প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুরোনো বন্ধুদের হৃদয়ে কড়া নাড়া

ড. সেলিম জাহান : ‘চলো, আজ বরং কিছু পুরোনো বন্ধুদের হৃদয়ে কড়া নেড়ে দেখি’। গুলজারের মূল লেখা এবং সুজয় দে অনূদিত ‘চলো’, কবিতার শেষ চরণটি ক্রমাগত মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আগের লাইনগুলোও সুন্দর। পুরোনো বন্ধুরা কি আগের মতো উচ্ছল, না কি সময়ের ক্লান্তিতে ভঙ্গুর, তারা কি আগের মতো গোপনতম কথা ভাগাভাগি করে, নাকি তাদের সফলতার আখ্যান শোনাতে ব্যস্ত, আড্ডা দিতে গিয়ে তারা কি আগের মতো সময়ের খেই হারিয়ে ফেলে, না কি চোরাচোখে ঘড়ির দিকে তাকায়? সব পেরিয়ে ঐ শেষ চরণটিই কেন যেন আমাকে টেনেছে ভীষণভাবে। একটা সময় থাকে যখন যৌবনের বন্ধুরাই তো জীবন হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম, তখন এই সব বন্ধুরাই তো আমাদের জগত ও জীবন ছিল। সে বন্ধুত্ব ছিল নির্মল, পবিত্র ও স্বার্থহীন। সে সম্পর্কে ‘আমার-তোমার’ বলে কোন ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না একজনকে ডিঙ্গিয়ে অন্যের ওপরে ওঠার প্রয়াস। বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাটি এত সুদৃঢ় ছিল যে সন্দেহ ঢোকেনি সেখানে। গোপনতম কথার আধার ছিল তো যৌবনের বন্ধুরাই বহু খুশির, আনন্দের আর সাফল্যের তারা যেমন ভাগিদার, তেমনি বহু দুঃখের, কষ্টের আর আশাভঙ্গেরও তো তারা সাক্ষি। জীবনের বহু শিক্ষা, বহু রুচি, বহু মনন, বহু অভিজ্ঞতা তো বন্ধুদের কাছ থেকেই পাওয়া। জিলেট ব্লেডের মতো ধারালো মেধার এ সব বন্ধুরা তো বহু জ্ঞানে আমাদের মনকে সমৃদ্ধ করেছে, চিন্তাকে শাণিত করেছে, যুক্তিকে ক্ষুরধার করেছে। যে বন্ধুরা লিখতো, তাদের কাছ থেকে লেখা শিখেছি, যারা বির্তক করতো, তাদের কাছে বলা শিখেছি, যারা রাজনীতি করতো, তাদের কাছে দেশ-মানুষ-সমাজকে বুঝতে শিখেছি। এসব বন্ধুদের কাছে আমাদের ঋণ যে অনেক। এরা তো আমাদের স্বপ্ন দেখতেও শিখিয়েছে পুরোনা জঞ্জাল সরিয়ে দেব, নতুনের অভিষেক শুরু করব, পৃথিবী বদলে দেব।

এই সব বন্ধুদের মেধা-মনন-স্বকীয়তা, নিজস্বতা-স্বপ্ন-দিকদর্শন থেকে তাক লেগে গেছে। আমরা বিশ্বাস করেছি আমাদের বান্ধবেরা অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করবে না, জীবনের মোহের কাছে পরাজিত হবে না, নিজেকে বিক্রি করবে না, অন্যকেও কিনতে চাইবে না। আমরা নিত্যদিন আশায় আশায় বুক বেঁধেছি আর ভেবেছি, ভেবেছি; পারবে, এরাই পারবে পুরোনো পৃথিবীর খোল-নলচে বদলে দিতে। আমি পারব না কিন্তু আমার বন্ধুরা পারবে। আহা, আমারই তো বান্ধব সব!

এ সব কথা নতুন করে মনে হল, আজ ‘চলো’ কবিতাটি পড়ে। যদি সত্যি কথা বলি, তাহলে ঐ শেষ চরণটির সবশব্দের মধ্যে দ্বিমাত্রিকতা আছে। এক মাত্রায়, বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যেকার পরিবর্তন তো সুস্পষ্ট। যৌবনে বন্ধুত্বের যে ভূমিতে আমরা দঁড়িয়েছিলাম, সেখানে তো আমরা আর দাঁড়িয়ে নেই। মুক্ত, নিষ্পাপ আর সদানন্দ চিত্তের মানুষ তো আমরা আর নই। আমরা এখন আত্ম-স্বার্থ সচেতন, সন্দেহবাতিক, সাবধানী ঝানু পরিপক্ক মানুষ এক এক জন। আমরা আর ওড়ার স্বপ্ন দেখি না, বাঁধভাঙ্গা হাসিতে ফেটে পড়ি না, মনের দরজা বন্ধুর কাছে খুলে দেই না, নিজের কথাটা শোনাতে যতটা উদ্যমী, বন্ধুর কথা শুনতে ততটা আগ্রহী নই।

পথে-ঘাটে কালে-ভদ্রে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে বলি, ‘কি খবর, ভালোতো’? মনে থাকে না, এ মানুষটির সঙ্গেই কোন একদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি, কথা ফুরোতে চায়নি। কখনও কখনও কোন বন্ধুর সাফল্যের কথা শুনলে ঈর্ষাণ্বিত হই হায়, ওর কেন হলো, আমার কেন হলো না। অথচ অতীতে কোন একদিন ঐ বন্ধুটির সাফল্যকে নিজের বলে মনে হয়েছে, আনন্দে দুহাত তুলে নৃত্য করেছি।

কখনো কোন বন্ধুর চলে যাওয়ার সংবাদ শুনলে মুখে বলি, ‘আহা, অমুকটা চলে গেল!, কিন্তু হৃদয়ে? হৃদয়ে সে ক্ষতি কতখানি দাগ কাটে? এক সময়ে এই বন্ধুটির একদিনের অদর্শনেই কি জগত-সংসার অন্ধকার মনে হতো না? কোথায়ে গেল সে সব দিন, কোথায় গেল সে মনটা? সুতরাং আজ যে খুব দরকার কিছু পুরোনো বন্ধুদের হৃদয়ে কড়া নেড়ে আসার। সেই পুরোনো অর্গল কি খুলবে না খুলবে না?

কিন্তু ‘চলো’ কবিতার শেষ চরণের তো দ্বিতীয় একটি মাত্রাও আছে। রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘বাড়ী বদলে যায়। বাড়ী হয়তো বদলায়, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বদলে যায় মানুষ।’ যে সব বন্ধুদের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতাম, এরা জগতকে বদলে দেবে, এখন দেখি, জগত এদের বদলে দিয়েছে। এরা বদলেছে চিন্তা-চেতনায়, কাজ-কর্মে, প্রচুর ধনবান হয়েছে অনেকে, মেদবানও হয়েছে কেউ কেউ। পথে-ঘাটে দেখা হলে বিশালকায় যান থেকে হাত নাড়ে, সন্তানের বিবাহে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে, বছরে দুবার ইউরোপে যায় বেড়াতে।

শিল্প-সাহিত্যে যাদের সম্ভাবনা নিয়ে আমরা তুমুল তর্ক করতাম বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে, তাদের অনেকেইতো নতুন মৌলিক কিছু দিল না আমাদের ঐ থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়ের ঘূর্ণিচক্রেই কেটে গেল তাদের জীবন। বিক্রিও তো হয়ে গেছে অনেকে ক্ষমতার কাছে, অর্থের কাছে-কখনও কখনও প্রায় নামমাত্র মূল্যে। আপোষও তো করেছে অনেকে। রাজনীতিতে যাদের দেখে ভাবতাম, সামাজিক বিপ্লবের নেতৃত্ব তাদের হাতে, আজ সেই সব বন্ধুদের তাবেদারীতে আমরাই মুখ লুকোই লজ্জায়। স্খলনও ঘটেছে কতজনার।

এদের অনেকেই তো ছিলেন মাটির সন্তান। কৃষি-উদ্ভূত পরিবারের সন্তান আমার এক বন্ধু ছিল তার পুরো গাঁয়ের প্রথম মানুষ যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে। তার জীবনের লক্ষ্যই ছিল তার গা থেকে সে মাটির গন্ধ মুছে ফেলবে। বহু বছরের সযত্ন প্রয়াসে তা সে করতে পেরেছে। কিন্তু আমি যখনই তার মুখের দিকে তাকাই, তখন আমি কিন্তু তাকে আর দেখি না, আমি তার মুখে তার পিতার মুখ দেখতে পাই, যিনি মাঝে মাঝে পুত্রের ছাত্রাবাসে পুত্রকে দেখতে আসতেন। সাদা তহবন আর সাবান-কাচা পাঞ্জাবি গায়ে, মাথায় কিস্তি টুপি, হাতে তার স্ত্রীর করে দেয়া পিঠে বা নাড়– একটা গামছায় বাঁধা-পদচারণা কিছুটা কুণ্ঠিত, দৃষ্টি কিছুটা চকিত।

এই সব বন্ধুদের কথা ভাবলে মনে কি হয় না, ‘চলো, আজ বরং কিছু পুরোনো বন্ধুদের হৃদয়ে কড়া নেড়ে আসি’। ভারী ইচ্ছে কি করে না চেঁচিয়ে বলতে, ‘অবনী বাড়ী আছো’? কিন্তু মনে করে কিংবা বলে আর কি হবে, জবাব তো পাব না। হয় অবনীরা বদলে গেছে, কিংবা ঠিক বাড়িতে কড়া নাড়ি নি। কিংবা কে জানে হয়তো দু’টোই। সম্পাদনা : রেআ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ