’

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করতে আরো এক বছর সময় চাওয়া হয়েছে। সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত সাত পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাব গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাঠানো হয় সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনে। কাজে দেরির জন্য বড় কারণ হিসেবে নদীর তলদেশের গভীরে নরম মাটির স্তর থাকায় সেতুর পিলার (পিয়ার) স্থাপনে সমস্যা, ২২টি পিয়ারের নতুন নকশা প্রণয়ন, নদী ভাঙন ও প্রবল স্রোতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

সেতু বিভাগ সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রকল্পে নদীশাসন কাজের চুক্তিতে ছয় কোটি ঘনমিটার বা ২১২ কোটি ঘনফুট খননের কথা উল্লেখ আছে। জাজিরায় মূল সেতুর উজান ও ভাটির ডুবোচরে কিছু স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল খননের জন্য। সেখানে চাষাবাদ বা জনবসতি ছিল না। কিন্তু নদীর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে চিহ্নিত স্থানগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় জমি অধিগ্রহণের দরকার হয়। অতিরিক্ত এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয় গত জুনে। মূল নদীর ৪০টি পিয়ারের ১৪টির পাইলের নকশা নতুন করে করতে হয়। আটটি পিয়ারের পাইলের কাজও স্থগিত করে সেতু কর্তৃপক্ষ। ২২টি পিয়ারের পাইলে নতুন করে নকশা করতে হচ্ছে। ১৫টি পিয়ারের পাইলে নতুন নকশা ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। আরো সাতটির নতুন নকশা করা হচ্ছে। সেতুর মূল অংশে ৪১টি ইস্পাতের ট্রাসের (সেতু ধরে রাখার কাঠামো) স্প্যান রয়েছে। সেতুর কিছু অংশ সোজা, কিছু অংশে আনুভূমিক ও উলম্ব বাঁক রয়েছে। আগের নকশা অনুযায়ী ট্রাস তৈরি হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের বর্ষায় মাওয়ায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ মিটার/সেকেন্ড গতিতে নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছে। প্রবল স্রোতে ৫ দশমিক ৫ লাখ ঘনমিটারের দুটি ‘ক্ষয়-গর্ত’ তৈরি হয়েছে। ওই কাজে অতিরিক্ত ছয় মাস লেগেছে। প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তার পরও কাজ এগোচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভারতের ভুপেন হাজারিকা সেতুর চেয়ে ১৩৩ গুণ বেশি শক্তিশালী হবে পদ্মা সেতু। ৪০ তলা ভবনের সমান গভীরে পাইল নিয়ে যেতে হচ্ছে পদ্মায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ৬০ টন আর পদ্মা সেতুর আট হাজার ২০০ টন। ভারতের ওই সেতুর একেকটি পিলার ১২০ টনের আর পদ্মা সেতুর ৫০ হাজার টনের। বিশ্বের আর কোনো সেতু তৈরিতে পদ্মার মতো নদীর এত তলদেশে পাইল নিতে হয়নি।

পদ্মা সেতু তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সেতু হবে। শুধু মাওয়া পয়েন্টে মাত্র ২০ সেকেন্ডে পদ্মায় যে পানি বয়ে যায় তা ঢাকার সারা দিনের সরবরাহ করা পানির সমান। পদ্মায় সেকেন্ডে এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি বয়ে যায়। পানিপ্রবাহ বিবেচনায় বিশ্বে আমাজান নদীর পরেই পদ্মার অবস্থান। পদ্মা নদীতে পাথরের স্তর মিলেছে ১০ কিলোমিটার গভীরে। বিশ্বের অন্যান্য নদী ও নদীর ওপর যেসব সেতু আছে সেগুলোর কোনোটিরই পাথরের স্তর এত নিচে নয়। পদ্মা সেতুর পাইল নদীর তলদেশে নিতে যে হ্যামার লাগছে সেটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। বিশ্বের অন্য কোনো সেতু প্রকল্পে এমন হ্যামার ব্যবহার করা হয়নি।

অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, এমন খরস্রোতা নদীতে সেতু নির্মাণের সব ঝুঁকি পদে পদে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

২০১৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার পক্ষে মত : পদ্মা সেতু প্রকল্পের ১০ বিশেষজ্ঞ দলের একজন অধ্যাপক আলমগীর মুজিবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জটিলতার পরও সেতু হবে। নদীশাসনের কাজ সারা বছর করা সম্ভব নয়। স্রোতও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চারজন বিদেশি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আমাদের পুরো প্যানেলের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত। আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আবার বৈঠক হবে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। ২০১৯ সালের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে আমরা মতামত দিয়েছি।’

রেকর্ড গড়বে পদ্মা : পদ্মা সেতু প্রকল্পের ১১ বিশেষজ্ঞ দলের একজন ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, শক্তিশালী নদীর ওপর এমন সেতু নির্মাণ সত্যি দুরূহ কাজ। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ চলছে ২৪ ঘণ্টা। বর্ষায় পলি জমে, ডুবোচর হয় বলে এখন কাজের ধরন পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। নদীশাসন কাজে গতি বেড়েছে। আমার মনে হয়, জটিলতা জয় করে সেতু নির্মাণের ইতিহাসে রেকর্ড গড়বে পদ্মা সেতু।

উৎসবমুখর পদ্মাপার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে পদ্মার দুই পারের মানুষ উৎসবে মেতেছে। সাজানো হয়েছে দুই পার। মাওয়া, জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরে নেওয়া হয়েছে প্রস্তুতি।

আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মো. মাসুদ খান জানান, মাওয়া এলাকাটি সাজানো হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ফেস্টুন ও ব্যানার দিয়ে। এখানে সুধী সমাবেশে লক্ষাধিক জনসমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সকাল ১১টায় মাওয়ায় পৌঁছবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ১১টা ৫ মিনিটে মাওয়া টোলপ্লাজা অংশে পদ্মা সেতুর নামফলক উন্মোচন করবেন। এ সময় পদ্মা সেতু রেল সংযোগ কাজেরও উদ্বোধন করবেন তিনি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন ও নদীতীর রক্ষা কাজের উদ্বোধন করবেন। সোয়া ১১টায় তিনি সুধী সমাবেশে অংশ নেবেন। পরে ১২টা ২৫ মিনিটে শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে তিনি দুপুর পৌনে ১টায় যাবেন জাজিরা। দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে সেখানে পদ্মা সেতুর ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

শরীয়তপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ শিশির জানান, জাজিরায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর ৬০ শতাংশ কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করবেন।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি প্রদ্যুৎ কুমার সরকার জানান, মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ঘাটে জনসভায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

উল্লেখ্য, গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি দেখতে মাওয়া ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবল হক।