প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৌদি আরব কি ফেঁসেই গেলো?

বাংলানিউজ : সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাশোগি কোথায়? তিনি কি খুন হয়েছেন? নাকি ‘গুম’ হয়েছেন? এমন প্রশ্ন ঘিরেই এখন তুরস্কের সঙ্গে বাক্যবিনিময় আর সন্দেহের তীর ছোড়াছুড়িতে জড়িয়েছে সৌদি আরব। মাঝে কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক-সৌদির মিত্ররাও। সৌদি রাজতন্ত্রের কড়া সমালোচক খাশোগি তুরস্কে স্বদেশের কনস্যুলেটে ঢোকার পর ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান। আঙ্কারার দাবি, সৌদি কনস্যুলেটে ঢুকেই ‘নেই’ হয়ে গেছেন খাশোগি, তাকে সেখানে ‘খুন করা হয়েছে’। আর রিয়াদের দাবি, কনস্যুলেট থেকে কাজ সেরেই ‘বের হয়ে গেছেন’ খাশোগি।

এই সন্দেহের তীর ছোড়াছুড়ির মধ্যে ঘটনা তদন্তে তুরস্কে গেছে সৌদি আরবের একটি প্রতিনিধি দল। তাদের সঙ্গে মিলে ‘খাশোগি সংক্রান্ত সব দিক খতিয়ে দেখতে’ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করেছে আঙ্কারা। কিন্তু সৌদি প্রতিনিধিদের তুরস্কে পৌঁছানোর মধ্যেই সূত্রের বরাত দিয়ে আমেরিকান বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, ‘খাশোগি খুনই হয়েছেন এবং এতে সৌদিরই জড়িত থাকার প্রমাণ তুরস্কের হাতে রয়েছে’।

খাশোগি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের নিয়মিত কলাম লেখক। সেজন্য তার ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার পাচ্ছে। তুরস্কের ওই সূত্রের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, তুরস্ককে পশ্চিমা একটি গোয়েন্দা সংস্থা খাশোগির বিষয়ে ‘ব্রিফ’ করেছে। আঙ্কারার ওই সূত্র বলছে, তাদের হাতে থাকা তথ্য-উপাত্তের পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হচ্ছে, ‘কনস্যুলেটে একটি আক্রমণ হয়েছে এবং রক্ষা পাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতির ঘটনা’ ঘটেছে। খাশোগি যখন খুন হয়েছেন, তখনকার তথ্যও রয়েছে। পশ্চিমা ওই গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, তাদের হাতে আসা তথ্য-প্রমাণ যে কাউকেই স্তম্ভিত করে দেবে।

খাশোগি: রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠজন থেকে সমালোচক
খাশোগি একসময় সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ক্রাউন প্রিন্স’র আসনে বসে মতবিরোধীদের দমনে বেপরোয়া হয়ে উঠলে তার নীতির কট্টর সমালোচকে পরিণত হন খাশোগি। একসময় সালমান ধরপাকড় শুরু করলে গ্রেফতার এড়াতে ‍যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ৬০ বছর বয়সী সাবেক এই সরকারি উপদেষ্টা। সেখানে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে একটি কলামে খাশোগি অভিযোগ করেন, সালমানের বিরোধিতা করায় বহু মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইয়েমেনে সালমানের আগ্রাসী পদক্ষেপের অযৌক্তিকতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। কথা বলেন সৌদি আরবের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বাড়তি প্রীতিমূলক’ টুইট নিয়েও।

যেভাবে নিখোঁজ
সমালোচনা করতে করতে সালমানের চক্ষুশূলে পরিণত হওয়া খাশোগি ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে সৌদি আরবের কনস্যুলেটে যান। কিন্তু তারপর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। সাবেক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে গিয়েছিলেন কনস্যুলেটে। সেই কাগজ পেলে তিনি তুর্কি বাগদত্তা ও প্রেমিকা হাতিস চেঙ্গিসকে বিয়ে করতেন।

হাতিসের ভাষ্যে, তিনি কনস্যুলেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। খাশোগি তার হাতে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন দিয়ে কনস্যুলেটে ঢোকেন। কিন্তু তারপর আর বের হননি তিনি। তবে কনস্যুলেটে ঢোকার সময় খাশোগিকে কিছুটা চিন্তিত মনে হয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, কনস্যুলেটে এলেও পরে বের হয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু তুরস্কের বক্তব্য, খাশোগি কনস্যুলেটে খুন হয়েছেন।

‘কিলিং মিশনে ১৫ জনের স্কোয়াড’
সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তুরস্কের সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ২ অক্টোবর ১৫ জন সৌদি নাগরিক তুরস্কে আসেন। এরা সৌদি রাজপরিবারের ‘ভাড়াটে আততায়ী’ হয়ে থাকতে পারেন। এরাই ‘কিলিং মিশন’ শেষে তুরস্ক ছেড়ে গেছেন। একজনের নাম সালাহ মোহাম্মদ আল তুবাইকি এবং আরেকজনের নাম মুহাম্মদ সাদ আল-জাহরানি। সৌদি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তুবাইকির পরিচয় রয়েছে ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আর জাহরানিকে বিভিন্ন সময় টেলিভিশনে ক্রাউন প্রিন্স সালমানের সঙ্গে দেখা গেছে। ১৫ জনই ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে আসেন এবং সেদিনই ইস্তাম্বুল ছেড়ে যান। জাহরানি ও তুবাইকি ইস্তাম্বুল ছাড়েন মাত্র ৪৫ মিনিটের ব্যবধানে।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খাশোগি যে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরেই খুন হয়েছেন, তার অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডিং হাতে পেয়েছে আঙ্কারা। অডিও রেকর্ডে বিশ্বাসযোগ্য ও ভয়ঙ্কর কিছু তথ্য মিলেছে, যেখানে বোঝা যায় সৌদি থেকে আসা স্কোয়াড খুন করেছে খাশোগিকে।

ওই অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং হস্তগত থাকা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘অডিওতে স্পষ্ট বোঝা যায় তার (খাশোগি) স্বর এবং আরবিভাষী লোকদের স্বর। সেখানে বোঝা যায় কিভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে এবং পরে খুন করা হয়েছে।’

আরেকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খাশোগিকে সম্ভাব্য হত্যার অপারেশন ছিল ‘কুইক অ্যান্ড কমপ্লেক্স’ (তড়িঘড়ি এবং জটিল)। কনস্যুলেটে ঢোকার দুই ঘণ্টার মধ্যে তাকে খুন করা হয়। এরপর তার মরদেহ (ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে, এই সন্দেহের তীর তুবাইকির দিকে) খণ্ড খণ্ড করে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়।

খাশোগিকে সৌদিতে ফেরত নিতে আগে থেকেই চেষ্টা চলছিল
তুরস্ক সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে মার্কিন এক কর্মকর্তার ভাষ্য, সৌদির ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে খাশোগিকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি আলাপ হয়েছে, সেটা ইন্টারসেপ্ট বা ধরতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া খাশোগিকে এর আগেও কয়েক দফায় সৌদিতে ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমনকি তার প্রতিষ্ঠিত থিংক ট্যাংককেও এ ব্যাপারে প্রস্তাব দেওয়া হয়। এসব চেষ্টার পর খাশোগি তার সমালোচনার মাত্রা আরও বাড়িয়েছেন। পরিণত হয়েছেন পুরো রাজপরিবারের চক্ষুশূলে। যার জের গিয়ে ঠেকেছে তার ‘লাপাত্তা’ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

ভীষণ চাপে সৌদি
খাশোগি কনস্যুলেট থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর সৌদি আরব ভীষণ চাপেই পড়ে গেছে বলে জানাচ্ছে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম। সাংবাদিক নিখোঁজ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্রানসন সৌদিতে ১০০ কোটি ডলার মূল্যের দু’টি পর্যটন প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছেন। অক্টোবরের শেষে সালমানের আহ্বানে রিয়াদে অনুষ্ঠেয় ব্যবসায়ী নেতাদের সম্মেলনেও অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন অনেকে। ইকোনোমিস্টের প্রধান সম্পাদক জ্যানি মিন্টন বেডোসসহ কয়েকজন সাংবাদিকও যাচ্ছেন না সেখানে। উবার, ভিয়াকমের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও সেই সম্মেলন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন।

পাশাপাশি সৌদির এই সময়ের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বও সন্দেহের তীর ছুড়ছে রিয়াদের দিকে। মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির রিপাবলিকান সদস্য ও সিনেটর বব কর্কার এবং ডেমোক্রেটিক সিনেটর বব মেনেনদেজ তাদের যৌথপত্রে ‘মাগনিতস্কি মানবাধিকার দায়’ নামে পরিচিত আইনের ভিত্তিতে খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তদন্ত দাবি করেছেন। কোনো কোনো সিনেটর সৌদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত অস্ত্র বিক্রি চুক্তি বাতিলের পক্ষেই বিবৃতি দিয়েছেন। ডেমোক্রেটিক সিনেটর টিম কেইন একেবারে আঙুল তুলেই বলেছেন, সৌদির কোনো হাত নেই তা প্রমাণের দায়িত্ব তাদেরই। প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি বাতিল করতে হবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স টুইটে বলেছেন, জামাল খাশোগির ঘটনা শুনে আমরা খুবই বিব্রত। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে এটি ট্র্যাজিক দিন।

যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সৌদি আরবের স্পষ্ট বক্তব্য চেয়েছে। কেউ কেউ তাদের আরও চাপ দেওয়ার পক্ষেই বিবৃতি দিয়েছে।

এই চাপে সৌদি আরবের পক্ষে বিভিন্ন সময় ‘মিঠে সুরে’ টুইট করে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি ভালো লাগছে না তার। ঘটনার তদন্তের আহ্বানও জানান তিনি।

সৌদিকে বাগে পেয়ে গেছেন এরদোগান!
এসব কিছুর মধ্যে সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনার নাম তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়্যব এরদোগান। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের সময় তুরস্কের সেনাঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য দোহাকে সৌদির চাপ দেওয়ার বিষয়টি আঙ্কারা ভোলেনি। মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে যখন সর্বোত সহায়তা দিয়ে এরদোগান মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির নতুন চিত্র আঁকছিলেন, সেই মুরসিকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিতে সেনাবাহিনীকে সৌদির অর্থায়নের অভিযোগটিও এরদোগানের ভুলবার কথা নয়। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের নানা ইস্যুতেও আঙ্কারার সঙ্গে বিভিন্নভাবে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে রিয়াদ। সেসব হিসাব কষলে দিনে দিনে তুরস্কের কাছে সৌদির ‘দেনা’ বেড়েছে বহু। এই প্রেক্ষাপটে এরদোগান হুংকার দিয়ে বলেছেন, সৌদি কনস্যুলেট থেকে খাশোগির ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তুরস্ক ‘চুপ থাকবে না’।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্ররা ‘অপরিচিত স্বরে’ কথা বলছে, অন্যদিকে সরব গণমাধ্যম। তবে কি এরদোগান বাগে পেয়ে গেছেন সৌদি আরবকে? তবে কি কাতার, ইয়েমেন, সিরিয়া দ্বন্দ্বে জড়িয়ে দৃশ্যত ‘ধরা খাওয়া’ সৌদি ফেঁসেই গেলো আরেকবার?

এই প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে হয়তো আর ক’দিনের মধ্যে, খাশোগির ‘নিখোঁজ’ হওয়ার তদন্তের তথ্য বেরিয়ে এলে। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম বলছে, খাশোগির হাতে অ্যাপলের একটি স্মার্টওয়াচ ছিল। সেই স্মার্টওয়াচ তার প্রেমিকার হাতে রেখে যাওয়া স্মার্টফোনে তথ্য ট্রান্সফার করতে পারে কি-না, তা খতিয়ে দেখছে তুরস্ক কর্তৃপক্ষ। যদি ট্রান্সপার করে থাকে এবং সেখানে যদি সরাসরি কনস্যুলেটের ভেতরকার ভিডিও রেকর্ড মিলে যায়, তবে সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে যাবে বিশ্ববাসীর সামনে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত