প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডেঙ্গুর প্রকোপেশিশুরা

ইনকিলাব : জ্বর নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয় সাত বছরের শিশু তামিম। একদিন চিকিৎসার পরই মারা যায় সে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় তিন বছরের সৈমী নূর। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সেও। চিকিৎসকদের ভাষায়, তামিম-সৈমীর মতো অন্য শিশুরাও ডেঙ্গুতে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়ছে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় মৃত্যুঝুঁকিও তাদের মধ্যেই বেশি। যদিও এতোদিন শুধু রাজধানীর ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরাই হাসপাতালে ভর্তি হতো। তবে এখন ঢাকার বাইরের শিশুও আসছে। স¤প্রতি রাঙ্গামাটির ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর জন্য বিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যথার ওষুধ সেবন, পর্যাপ্ত পানি পান না করাও জটিলতা বাড়াচ্ছে বলে জানান তারা।
সূত্র মতে, ক্রমবর্ধান হারে বাড়ছে রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৫২ জন। চলতি মাসের প্রথম ৮ দিনে আক্রান্ত হয় ৪৯২ জন। অথচ গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, ১১ দিনে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২৮ জনে। অর্থাৎ তিন দিনেই প্রায় ৫’শ রোগী আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন আর ২২৪ জন। একই সঙ্গে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জনই শিশু, যাদের বয়স ১২ বছরের নিচে। যদিও এই তথ্য পুরোরাজধানীর চিত্র নয়। কারণ এই তথ্য শুধুমাত্র রাজধানীর ১৩টি সরকারি হাসপাতাল এবং ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালের। এছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন।

গত সোমবার (৮ আগষ্ট) রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে একাধিক শিশু মারা গেছে। পরে জানা যায়, এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১০ জন শিশু মারা গেছে। হাসপাতালটির একজন কর্মী তথ্য দিলেও তিনি নাম প্রকাশে অপারাগতা প্রকাশ করেন। পরে ওই দিনই হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে তারা জানান, তাদের সব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ তত্ত¡ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে (আইইডিসিআর) পাঠিয়েছেন। এ সম্পর্কে তারা কিছু বলতে পারবেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআর’র সাথে গত সোমবার যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, আজগর আলী হাসপাতালের কোন তথ্য তাদের তালিকায় নেই। তাদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে তথ্যের জন্য। পরে এ বিষয়ে গতকাল বৃহষ্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার জানান, আমাদের তালিকায় আজগর আলী হাসপাতাল ছিল না। আমরা ওই হাসপাতালের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি এবং এ পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্য চেয়েছি। হাসপাতাল থেকে ১ সপ্তাহ সময় চেয়েছে। একই সঙ্গে আইইডিসিআরকে বিষয়টি জানিয়েছি তারাও বিষয়টি দেখছে। আগামী সপ্তাহে ওই হাসপাতালের সার্বিক তথ্য পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেন ডা. আয়েশা আক্তার। তিনি জানান, গতকালও রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছেÑ ওখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু মারা গেছেন। কিন্তু এই শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে কিনা তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছিনা। এ বিষয়ে আইইডিসিআর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তথ্য দিলেই কেবল আমরা বলতে পারবো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে আবদুর রহিম জানান, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত (১১ অক্টোবর) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ১৮৩ জন, মারা গেছে ১৭ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (ভর্তি) রয়েছেন ২২৪ জন।

সূত্র মতে, শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ হাজার ৮১ জন। যা গত আগস্টের প্রায় দ্বিগুণ। আগস্ট মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৬৬৬ জন।

ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গত জুন মাস থেকে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। ওই মাসে আক্রান্ত হয় ২৭৬ জন। যার মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে। জুলাই মাসে আক্রান্ত হন ৮৮৭ জন এবং মৃত্যু হয় ৪ জনের, আগষ্ট মাসে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৬৬৬ জন এবং মৃত্যু হয় ৪ জনের। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর এবং এ মাস মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
রাজধানীর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গোলমাল থাকলেও কয়েকমাস থেকে রাজধানীবাসীর জন্য ডেঙ্গু যেন এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়তই রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে উদ্বেগও বাড়ছে। আর বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং এদের মৃত্যুঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ২০০০ সালে ডেঙ্গু জ্বর আর্বিভাবের পর গত ১৮ বছরের মধ্যে এবারই ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। এর অন্যতম কারণ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুপস্থিতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সচেতনায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বড়দের তুলনায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম হওয়ার কারণেই তারা বেশি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে ইন্টারনাল রক্তক্ষরণ অনেক বেশি হয়। শিশুরা অল্পতেই শকে চলে যাওয়ায় তাদের প্রেসার, পাল্স খুঁজে পাওয়া যায় না। কিডনি, লিভার ফেইলিউর শিশুদের খুব দ্রæত হয়। সে কারণে ডেঙ্গুতে শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। এছাড়া ডেঙ্গুর ধরণ এবার অনেক বদলে গেছে। অনেক সময় জ্বর বেশি হচ্ছে না। হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সামান্য জ্বরে অল্প সময়ের মধ্যে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেও মৃত্যুর ঘটনাও বেশি ঘটছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত ও উৎকণ্ঠিত স্বাস্থ্য বিভাগ বললেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রন) প্রফেসর ডা. সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, বাহক বাহিত রোগ কোন বছর বেশি, কোন বছর অপেক্ষকৃত কম হয়ে থাকে। এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ গত বছরের তুলনায় বেশি। সচেতনতায় আমরা কাজ করছি।

ঢাকা শিশু হাসপাতাল ঘুরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ডেঙ্গু রোগী দেখা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রায় ৪ শতাধিক শিশু। গতকালও ভর্তি ছিল ৪০ জন। এছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছে প্রতিদিন ১৫০-২০০ শিশু। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৬ জন শিশু। তারা একেবারে নাজুক অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিল। বর্তমানে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪০-৪৫ জন রোগীর ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০-২৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্তও হচ্ছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল আজিজ বলেন, এবারই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। ডেঙ্গু সাধারণত টাইপ ১, টাইপ ২, টাইপ ৩ ও টাইপ ৪ এই চার ধরনের হয়ে থাকে। আগে টাইপ ১ ও ২ দেখা যেত। যা সাধারণ চিকিৎসায়ই ভালো হয়। এবারই প্রথম টাইপ ৩ দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। হার্ট, কিডনিসহ মাল্টি অরগান ফেইলিউর হয়। তাই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। প্রথম দিকে অজানা রোগ এবং রোগ ব্যবস্থাপনা জানা না থাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি ছিলো। পরে রোগের কারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় চিকিৎসা গাইড লাইন প্রণয়নের মাধ্যমে ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ২০১৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৪ জনের মৃত্যু ঘটে। রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর তথ্য মতে রাজাধানীর ৭টি এলাকা অতিরিক্ত ডেঙ্গু প্রবণ। এগুলো হলো- ধানমন্ডি, কলাবাগন, কাঠালবাগান, হাতিরপুল, পান্থপথ, বনশ্রী এবং রামপুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, পূর্ব তিমুর ও উত্তর কোরিয়া ডেঙ্গু প্রকোপ অঞ্চল। দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ