প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তারেক ফিরবে নাকি ফিরবে না?

তানভীর আহমেদ : একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে দীর্ঘ ১৪ বছর পর। মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে উনিশ জনের। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও। এই মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারেক রহমানসহ এই মামলার একাধিক অপরাধী বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানের কারণে মামলার রায় কার্যকর করা নিকট ভবিষ্যতে অন্তত সম্ভব নয়। যদিও মামলার রায়ে অভিযুক্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন।

তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার কারণে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা বা সাজা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। জটিল হবে এ কারণেই, তারেক রহমানের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। যেহেতু ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারেক রহমানের আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে তাকে আশ্রয় দিয়েছে সেই অনুযায়ী তার মানবাধিকার রক্ষায় তারেক রহমানকে আত্মপক্ষও সমর্থনের সুযোগ দেবে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল। বন্দিবিনিময় আইন-২০০৩ এর দুই নম্বর অধ্যায়ে ১০০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের সাথে আলাদা করে বন্দিবিনিময় নিয়ে ব্রিটেনের কোনো চুক্তি নেই। যেমনটা রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের ২৮টি দেশের সাথে।

এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তারেক রহমানকে ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আপিল আবেদন করতে হবে। তারেক রহমান ফিরবেন কি ফিরবেন না এটি তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

অন্যদিকে ভারত ও চীনসহ অন্য ৪০টি দেশের সাথে যুক্তরাজ্য সরকারের রয়েছে এমএলএ চুক্তি। তবে বন্দিবিনিময় অধ্যাদেশে বলা আছে, যেসব দেশের সাথে ব্রিটেনের আলাদা করে বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই সেই সব দেশ আবেদন করলে বিশেষ চুক্তি করে বন্দিবিনিময় করা যাবে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, তারেক রহমান ছাড়াও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও রয়েছেন ব্রিটেনে, সরকার চাইলে ব্রিটেনের সাথে একটা বন্দিবিনিময় চুক্তির উদ্যোগ নিতে পারে।

তাহলে এই অবস্থায় সরকারের করণীয় কী?

ব্রিটেনের অপরাধবিষয়ক সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আনিস রহমান ওবিইর সাথে কথা বললে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও কোর্টের আদেশ ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেলে প্রাথমিকভাবে এই আবেদনটি যাচাই বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবেদনটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে পাঠাবে। যদি এই মামলাটি প্রাইমাফেসির হয় তবে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্ত ব্যক্তি তারেক রহমানের নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করবেন। তারেক রহমান আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। এভাবে নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের মোট তিনটি ধাপে যদি প্রমিণিত হয় তারেক রহমান অপরাধী এবং বাংলাদেশের অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে তবেই এই মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পুনরায় ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ফেরত যাবে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বহিষ্কার সনদ দেয়ার পরই বন্দিবিনিময় প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে ব্রিটেনের আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে।

মানবাধিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন বলছেন, যদি তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণকালে কোনো ভুল তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ সরকার তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনও বাতিল করার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে, ব্রিটেন ইউএন কনভেনশন মেনেই তারেক রহমানকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করানো সহজ হবে না।

তারেক রহমানের যুক্তরাজ্যে থাকা আইনজীবী ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান বলছেন, এই মামলাটি সরকার প্রভাবিত করেছে। রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এমন রায় দিয়েছে। বাংলাদেশের আদালতে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না তাই এই রায় ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, “বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখনই তারেক রহমানের নামে আবারও নতুন করে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড এলার্ট জারি করা।” তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে তিনি জাতিসংঘের সনদের কথা বলেছেন। একটা কথা বলে রাখা ভালো, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ইন্টারপোল খুব একটা কাজ করবে না কারণ ব্রিটেন ইতোমধ্যে তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ইতিপূর্বে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই নোটিশও ইন্টারপোল সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

কাউন্টার টেরোরিজম বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ইন্টারপোলে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এমন একজন অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনারের সাথে আমি বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে তিনি আমাকে জানালেন, বিষয়টা নির্ভর করবে সরকার কতটা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এই বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারবে তার ওপর। যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই, সন্ত্রাসবাদে মদদ, সম্মতি, অর্থায়ন করে এমন কাউকে আশ্রয় দেবে না। আমি অবশ্য সেই অনুজের কথা পুরোটা মানতে পারিনি। গত দশ বছরে ব্রিটেন জঙ্গিবাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। বিবিসির একটা প্রতিবেদনের কথা যদি বলি সেই তথ্য অনুযায়ী মোট ৯০ জন মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্ট বিভিন্ন দেশ থেকে ব্রিটেনে অবস্থান করছেন যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ রয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে তারেক রহমানের যাবজ্জীবন আদেশ হওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন যেহেতু যুক্তরাজ্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত দেয় না সেক্ষেত্রে হয়তো তারেক রহমানকে দেশে ফেরানো সহজ হতে পারে। কিন্তু রায়ের পর আইনমন্ত্রী বলেছেন, তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল, রাষ্ট্রপক্ষ এনহ্যান্সমেন্টের জন্য আবেদন করবে। যদি তারেক রহমানের আইনজীবী ব্রিটেনের আদালতে এটি প্রমাণ করতে পারেন এই মামলায় তার মক্কেল মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন, তাহলে ব্রিটেন কোনোভাবেই তারেক রহমানকে ফেরত দেবে না। ফেরত দিলে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে বাংলাদেশের আদালত তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড দেবে না।

অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিবিনিময় আইন রয়েছে, একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য চারজন আইএস জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে এমন ঝুঁকি থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছে। যে তথ্যটি প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তার স্ট্যাটাসেও উল্লেখ করেছেন। তাহলে কেন তারেক রহমানকে ফেরত দেবে না যুক্তরাজ্য? আসলে পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে কুটনৈতিক তৎপরতার ওপর। ব্রিটেনের সাথে দর কষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্র যতটা এগিয়ে থাকে বাংলাদেশ সেই তুলনায় পিছিয়ে থাকবে।

জর্ডানের ইসলামিস্ট নেতা আবু কাতাদার মামলাটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, দীর্ঘ দশ বছর এই মামলার শুনানি হয়েছিল। জর্ডানকে নিশ্চয়তা দিতে হয়েছিল আবু কাতাদাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না। আবু কাতাদাকে ব্রিটেন ফেরত দিতে পারলে তারেক রহমানকেও নিশ্চয় ফেরত দিতে পারবে। আবু কাতাদার মামলার পেছনে ব্রিটিশ সরকারের খরচ হয়েছিল ১.৭ মিলিয়ন পাউন্ড। ব্রিটেনের করদাতাদের এই অর্থ ব্যয়ের জন্য তৎকালীন ক্যামেরন সরকারকে পার্লামেন্টে বিল পাস করাতে হয়েছিল। বর্তমানে কনসারভেটিভ সরকার তারেক রহমানকে ফেরত পাঠাতে এমন আইনি ব্যয়ের ঝুঁকি নেবে কিনা সেটিও বিবেচনার বিষয়। ঐতিহ্যগতভাবেই আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ব্রিটেনের লেবার পার্টির সুসম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন এমপিও লেবার দলীয় এমপি, কিন্তু ক্ষমতাসীন কনসারভেটিভ দলের পাকিন্তানি বংশোদ্ভূত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদকে সন্তুষ্ট করে কতটা সফল হতে পারবে সেটাও একটা বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে ইতিবাচক দিক হলো ব্রিটেনের মানবাধিকার বিষয়ক যত ফাঁকফোকর আছে সবই ইউরোপিয়ান আইন। ইউনিয়নভুক্ত থাকার কারণে এই আইন মানতে হয় ব্রিটেনকে। ব্রেক্সিট হলে সুপ্রিম কোর্টের পর আর ইউরোপিয়ান কোর্টে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমে বলেছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তারেক রহমানকে ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আপিল আবেদন করতে হবে। তারেক রহমান ফিরবেন কি ফিরবেন না এটি তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তিনি না ফিরলে তার আইনজীবীরা হয়তো এই মামলার আপিল করবেন, কিন্তু হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট হয়ে চূড়ান্ত রায় প্রকাশ হতে আরও কমপক্ষে ২ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যাবার কথা। তাই তারেক রহমান স্বেচ্ছায় দেশে না ফিরলে আইন প্রয়োগ করে বা দূতিয়ালি করে তাকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের রায় কার্যকর করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তবে অসম্ভব নয়।

সূত্র : জাগো নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত