প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাজেক, যেখানে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় (১ম পর্ব)

কামাল হোসেন শাহীন : ভোরের আলো আঁধারে ঘুম ভাঙে পাহাড়ি পথের এবড়োথেবড়ো চলার অভিজ্ঞতায়। ভেবেছিলাম এই বুঝি এসে গেছি গন্তব্যে। গাড়ি চলতেই থাকে। কখনো উপরে উঠতে উঠতে আবার নেমে যায়। কিছুটা ভয়ও কাজ করছিল। দোকানের সাইনবোর্ড দেখে নিশ্চিত হই, গন্তব্য এখনো বেশ দূরে।

খাগড়াছড়ি এসে যখন আমাদের গাড়ি থামে, তখন সকাল প্রায় আটটা। মানুষজনের সিংহভাগই যে পর্যটক তা তাদের চলনে বলনেই নিশ্চিত হলাম। আমাদের টিএম( ট্যুর ম্যনেজার) জানায় আমাদের জন্য হোটেল রেডি আছে। তবে আমরা যতদ্রুত সাজেক পৌঁছুতে পারি ততই ভাল। প্রস্তাব আসে, তাহলে আর সময়ক্ষেপণ কেন? যেই কথা, সেই কাজ। সকালের নাস্তা শেষ করে যাত্রা করি মেঘের দেশে।

চান্দের গাড়িতে আমরা চারজনসহ মোট সাতজন। সাথের বাকি তিনজন অল্প বয়স্ক ছেলে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দেশ দেখতে বের হয়েছে। খাগড়াছড়ি শহর পেরুলেই গ্রামীণ জনপদ। একটিমাত্র রাস্তা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে লোকালয় থেকে জনমানবহীন পাহাড়ি বন্ধুর পথে। গাড়ি চলছে উল্কার বেগে। শুধু একটি, দুটি নয়। সারি সারি গাড়ি যাচ্ছে একই পথে। রাস্তার দুপাশে এলোমেলো পাহাড়ি বাড়িঘর। বাড়ির উঠোনে পাহাড়ি বধু লম্বা বাশঁ দিয়ে তৈরি হুক্কা টানছে আপন মনে। যেন জগতের আনন্দযজ্ঞে এক বিরাট দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত তারা। পোশাক পরিচ্ছদে সেই ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় দেখা পাহাড়িদের চিরচেনা রূপ। পুরুষদের খুব একটা চোখে পড়েনি। পরে শুনেছি তারা জুম কাটায় ব্যস্ত। রাস্তার দুধারে, ঘরের চালায় শিশুরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। এই আদিবাসী শিশুরা সকাল থেকেই অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজটি করে যাচ্ছে। পর্যটকদের কেউ কেউ তাদের দিকে চকলেট ছুঁড়ে মারছে। অবশ্য এতে চকলেট নিতে গিয়ে বড় রকমের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায়। এখানে ড্রাইভারদের গাড়ি চালাতে দেখে যে কেউ ভয়ে শিউরে উঠবে। দেখেশুনে মনে হয়েছে এই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে এমন গতিতে গাড়ি না চালিয়ে খুব একটা বিকল্পও নেই। কারণ দ্রুত গতিতে এই উপরে উঠছে তো পরক্ষণেই নিচে নেমে যাচ্ছে । পুরো পথটাকে মনে হয়েছে এক রোলার কোষ্টার । যতটুকু নামছে উঠছে তার দ্বিগুণেরও বেশি। স্পষ্টতই টের পাচ্ছি আমরা উপর থেকে আরো উপরে উঠছি,অনেক উপরে। আমাদেরকে ১৮০০ ফুট উপরে উঠতে হবে।

খাগড়াছড়ি থেকে ২১ কি.মি. পেরুলে দিঘীনালা থানা। এই দিঘীনালা হয়েই যেতে হয় সাজেক। একটি থানা সদরের প্রয়োজনীয় সকল অফিস আদালত আছে সত্য, কিন্তু আধুনিকতার অভাব বেশ লক্ষণীয়। অল্পস্বল্প লোকজনের আনাগোনা আর পাহাড়ী অঞ্চলের সমতল ভুমির স্বল্পতা শহরটিকে কিছুটা হলেও সংকুচিত করে রেখেছে। আমাদের আরো যেতে হবে ৫৯ কি.মি. যেখানে দেশের মানচিত্র শেষ হয়ে জানান দিচ্ছে অন্য আরেক দেশ।

বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর আমাদের বলা হয়, নিরাপত্তার জন্য আমাদের গাড়ি পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। সব গাড়ি একত্রিত হলেই আবার যাত্রা শুরু হয়। পথিমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে তালিকা দিতে হয় বিজিবির কাছে। অনুমতি নিতে হয় সাজেকে ঢোকার।


আমরা যখন মুগ্ধ হয়ে দুই পাশের প্রাকৃতির সৌন্দর্য নিংড়ে নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ গাড়ির গতি কমে যায়। সামনে তাকিয়ে খেয়াল করতেই দেখি লম্বা গাড়ির সারি, সকল গাড়ি থেমে আছে। ড্রাইভারের সহযোগী ছেলেটা বলে উঠে ঝর্ণায় এসে গেছি। আমরা সবাই হুড়মুড় করে নেমে পড়ি। সূর্য যেন আজ সবটুকু তীব্রতা নিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আমরা সবাই ঘেমে নেয়ে একাকার । কালবিলম্ব না করে পোশাক পরিবর্তন করে নেমে পড়ি পাহাড়ি পথে। বেশ অনেকটা পথ হেঁটে পাহাড়ের পাদদেশে নামলেই হাজাছড়া ঝর্ণা। বেশ উঁচু থেকে পাহাড়ের বুক চিড়ে নেমে আসছে পানির ¯্রােতধারা। বহু উপর থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলরাশিতে হাত পা ভিজিয়ে, কেউবা গোসল করে এক অনন্য আনন্দে আন্দোলিত হচ্ছে। ফেরার পথে পাহাড়ের বাঁকে, রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি টঙ দোকান। গরমের মাঝে একটু স্বস্তির জন্য দোকানগুলো যেন চমৎকার বিশ্রামাগার।

পাহাড়ি শিশুদের খাবার বিক্রি করার আহ্বানও বেশ দারুন, সে ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। পাহাড়ের আনাচে কানাচে কী পরিমাণ কলা চাষ হচ্ছে, তা সাজেক যেতে যেতে রাস্তার দুই পাশের বাজারগুলোতে কলার স্তুপ দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। গাছ থেকে সদ্য নিয়ে আসা পাঁকা পেপে যেন অমৃত। ডাবের পানিও ঝর্নার জলের মত তৃষ্ণা মেটায়। সকল দোকানিই নারী। দামের ব্যপারে তারা দেশের অন্য পর্যটন স্পটের মতই বেশ পরিপক্ক।
বিরতি শেষে আবার যাত্রা শুরু হয়। খাগড়াছড়ি থেকে শুরু হওয়া রাস্তা সাপের মত এঁকেবেঁকে চলছে তো চলছেই। পুরো পথে কোন শাখা রাস্তা চোখে পড়েনি। প্রায় জনমানবশূন্য রাস্তায় গাড়ি চলছে। কখনো উপরে আবার পরক্ষণেই নিচে নেমে যাচ্ছি।

এভাবেই শ্বাসরুদ্ধকর আঁকাবাঁকা পথে চলতে চলতেই একপর্যায়ে আমরা বেশ বুঝতে পারি গাড়ি উঠছে তো উঠছেই। একটু পরেই আবিষ্কার করি আমরা পৌঁছে গেছি রুইলুই পাড়ায়, সাজেকে আসা পর্যটকদের গন্তব্য। এখানে আসা প্রায় সকল পর্যটক এখানেই থাকেন। বিকেলবেলা পাহাড়ি পথে তিন কি.মি. হেঁটে চলে যায় কংলাক পাহাড়ে।

এটাই বাংলাদেশের শেষ সীমানা এবং এ অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু পর্বত। কংলাকে যাওয়া এবং থাকা কিছুটা ঝুঁকির, কারণ রুইলুই’র পর কোন বিজিবি ক্যাম্প না থাকায় অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে প্রায়ই সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয় সেই কংলাক পাহাড়েই।
চলবে—

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত