প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কফি হাউজের সিঁড়িতে শুনিয়েছিলাম ‘আমি বাংলায় গান গাই’

বিডিনিউজ২৪ডটকম: বাংলা ১৪০০ সালের পহেলা বৈশাখে কলকাতার কফি হাউজে এক অনুষ্ঠানে গাইবার জন্যই লিখেছিলেন ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি, কিন্তু গাওয়া হয়নি। তবে কফি হাউজের দোতলার সিঁড়িতে কয়েকজন পরিচিতকে গানটি শুনিয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়।
লেখার এক বছরের মাথায় দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হওয়া সেই গানটি সিকি শতাব্দী পেরিয়ে এখন দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয়। গান লেখা, সুর করা, গাওয়া- সবই করেন শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। ‘আমি বাংলায় গান গাই’ ছাড়াও ‘চ্যাপলিন’, ‘ডিঙ্গা ভাসাও..’ এর মতো জনপ্রিয় গানের এই স্রষ্টা দীর্ঘদিন ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় চাকরি করলেও আগাগোড়াই গানের মানুষ।

জীবনমুখী গানের এ শিল্পী সম্প্রতি কলকাতার কাঁকুরগাছিতে নিজের বাসায় বসে একান্ত আলাপচারিতায় জানান ‘আমি বাংলায় গান গাই’ রচনার পেছনের গল্প।

“১৪০০ সালের পহেলা বৈশাখে কফি হাউজের এমপ্লয়িদের একটি অনুষ্ঠানে গান করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানও ছিল। তখন আমরা উল্টোডাঙার বাড়িতে থাকতাম। অনুষ্ঠানের দিন সকালে ব্যাংকের একটি রিপোর্ট লেখার ফাঁকে এক-দুই লাইন করে গানটি লিখেছি।
“বাসায় বসে অফিসের কাজ করছি আর ভাবছি বাংলাকে নিয়ে কিছু একটা লেখা যায় কি না। গানের লাইন আসছে, সুরও আসছিল, সুর নিয়ে দোনোমনাও ছিল। এমন আহামরি কিছু হবে নিজেও ভাবিনি।’’

তার ভাষায়, “প্রথমে ভাবিনি দারুণ কিছু একটা হবে। গান শুনে কেউ তেমন কিছু বলেওনি। এরপর অফিসে কেউ আসলে কাজের ফাঁকে লবিতে গিয়ে গানটি শোনাতাম। গানটি নিয়ে কোনো মন্তব্য চাইতাম, কেউ সেভাবে কিছু বলেওনি। এভাবেই সময় গড়িয়েছে।”

গানটি নিয়ে প্রথম প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে উৎসাহ দেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বারীণ রায়। প্রতুলের গানের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন তিনি। একদিন সেই চিকিৎসক তার চেম্বারে গানের খোঁজ জানতে চাইলে প্রতুল ‘আমি বাংলায় গান গাই’ এর কথা জানান।

“উনি জিজ্ঞেস করলেন, নতুন কি লিখেছি? এ গানের কথা জানালে- শুনতে চান। তার চেম্বারের বাইরে খোলা একটি জায়গায় পা দিয়ে রিদম তৈরি করে হাতে তাল তুলে গানটি শোনালাম। চেম্বারের পাশেই তার বাড়ি ছিল। সেখানে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী মঞ্জুলাকে ডেকে আবার গানটি শোনাতে বললেন। ডা. বারীণ রায়ই প্রথম বললেন, তুমি জানো না প্রতুল কি গান লিখেছ। এটি বাংলার লোকেমুখে ফিরবে।

“এরপর দূরদর্শন স্টুডিওতে ডাক পড়ল ১৪০০ সালের চৈত্র সংক্রান্তিতে একটি গান রেকর্ডের জন্য। পরবর্তীতে এর রেকর্ডিং হয়।”

১৪০০ সালের পহেলা বৈশাখের জন্য লেখা ও সুর করা ‘আমি বাংলায় গান গাই’ এক বছরের মাথায় চৈত্র সংক্রান্তিতে রেকর্ডের পর সম্প্রচারিত হয় এবং ব্যাপক জনপ্রিয় হয় জানিয়ে তিনি বললেন, “এ গান প্রচারের পর এপার-ওপার বাংলাসহ সব জায়গা থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি, আবেগময় ভাষায় অনেক চিঠিও পেয়েছি।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, “বাংলা নিয়ে আরও অনেক গান আছে। কিন্তু এটাতে কেমন জানি একটা বিষয় আছে। এরকম গান হয়তো অন্য কেউ লিখতে পারত। হয়তো সুর এভাবে হত না। এভাবে গানটি লোকেমুখে ফিরবে তা ভাবিনি।”
দুই বাংলায় গানটি জনপ্রিয় হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাকে অনেকে বলেছেন এ গানের মধ্য দিয়ে তারা একটা জায়গা খুঁজে পায়। গানটা ন্যাশনাল এক সাথে ইন্টারন্যাশনালও। দুটোর সম্মিলন ঘটেছে।”

প্রতুল মুখোপাধ্যায় আলাপকালে তার ‘বাংলায় গান’ এর কথার অর্থও ব্যাখা দেন।

“আমি ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি..’ ধরনের গান লিখতে চাইনি। আমি গানে কখনো বলিনি বাংলা শ্রেষ্ঠ। বরং বলেছি.. বাংলায় বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়। এর মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা ছিল, বাংলা থেকে নিয়েছি। ‘…আমি তারি হাত ধরে সারা পৃথিবীর …’ লিখে ন্যাশনালের সাথে ইন্টারন্যাশনালের যোগসূত্র ঘটানোর চেষ্টা করেছি। বাংলার আর কোনো গানে ঠিক এ ব্যাপারটা নেই। এতে একটা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল।”

গানটির চলন প্রচণ্ডভাবে দ্বিজেন্দ্রপ্রধান উল্লেখ করে প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, “তার (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়) বিভিন্ন দেশাত্ববোধক গানে ওয়েস্টার্ন ঘরানার সুর আছে। আমার গানটিতেও এ ভাব রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ইচ্ছে করে বিভিন্ন লেখকের অনুস্মৃতি আনার চেষ্টা করেছি, মানে এসে গেছে।”

৭৬ বছর বয়েসী প্রতুল মুখোপাধ্যায় স্ত্রীকে নিয়ে এখন থাকেন কাঁকুরগাছির বড়িতে। লিখেছেন দেড়শ’র মতো গান, এসবের সুর করে গেয়েছেনও তিনি। অন্য কবির কবিতা সুর করেও গেয়েছেন। নিজের ও অন্যের মিলিয়ে গান গেয়েছেন প্রায় তিনশ।

নিজের লেখা গান কম কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গান কমানো বা বাড়ানো নয়, মানুষের সঙ্গে থাকাটাই দরকার। গান এলো কিন্তু কাউকে শোনাতে পারলাম না, এটা আমার ভালো লাগে না।”

নিজের লেখা ও গাওয়া প্রিয় গান সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, “সবই আমার প্রিয়, ছেলে মেয়েদের কেউ কি প্রিয় বলতে অস্বীকার করবে? গানই আমার সন্তান।”

তারপরও ‘বাংলায় গান’ ছাড়াও ‘চ্যাপলিন’, ‘ডিঙ্গা ভাসাও’, ‘ভিনদেশী আমি এক প্রিয়’ এবং নকশাল বাড়ি আন্দোলন নিয়ে সে সময়ে গাওয়া গানগুলোকে প্রাধান্য দেন।
বাংলাদেশেও তার গানের ভক্ত রয়েছেন জানাতেই বললেন, “তারা আমাকে মনে রাখেন এটা মনে হলে আরও কিছুদিন বাঁচতে ইচ্ছে হয়।”
জীবনসায়াহ্নে এসে নিজেকে গাছের পাতার সাথে তুলনা করে বলেন, আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছে। একটা জোরে হাওয়ায় ঝরে যাবে। জীবনের শেষদিকের ব্যাপারটা এমনই হয়।

কলকাতার শিল্পী তিমির বরণের উদাহরণ টেনে বলেন, “আকাশবাণীতে তার বাজনা শুনেই সকালে আমাদের ঘুম ভাঙত। বহু বিখ্যাত অর্কেস্ট্রার কম্পোজার। তার বাড়িতে গিয়েছিলাম, ওই এলাকার লোকজন কেউ তাকে ঠিকমতো চিনতেন না। কিন্তু মৃত্যুর পর তিমির বরণকে অনেকেই চেনেন। এ অবস্থায় মনে হয়, যারা আমার গান শোনেন তাদের জন্য অন্তত আরও কিছুদিন বাঁচি।”

এ বয়সে এসে এখনো গান লিখছেন, সুর দিয়ে গাইছেনও, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি সবসময়ই বলে থাকি- আমি গান গাই না, গান বলি এবং এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে গান করি।”

গান নিয়ে প্রথাগত কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ কখনো হয়নি উল্লেখ করে বলেন, আমি এখনো সবার কাছ থেকে শিখি। কোনো প্রশিক্ষণ আমার নেই। দেখে শুনে শেখা। এজন্য বলি..সবাই আমার গুরু, সদাই আমার শুরু। শেখার আগ্রহটা আমার এখনো আছে।”

ছোটদের কাছ থেকে জানাটাই সবচেয়ে ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে তাদেরও শেখানো এবং জানা যায়। ‘ডিঙ্গা ভাসাও’ গানটির উৎসাহ ১০ বছরের এক শিশুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে জানান।

“শেখার আগ্রহ থাকলে মানসিক জরাটা আসবে না। মনের জরা আটকানো যায় জানা বোঝার মাধ্যমে। শরীরে জড়তা আসতে পারে কিন্তু মনে নয়। এটা আমার বিশ্বাস।”

সর্বাধিক পঠিত