প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি কি কিছু শিখলো?

বিভুরঞ্জন সরকার : ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত না হানলেও বিএনপির ওপর আছড়ে পড়েছে একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় । এই রায় বিএনপির ওপর কত কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছে কিংবা এটা বিএনপির জন্য কত নম্বর সতর্ক সংকেত হয়ে এসেছে, তা পরিমাপ এখনই হয়তো করা যাবে না। তবে গ্রেনেড হামলা মামলার রায় যে তাদের রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি কিছুটা হলেও নড়বড়ে করে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা ভুল করেন কিন্তু স্বীকার করেন না। বিএনপি নেতারাও তার ব্যতিক্রম নন। ব্যতিক্রম ছিলেন একজন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি অকপটে লিখেছেন, আমি ভুল করি এবং ভুল করলে সেটা স্বীকারও করি। কাজ করলে ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। যারা কিছু করে না তাদের ভুলও হয় না।

বঙ্গবন্ধুর মধ্যে এই রাজনৈতিক সততা ও ঔদার্য ছিল বলেই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং রাজনীতির কবি। তার মতো কেউ হবে বা হতে পারবে সেটা আশা না করেও বিএনপি নেতাদের কাছ থেকে ন্যূনতম সততা মানুষ আশা করতেই পারেন। কারণ বিএনপি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দলটির জন্ম হলেও পরে নির্বাচনে জিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেও দলটি একাধিকবার ক্ষমতায় গিয়েছে। এখন বিএনপির জন্য নানা কারণে রাজনৈতিক ‘দুর্যোগকাল’ চলছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশল নির্ধারণে ভুল করার কারণেই বিএনপিকে এখন ‘শনির দশা’য় পেয়েছে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব এই ভুলের কথা স্বীকার করে না। বিএনপি যদি ভুল স্বীকার করতো এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনীতির চলার পথ নির্ধারণ করতো; তাহলে হয়তো বিএনপিকে আজকের দুর্দশায় পড়তে হতো না। ইতিহাসের শিক্ষা যেমন ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, তেমনি বিএনপিও ভুল করে তা স্বীকার করে না এবং তা থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না।

গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ২১ আগস্ট ঘটনার ‘মাস্টার মাইন্ড’ মনে করা হয় তারেক রহমানকে। সরকার পক্ষ থেকে তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হলেও তা হয়নি। তবে তার এই শাস্তি বিএনপিকে কতগুলো নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আদালত কর্তৃক দণ্ডিত একজন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে বহাল রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। মামলার রায় ঘোষণার পরপরই বিএনপির শীর্ষনেতাদের উচিত ছিলো, জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে দলীয় দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া। বিএনপি সেটা না করে রায় প্রত্যাখ্যান করে তারেকের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। বিএনপির কেউ কেউ তারেককে ‘নিষ্পাপ’ বলেও উল্লেখ করছেন। কিন্তু কতটা নিষ্পাপ বা নিষ্কলঙ্ক সেটা দেশের একটি বড় সংখ্যক মানুষই জানেন। তারেককে নিয়ে বেশি দূর এগুতে পারবে না বিএনপি। এই সত্যটা উপলব্ধি করতে বিএনপি যত দেরি করবে তত দলটি বিব্রত হবে, বিতর্কের জন্ম দেবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ‘সাত ঘাটের পানি খাওয়া’ রাজনীতির ঘোড়েল নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় সম্পর্কে বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং বিএনপিকে হেয় প্রতিপন্ন করতেই এই ফরমায়েশি রায় দেওয়া হয়েছে। জনগণের কাছে এই রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নেই। বর্তমানে আদালতের ওপর জনগণের কোনো আস্থাও নেই। কেননা বিচারকরা নিরপেক্ষভাবে ও নির্ভয়ে রায় দিতে পারছেন না’।

মওদুদ আহমেদের বক্তব্য নিশ্চয়ই বিএনপিরই কথা। এই কথাগুলো বলে তিনি নিজেই নিজেকে এবং বিএনপিকেও হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। মওদুদ সাহেব কী করে জানেন যে, জনগণের কাছে এই রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নেই? এসব সস্তা বাহবা পাওয়ার রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচারের প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কার উপকার করলেন? আদালতের ওপর আস্থা বিএনপির না থাকতে পারে, দেশের সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা এখনও আদালত।

রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, সব দলের কর্মসূচি ও কর্মকৌশলে ভিন্নতা থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে গ্রেনেড-বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা যারা চালাতে পারে, তাদের কাছে বিচার ব্যবস্থা পছন্দ না হওয়ারই কথা। বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিপালকদের কাছে কোনো বিচারকের রায় ‘নিরপেক্ষ’ মনে হবে না।

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় থেকে বিএনপি যদি কিছু শিখতে না পারে তাহলে বিএনপির ওপর রাজনৈতিক-সাংগঠনিক ‘তিতলি’ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ