প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চ্যালেঞ্জের মুখে দুই জোটের পাঁচ শরিক দলপ্রধান

সমকাল: নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন ১৪ দলীয় ও ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন শরিক দলের প্রধানসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। নির্বাচনী এলাকায় তারা নিয়মিত সময় দিচ্ছেন এবং নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন দল ও জোটভুক্ত দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট আসনগুলোয় দুই জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে প্রভাবশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় এবার শরিক দলের প্রধানরা মনোনয়ন ও নির্বাচনে সহজে পার পাবেন না। অনেক দলীয় প্রধানকে এই দুই বৈতরণী পার হতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসন থেকে নির্বাচন করবেন এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে নির্বাচন করবেন জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদল, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচন করবেন কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে নির্বাচন করবেন তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, ফটিকছড়ি কিংবা রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে নির্বাচন করতে চান ইসলামী ফ্রন্টের সভাপতি মাওলানা এমএ মান্নান।

বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, জোটের শরিক দলের নেতাদের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কপাল পুড়ছে। দলের জন্য ত্যাগ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মনোনয়নবঞ্চিত হতে হচ্ছে তাদের। ফলে জোট ও দল থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক না কেন, নেতাকর্মীরা তার জন্য কাজ করবেন- জোটের নেতৃত্বদানকারী দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মুখে এমন কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বঞ্চনা ও হতাশার প্রভাব পড়তে পারে নির্বাচনে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচন করতে চান কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। কিন্তু এখান থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ছিলেন তিনি। জোট সরকারের আমলে বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবেও। তার পক্ষে নিয়মিত মাঠে রয়েছেন তার ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিনও।

অন্যদিকে হাটহাজারীতে জনপ্রিয়তা রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও হাটহাজারী আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে সংসদে হুইপ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক পদেও। কিছুদিন আগে ওয়াহিদুল আলম মারা যাওয়ার পর তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মাঠে ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছেন মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। বাবার মৃত্যুর পর তিনি এলাকায় আসছেন নিয়মিত। বাবার অনুসারী নেতাকর্মীদের দেখভালের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন শাকিলা। সম্প্রতি হাটহাজারীতে ওয়াহিদুল আলমের শোকসভা করে এবং তাতে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এনে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। যদিও এতে অংশ নেননি মীর নাছির সমর্থক বিএনপি নেতারা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক, চাকসু ভিপি নাজিম উদ্দিনও মনোনয়নপ্রত্যাশী। বিএনপি নেতাকর্মীরা জোটের প্রার্থীর পরিবর্তে দলীয় প্রার্থী চাইছেন। ফলে মনোনয়ন লাভে বেগ পেতে হবে কল্যাণ পার্টির সভাপতি ইবরাহিমকে।

কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, কল্যাণ পার্টির বয়স ১১ বছর হলেও আমরা জোটের সঙ্গে আছি সাত বছর। যেদিন জোট হয়েছে, সেদিনই ২০ দলীয় জোটপ্রধান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, আমাকে নিজের এলাকা হাটহাজারী আসনে কাজ করতে। এরপর থেকে এলাকায় কাজ করছি, সময় দিচ্ছি। ২০১৪ সালে আমাদের জোট নির্বাচনে গেলে আমার প্রার্থিতা চূড়ান্ত ছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। জোটের একটি শরিক দলের প্রধান হিসেবে আমার মনোনয়ন পাওয়াটা নিশ্চিত ধরে নিতে পারেন। ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে এলে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হবে তখন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাটহাজারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বলেন, ‘হাটহাজারীতে আমাদের পরিবারের একটি অবস্থান রয়েছে। আমার বাবা এখানকার সংসদ সদস্য ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর আমি হাল ধরেছি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে আমি এলাকায় কাজ করছি। আশা করি মনোনয়ন পাব আমি।’ হাইকোর্টে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী ফোরামের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও আংশিক চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ) আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে পর পর দুই দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদল। এবারও মনোনয়ন চান তিনি। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবারও তার বিরুদ্ধে জোরেশোরে মাঠে নেমেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সে কারণে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ নেতা মোছলেম উদ্দিন আহমদকে। এবার তাকে ঘিরে দলটির বেশিরভাগ নেতাকর্মী একাট্টা হয়েছেন। অন্যদিকে সাংসদ বাদলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও এখন দলের মনোনয়ন চাইছেন কুয়েত দূতাবাসের দূত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এসএম আবুল কালাম। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সুজনও মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামও রয়েছেন মনোনয়ন দৌড়ে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মহাজোট প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জাসদ নেতা মইনউদ্দীন খান বাদলকে নির্বাচনে জয়ী করেছেন। জয়লাভ করার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেই বিরোধ তৈরি করে সুবিধা নিয়েছেন তিনি। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন হলেও এখানে তেমনটি হয়নি। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই আসনটি ধরে রাখতে আমি দলের মনোনয়ন চাইব। আশা করি এবার মনোনয়ন পাব এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসনটি উপহার দিতে পারব।’

তবে সাংসদ মইনউদ্দীন খান বাদল জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ জোটগতভাবে নির্বাচন করলে তিনিই প্রার্থী হচ্ছেন। এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। তবে কোনো কারণে জোট ভেঙে গেলে সেটি ভিন্ন কথা। তখন নিজ দলের পক্ষ হয়ে আসনটি থেকে নির্বাচন করবেন তিনি। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

তবে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছেন এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ আসন থেকে তার নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিশ্চিতই বলা চলে। বিএনপি ছেড়ে নতুন দল গঠনের সময় এলাকায় বিএনপির যেসব কমিটি ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই এলডিপির কমিটিতে পরিণত হয়। এ ছাড়া বিএনপির আমলে যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন করেছেন। ফলে এখনও নিজ নির্বাচনী এলাকায় বেশ জনপ্রিয় তিনি। নেতৃত্ব শূন্যতা কাটাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের ভাই ডা. মহসিন জিল্লুর রহমানকে দলে টানা হয়। তিনিও এবার মনোয়ন চাইছেন।

এ ব্যাপারে এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কেমন হবে কিংবা আমি কোন আসন থেকে নির্বাচন করব, তা নিয়ে এখনও কথা বলার সময় আসেনি। তবে আমার এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের কাছেই প্রকৃত চিত্র পাবেন।’

এ ছাড়া চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনটি তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর দখলে। এক সময় সন্ত্রাসকবলিত এলাকা হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এই উপজেলা আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয়-ভাবাপন্ন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফসহ অনেক পীর-বুজুর্গের মাজার, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ থেকে একবার সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপিতে যোগদান করেন। এরপর তরীকত ফেডারেশন করে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ভালো অবস্থানে রয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার দল থেকে প্রার্থী চাইছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম বাবু, ফটিকছড়ির সাবেক এমপি প্রয়াত রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, ভাই ফখরুল আনোয়ারসহ আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন চাইছেন। নজিবুল বশরের মনোনয়নের বিরোধিতা করছেন তারা। তবে এবারও জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বলে জানিয়েছেন নজিবুল বশর।

জানতে চাইলে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আমি ফটিকছড়ি থেকে নির্বাচন করে জয়লাভ করেছি। এবারও আশা করি মনোনয়ন পাব। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে জোটপ্রধান শেখ হাসিনার ওপর।’

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া আসনের একটি থেকে নির্বাচন করতে চান জাতীয় পার্টি নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা ইসলামী ফ্রন্টের সভাপতি মাওলানা এমএ মান্নান। দলটির মহাসচিব মাওলানা এমএ মতিন চান আনোয়ারা, পটিয়া ও বন্দর-পতেঙ্গা আসনের একটি। ফটিকছড়ি ছাড়া প্রত্যেক আসনেই আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। বর্তমানেও এসব আসনের সংসদ সদস্য হচ্ছেন আওয়ামী লীগের।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ