প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কার সঙ্গে কার সমঝোতা হবে?

এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: আরেকটি জাতীয় নির্বাচন এখন একেবারে দোরগোড়ায়। দুই সামরিক স্বৈরশাসকের দীর্ঘ ১৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর নব্বই দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ছয়টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালেই সরকার ও বিরোধী পক্ষের বহু দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক রকম অনিশ্চয়তা দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত। এই অনিশ্চয়তা আবার কখনো কখনো অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। প্রতিবারই দেখা গেছে অনিশ্চয়তা এবং অচল অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য বড় দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা এবং আপসের কথা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে বরাবরই উঠেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত একবারও আপস-সমঝোতা হয়নি। দু’য়েকবার পক্ষদ্বয় আলাপ আলোচনায় বসলেও তা সফল হয়নি। কেন সফল হয়নি সে কথায় একটু পরে আসছি। তার আগে দু’য়েকটি নির্বাচনকালীন সময়ের ঘটনাবলীর বিচার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

১৯৯১-৯৬ মেয়াদে মাগুড়ার একটি উপ-নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার কর্তৃক সীমাহীন নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে তখনকার বিরোধী দলসমূহ এবং জনগণের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে নির্বাচনের সময় বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে কোনো নির্বাচনই আর সুষ্ঠু হবে না। তাই নির্বাচনকালীন দল-নিরপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। দেশ বিদেশের সকল অঙ্গন থেকে বলা হয় পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সমঝোতা হওয়া উচিত। কমনওয়েলথ থেকে বিশেষ প্রতিনিধি এসে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে। কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হয় না।

বিরোধী পক্ষের সব দাবি-দাওয়া উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগসহ সব দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একতরফা একটা ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ফেলে। এরপর সংসদ বসে এবং বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। তাতে বিরোধী পক্ষের আন্দোলন আরো তীব্রতর হয়। সব বিরোধী রাজনৈতিক দল তো আছেই, সারা দেশের মানুষ কাজ কর্ম ফেলে, দোকানপাট বন্ধ করে আন্দোলনে যোগ দেয়। তার ফলে সমঝোতা নয়, বিএনপি বাধ্য হয়ে বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দাবি মেনে নেয়। বিএনপি পদত্যাগ করে, সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং তাতে সব দলের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের পথ সুগম হয়। যেটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জনু। এতে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত একটি উপ-নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ ওঠেনি। মেয়াদ পূর্ণ করে আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের মধ্য জুলাইয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সংবিধান নির্দেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে নির্বাচনের জন্য দায়িত্ব হস্তান্তর করে দেয়। এ সময় কোনো অনিশ্চয়তা বা অস্থিতিশীলতা দেখা যায়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও নির্বাচন কেন্দ্রিক কোনো দাবি দাওয়া ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়েও কোনো কথা ছিল না।

কিন্তু ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনটি যেভাবে হলো তাতে ওই সময়ের বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকলাপ ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সামগ্রিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ আদালতের পবিত্রতা রক্ষার বিষয়ে সচেতন মানুষ মানেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়া প্রশ্নে সবোর্চ্চ আদালতের ভেতর যদি দলীয় রাজনীতি ঢুকে পড়ে তাহলে মহা সর্বনাশ হবে। মানুষের এই আশংকাটাই পরে সত্য হলো।

২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকার পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের পক্ষে রাখার জন্য অন্য ক্যাডার সার্ভিস নয়, শুধুমাত্র উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়, যাতে বিএনপির একান্ত পছন্দের প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারে। তারপর আব্দুল আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন গঠন করে, যারা অসৎ উদ্দেশ্যে প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ ভুয়া বা জাল ভোটার তৈরি করে। তাই সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো ২০০৭ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে। সুতরাং আবারও সমঝোতা ও আপসের কথা ওঠে। দুই দলের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু, এবারও আগের মতোই কাজের কাজ কিছুই হয় না। সমঝোতা আপসের কথা হাওয়ায় উড়ে যায়। যার পরিণতিতে দেশ দুই বছরের জরুরি আইনের মধ্যে পড়ে যায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন হয়। বিএনপিসহ বিরোধী দলের দাবির মুখে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমঝোতা ও আপসের পথে অনেকটাই এগিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেন, সমঝোতার প্রস্তাব দেন এবং আলোচনার আহবান জানান। কিন্তু বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বিএনপি নেত্রীর অনমনীয় অবস্থান এবং অসৌজ্যমূলক আচরণের জন্য এবারও সমঝোতা ও আপসের পথ নষ্ট হয়ে যায়।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, নির্বাচনের প্রাক্কালে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি এবং তার জের ধরে অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরিতে বিএনপির কার্যকলাপই মূলত দায়ী-যেটি বোঝা যায় উপরের বর্ণিত ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি সরকারের কার্যকলাপের বর্ণনা থেকে।

একই সঙ্গে ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন প্রতিহতের নামে ধ্বংসযজ্ঞে নেমে বিএনপি আপস-সমঝোতার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তাহলো, সেই নব্বই দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৮ বছর ছয়টি নির্বাচন গেছে, কখনোই আপস-সমঝোতা হয়নি। কেন হয়নি সেটাই বড় প্রশ্ন। এর প্রধান কারণ, এই ২৮ বছর সমস্যার শেকড়ে না গিয়ে সকলেই আমরা ডালপালা নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করেছি। শেকড়ের সমস্যা রয়েই গেছে। এই সমস্যা নিহিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতির মোলিক জায়গায়, যেখান থেকে রাজনীতিসহ সকল নীতির উৎপত্তি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতির সূত্র ও ভিত্তি হচ্ছে সেই সমস্ত উপাদান ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত আদর্শ, যার পরিস্ফূটন ঘটেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং একাত্তরের মক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এর বহি:প্রকাশ ও প্রতিফলন ঘটে বাহাত্তরের সংবিধানে-যার মৌলিক নীতি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র। এই আদর্শের জন্যই এতো সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর নতুনভাবে আবির্ভূত বিএনপি এবং পুনরুত্থিত জামায়াত উল্লিখিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোকে সংবিধান থেক বাতিল করে দেয়। তাতে বোঝা গেলো, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশকে শেষ করে ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি মানসতন্ত্রের রাষ্ট্রনীতি প্রবর্তন করা, যেটিকে আমরা দেখেছি সেই প্রথম থেকেই বিএনপি অনুসরণ করে আসছে।

পঁচাত্তরের ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবং একই লক্ষ্যে ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণ, যার মাধ্যমে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সব সিনিয়র নেতাদের হত্যা করা যাতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতি বাংলাদেশে আর কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

বিএনপি-জামায়াত, প্রতিপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পরাজিত করার জন্য ভায়োলেন্সের পথ বেছে নিলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে পরাজিত করতে চাইছে। সুতরাং, সমঝোতা হবে কার সঙ্গে কার? যারা সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চায় এবং মুক্তিযু্‌দ্ধের রাজনীতিকে বিনাশ করতে চায় তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আপস সমঝোতা হয় কী করে? আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে এখন অনেক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তারা প্রতিপক্ষ জামায়াত-বিএনপি যারা ভায়োলেন্সের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে শেষ করতে চায় তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে চাইবে কেন? এটা তো প্রথম প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনীতি তো বাংলাদেশে চলতে পারে না। যারা একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মানে না এবং জাতির পিতার প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান দেখায় না, তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলা যায় না।

সুতরাং, আপস-সমঝোতা হতে হলে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে। দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং জাতির পিতার প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান দেখাতে হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অর্জিত ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল ঘটনাপুঞ্জিকে আড়াল না করে সেগুলোর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। সমঝোতা ও আপসের শেকড় এখানেই নিহিত।

লেখক: কলামিস্ট এবং ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

(বার্তা ২৪ থেকে নেওয়া)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ