প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত

সমকাল: চট্টগ্রামে মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অসীম রায় নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় র‌্যাবের চার সদস্যও গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিনজনকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) আনা হয়। পরে সেখানে তাদের দেখতে যান র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, এ ঘটনায় র‌্যাব মোটেই হতোদ্যম নয়। অভিযান আরও বেগবান হবে।

এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম। ঘটনাস্থল থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড গুলি ও ১২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

বন্দুকযুদ্ধে নিহত অসীম রায় বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল গ্রামের গুরুসদয় রায়ের ছেলে। তিনি ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন অসীম। রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক ভারতীয় চোরাই শাড়ি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।

র?্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের একটি দল নগরের মুরাদপুর দিয়ে অক্সিজেনের দিকে যাচ্ছে- এমন খবর পেয়ে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। তখন সন্দেহজনক নীল রঙের একটি প্রাইভেটকারকে থামানোর সংকেত দিলে তারা গাড়ি না থামিয়ে র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় একজন পালিয়ে যায়। বন্দুকযুদ্ধের পর গাড়ি থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব।

হামলাকারীদের গুলিতে র‌্যাবের চার সদস্য আহত হয়েছেন। তারা হলেন- স্কোয়াড্রন লিডার সাফায়েত জামিল ফাহিম, মেজর মেহেদী হাসান, ল্যান্স কর্পোরাল শহীদ ও সৈনিক আরিফ। তাদের প্রথমে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। পরে ফাহিম ছাড়া অপর তিনজনকে গতকাল বিকেলে ঢাকার সিএমএইচে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে অসিমের বাবা ও ভাই ঘটনাস্থলে গেলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় বলে জানান র‌্যাবের এক কর্মকর্তা।

অসীম রায়ের প্রাইভেটকারের চালক জাহেদ হোসেন জানান, রাত ১২টার দিকে প্রাইভেটকারে করে রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে নগরের ষোলশহর সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার বাসায় যাচ্ছিলেন অসীম। বিবিরহাট রেলগেট এলাকায় পৌঁছলে একদল লোক গাড়ি থামানোর জন্য সংকেত দেন। অসীম রায় গাড়ির কাচ নামিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চান। তখন তারা অস্ত্র বের করে গুলি করা শুরু করেন। গোলাগুলির মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে মুরাদপুরের দিকে পালিয়ে যান জাহেদ।

তবে ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, প্রাইভেটকারে থাকা লোকটি (অসীম) গাড়ি থেকে নেমেই র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করা শুরু করে। এ সময় র‌্যাবের কয়েকজনের পায়ে গুলি লাগে। পেছন থেকে র‌্যাবের আরেকটি দল এসে গুলি করলে দৌড়ে পালানোর সময় রাস্তার পাশে পড়ে যায় গাড়ি থেকে নেমে আসা লোকটি।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ওমরগণি এমইএস কলেজে ভর্তি হন অসীম। তৎকালীন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন তিনি। ওই বছরই অস্ত্রসহ গ্রেফতারের পর তার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়।

যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী হিসেবে নগরের নন্দনকানন ও রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ আশপাশের এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন অসীম। রিয়াজ উদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক ইয়াবা ও ভারতীয় চোরাই শাড়ির ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। তিন বছর আগে বাবরের গ্রুপ ছেড়ে যান অসীম। নিজেকে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। নিজেকে যুবলীগের নেতাও দাবি করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রিয়াজউদ্দিন বাজার দোকান কর্মচারী সমিতির নেতা জাহেদ ও অসীম রায়ের কাছে বেশ কয়েকটি অবৈধ অস্ত্র ছিল বলে খবর ছিল পুলিশের কাছে। এ কারণে তাকে খুঁজছিল পুলিশ। মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে তারা গা ঢাকা দেন।

‘অভিযান আরও বেশি বেগবান হবে’:র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গতকাল বিকেলে সিএমএইচে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজ নেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে এই প্রথম বড় ধরনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটল। তবে এতে আমরা মোটেই হতোদ্যম নই। আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাব। অভিযান আরও বেগবান করা হবে।’ আহতদের জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চান, যেন দ্রুত তারা সুস্থ হয়ে আবারও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে পারেন।

র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, আহতদের মধ্যে একজনের পেটে গুলি লেগেছে এবং ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম সিএমএইচে ছয় ঘণ্টা ধরে তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। স্কোয়াড্রন লিডার ফাহিমও পেছনে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিটি ভেতরেই রয়ে গেছে। আহতদের মধ্যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যিনি আছেন, চট্টগ্রামে তার চিকিৎসা চলছে। প্রয়োজনে তাকেও হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হবে।

বেনজীর আহমেদ জানান, গত পাঁচ মাসে ৩৫০ কোটি টাকার ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক জব্দ করা হয়েছে। ১৭ হাজার মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদকের প্রকোপ এখন অনেক কম। প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ এখন আর নেই। কক্সবাজারকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তভাবে দমন করার পরিপ্রেক্ষিতে এখন তারা রুট ও কৌশল পরিবর্তন করেছে। মাদকসেবীদের অনেকে মাদক ছেড়ে দিয়েছেন বা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাদক এখন দুষ্প্রাপ্য। ১০০ টাকার ইয়াবা এখন ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। অভিযানের সুস্পষ্ট প্রভাব দেশবাসী উপলব্ধি করছেন। মাদক নিশ্চিহ্ন করার যে প্রচেষ্টা তা আরও দৃঢ়ভাবে অব্যাহত থাকবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ