প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুর্বল হলেও গোপনে সক্রিয় হুজিবি

সমকাল : ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ৪৯ আসামির মধ্যে ২৯ জনই হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) দুর্ধর্ষ জঙ্গি। ১৪ বছর পর তাদের সাজা হলেও নিষিদ্ধ ঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠন গোপনে এখনও সক্রিয় রয়েছে।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে আবারও একটি ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠনের বিভীষিকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এ সংগঠনটি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বর্বরোচিত হামলা চালায়। দেশের ইতিহাসে একটি রায়ে একসঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ সাতজন রাজনৈতিক নেতা, ১১ জন সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তা ও ২৯ দুর্ধর্ষ জঙ্গির দণ্ডিত হওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এ রায় তাই অনেকের জন্য সতর্ক সংকেত বলে বিবেচিত হতে পারে। একুশে আগস্টের রায়ের পর এখন হুজিবির আরেক অপারেশন মামলার বিচার বাকি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট হামলার পরদিনই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে আর্জেস গ্রেনেড পাওয়া গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ব্যবহূত গ্রেনেডের সঙ্গে যার হুবহু মিলও ছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি বছর কারা অভ্যন্তরে গ্রেনেড পাওয়ার ঘটনায় মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে সিআইডি। চার্জশিটে হুজিবির ১৬ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। তবে এ মামলার বিচারকাজ এখনও শুরু হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, হুজিবির জঙ্গিদের লক্ষ্য ছিল দেশজুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করা। ওই সময় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিরা কারাগারে ছিল। তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালায় জঙ্গিরা। চার্জশিট দাখিলের পর মামলাটি বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সরকারি কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, সরকারি পক্ষ চাইলে দ্রুত পেপারবুক তৈরি করে উচ্চ আদালতে এ মামলার নিষ্পত্তি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

মোশাররফ হোসেন কাজল আরও বলেন, ২১ আগস্টের হামলায় জড়িত জঙ্গিরা বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যা মামলার আসামিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। এ লক্ষ্যে তারা কারাগারের ভেতরে গ্রেনেড ছোড়ে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, হুজিবির শক্তি বর্তমানে অনেকাংশে দুর্বল হলেও দেশে সক্রিয় অন্যান্য উগ্রপন্থিকে নির্মূল করে জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ বড় চ্যালেঞ্জ। আর জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বারবারই রক্তস্রোত বয়ে যাবে। আতঙ্ক আর উদ্বেগে থাকবে দেশের জনগণ।

হুজিবির বর্তমান অবস্থা :২০১৭ সালে হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর কার্যত নেতৃত্বশূন্য সংগঠনটি। ওই বছরই হামলা চালিয়ে টঙ্গীতে মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় হুজিবির জঙ্গিরা। এতে বোঝা যায়, শক্তিশালী না হলেও তৎপরতা চালানোর মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে ওই অপারেশনে হুজিবি যেসব বোমা ব্যবহার করেছিল, সেগুলো বিশ্নেষণ করে গোয়েন্দারা বলছেন, আপাতত বড় ধরনের অপারেশন করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। এ ছাড়া এরই মধ্যে হুজিবির সদস্যদের অনেকে পুরনো জেএমবি, আবার কেউ আনসার আল ইসলামে (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি) ভিড়েছে। ১৯৮৯ সালে যশোরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকীর হাতে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি ১৯৯২ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর হুজিবির নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় অন্তত ১৩টি জঙ্গি হামলা ঘটেছে। সংশ্নিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হুজিবি দুর্বল হলেও পুরনো জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম যাতে নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দাদের সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, জঙ্গিদের সাংগঠনিক আদর্শ ভিন্ন হলেও অভিন্ন টার্গেটে প্রায়ই তাদের হামলা চালাতে দেখা যায়। আবার অনেক সময় একাধিক জঙ্গি সংগঠন একত্র হয়ে হামলা চালায়। সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জে প্রকাশক হত্যার ঘটনায় পুরনো জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম যৌথভাবে জড়িত ছিল। এদিকে, ২১ আগস্টের মামলার রায়ে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আর্জেস গ্রেনেড বিস্ম্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে পরবর্তী সময়ে দেশের জনগণ রাজনৈতিকবিমুখ হয়ে পড়বে। আদালত চান না, সিলেটে হজরত শাহজালালের (রহ.) দরগাহ শরিফ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলা, রমনার বটমূল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস বোমা ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। বিচারক রায়ে যেসব ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, তার সবক’টির সঙ্গে হুজিবির জঙ্গিরা জড়িত।

এখনও বিচার হয়নি সেই ঘটনার :২০০৪ সালের ২২ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ ও ৯০ নম্বর সেলের মাঝামাঝি জায়গায় একটি তাজা গ্রেনেড পান মিন্টু নামের একজন কর্মচারী। তিনি বিষয়টি কারারক্ষীদের জানান। একই দিন কারারক্ষী সোহেলের কক্ষে রহস্যজনকভাবে দুই লাখ টাকা পাওয়া যায়। এর পর সোহেল আত্মগোপনে চলে যান। তবে কারাগারে গ্রেনেড পাওয়ার ঘটনায় ওই বছর চকবাজার থানায় দায়ের করা মামলার কাজ শুরু করে সিআইডি। ১৪ বছর পর চলতি বছরের ৭ আগস্ট হুজিবির ১৬ জঙ্গিকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আসামিদের মধ্যে রয়েছে- সেলিম হাওলাদার, আবু বকর সিদ্দিক, আবু জান্দাল, মাওলানা মইনুদ্দিন শেখ, শাহাদাত উল্লাহ, উজ্জ্বল, আবুল কালাম আজাদ, মাজেদ ভাট, রফিকুল ইসলাম, শহিদুল্লাহ, আরিফ হাসান প্রমুখ।

রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ২৯ জঙ্গি :২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে হুজিবির যেসব জঙ্গির ফাঁসির দণ্ড হয়েছে তারা হলো- মাওলানা তাজউদ্দিন (পলাতক), হুজির সাবেক আমির ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আবদুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল, মো. রফিকুল ইসলাম সবুজ, মো. উজ্জ্বল রতন।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হুজিবির জঙ্গিরা হলো- হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (ভারতের কারাগারে), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (ভারতের কারাগারে), মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মো. ইকবাল ওরফে ইকবাল হোসেন, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) ও রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ভারতে গ্রেফতার দুই জঙ্গিকে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ