প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পরিস্থিতি ভয়াবহ

মানবজমিন : ডেঙ্গু যেন মহাহারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীতে। গড়ে প্রতিদিন অর্ধশত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ১৮৩ জন। মারা গেছেন ১৭জন। ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫২ জন। চলতি মাসের ১১ দিনে ৯২৮ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৫ জন। গেলো মাসে গড়ে প্রতিদিন এক শ’ জনের উপরে আক্রান্ত হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪ জন। শিশু হাসপাতালে গত মাস পর্যন্ত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তে রেকর্ড অতিক্রম করেছে এবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুসারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। তথ্যানুসারে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আগস্ট মাসে আক্রান্ত ১৭শ’ ৯৬ জন এবং মারা গেছেন ৬ জন, জুলাই মাসে আক্রান্ত ৯৪৬ জন এবং মারা গেছেন ৪ জন, জুন মাসে ২৯৫ জন আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৩ জন। মে মাসে আক্রান্ত ৫২ জন, এপ্রিলে ১৫ জন, মার্চে ৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭ জন এবং জানুয়ারিতে ২৬ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২২৪ জন।

এর মধ্যে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৩৩ জন, ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে ২০ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৩৬ জন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (মিটফোর্ড) ৩১ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩১ জন, পুরান ঢাকার সালাহউদ্দিন হাসপাতালে ১৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তে এবার রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এবার সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী মাসের পর থেকে শীত চলে এলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসবে। ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কারণ খুঁজতে গিয়ে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জরিপ চালিয়ে দেখতে পেয়েছে, উত্তরে ৬৬ শতাংশ এলাকার ৯৮ শতাংশ বাসাবাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননবান্ধব পরিবেশ রয়েছে। দক্ষিণে ৬১ শতাংশ এলাকার ৯৩ শতাংশ বাসাবাড়ির একই অবস্থা। এসব বাসাবাড়িতে এডিস মশার ঘাঁটি অর্থাৎ প্রজননস্তরের লার্ভা-পিউপা পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত পরিবহন, টায়ার, প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি, মগ, ফুলের টব, রঙের কৌটা ইত্যাদি কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি দেখা যায়। দুই অংশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের এলাকাও ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। সূত্র জানায়, এই কন্ট্রোল রুমে ঢাকার হাসপাতাল বা সব প্রাইভেট চিকিৎসকদের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু রোগীর তথ্য আসে না, সারা দেশ থেকে শুধু ২২ থেকে ২৩টি হাসপাতাল যে তথ্য পাঠায় তা-ই সংরক্ষণ করা হয়। ফলে বেসরকারি পর্যায় থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাস্তবে আরো অনেক বেশি বলে দাবি করা হয়।

এদিকে, সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ঢাকার শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩শ’ শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর দিয়েছে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল আজিজ। পরিচালক বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু এবং এর ভয়াবহতা অনেক বেশি। ডেঙ্গু সাধারণত ৪ ধরনের হয়ে থাকে। ডেঙ্গু ১, ২, ৩, ৪। এর আগে ছিল ১, ২। এবারই প্রথম ডেঙ্গু ৩ দেখা গেছে। যেটা খুবই ভয়াবহ এবং খারাপ। তাই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ডেঙ্গু মশার প্রজনন ক্ষেত্র ফুলের টব, পরিত্যক্ত বালতি, খালি বোতল, আঙিনার চারপাশে জমে থাকা পানি থেকে ডেঙ্গু মশা জন্ম নিতে পারে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রজনন উৎসগুলোকে ধ্বংস করে দিতে হবে। প্রতিদিন মশার স্প্রে করতে হবে।

দিনের বেলায় বাচ্চাকে মশারি টাঙ্গিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে ডেঙ্গু মশা যেমন কামড়াতে পারবে না ফলে শিশুরা ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি নিজেদের ঘরবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। একইসঙ্গে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নিধনের উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বরে আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুকে বেশি বেশি তরল জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে এবং বারবার খাওয়াতে হবে। যেন পানি শূন্যতা দেখা না দেয়। এ সময় অ্যান্টিবায়টিক খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। জ্বর যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসা সম্বন্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, ডেঙ্গুজ্বর হলে প্রচুর পানি পান করতে হবে ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। ডেঙ্গুর চিকিৎসা বাড়িতে রেখেও হতে পারে। বেশি দুর্বল বা শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়লে, নাক ও দাঁত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকলে হাসপাতালে নেয়াই ভালো। ডেঙ্গুজ্বর সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু দুর্বলতা আরো কিছু দিন থেকে যেতে পারে। ভাইরাসজনিত জ্বর বলে এর কোনো চিকিৎসা নেই। কেবল লক্ষণ বুঝেই চিকিৎসা দিতে হবে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে। এবার রোগী একটু বেশি আসছে। শীতের সময়ে কমে আসবে। তিনি বলেন, এই সময়ে জ্বর বা গায়ে ব্যথা হলে ডেঙ্গুর কথা মাথায় রাখতে হবে। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর তেমন মারাত্মক রোগ নয়। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ বলেন, সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর যখন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের প্রমাণ মেলে (যেমন মাড়ি বা নাক থেকে রক্তক্ষরণ, মলের সঙ্গে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) তখন একে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলা হয়। অধিক রক্তক্ষরণের ফলে শরীরের জলীয় উপাদান কমে যায়। ডেঙ্গুজ্বর হলে প্রচুর পানি পান করতে হবে ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। জ্বর বাড়লে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ অথবা আরো বেশি জ্বর হলে তা কমিয়ে রাখার জন্য সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হবে।

স্থাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৬৯ জন। মারা গেছেন ৮ জন। ২০১৬ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০৬০ জন, মারা গেছে ১৪ জন। ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ১৬২ জন, মারা গেছে ৬ জন। ২০১৪ সালে ডেঙ্গতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭৩ জন। কেউ মারে যাননি। ২০১৩ সালে ১৪৭৮ জন, ২০১২ সালে ১২৮৬ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ২০১১ সালে ১৩৬২ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন। এই সালে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০০৮ সালে ১১৫৩ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতলে আসেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ