প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গা তরুণীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গা শিবিরে থেকেও আত্মবিশ্বাসী এই তরুণীর স্বপ্ন বিশ্বে সবচেয়ে শিক্ষিত রোহিঙ্গা নারীদের একজন হওয়া। ১৯ বছর বয়সী রহিমা। কিন্তু তিনি আর দশটা তরুণীর মতো নন। তার রয়েছে ভিন্ন পরিকল্পনা। রহিমা বলেন, ‘কেন এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে জীবন ধারণ করতে হবে? হয়তো একদিন রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার বিষয়ে আমি আওয়াজ তুলতে পারব।’

একসময়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড়ের কোলে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে রহিমার জন্ম। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। উদ্বাস্তু শিবির থেকে পরিত্রাণের জন্য শিক্ষাকে পাথেয় মনে করছেন রহিমা। তার ভাষায়, ‘যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, তাহলে জীবনের মতো জীবন ধারণ করতে পারব।’ রহিমা এখন বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে।

পড়াশুনার পাশাপাশি ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর শিবির এলাকায় কাজ করতে আসা সাহায্য সংস্থার কর্মী ও সাংবাদিকদের দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পরিবারের আয়ে অবদান রাখছেন রহিমা। সেই সাথে ঘরে ঘরে গিয়ে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করছেন তিনি। তার পরিকল্পনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে মানবাধিকার নিয়ে পড়াশোনা ও চূড়ান্তভাবে তার গবেষণা প্রকাশ করা।

রহিমা আক্তার জানান, তিনিসহ মাত্র অল্প কিছু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু মেয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের সমমানের বাংলাদেশি শিক্ষা সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এই কৃতিত্ব অর্জনের জন্য তাকে শিবিরের তল্লাশি চৌকি ফাঁকি এবং ভর্তির জন্য সরকারি বিদ্যালয়ের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাবিরোধী পরিস্থিতির মাঝে তার পরিবারের ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

এই তরুণীর মতে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য নিজের রোহিঙ্গা পরিচয় আড়াল করতে তিনি শুধু বাংলায় কথা বলেন এবং বাংলাদেশি মেয়েদের মতো পোশাক পরেন। তবে তাকে সবচেয়ে প্রতিকূল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয় নিজের ঘরে। তাই রহিমাকে লড়াই করতে হয় তার বাবার সাথে, যিনি মনে করেন রহিমার এখন বিয়ের বয়স হয়েছে। লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য রহিমা অনেক দিন ধরে কেঁদেছেন এবং তার বাবা-মায়ের কাছে করজোড়ে অনুনয় করেছেন।

রহিমার মা মিনারা বেগম শিশুকালে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পালিয়ে আসেন এবং কখনো বিদ্যালয়ে যাননি। তিনি তার বড় মেয়েকে পড়ানোর জন্য শুধু স্বামীকেই বোঝাননি, সেই সাথে নিজ সম্প্রদায়ের বয়স্কদের লাঞ্ছনাও প্রতিহত করেছেন, যারা মনে করেন মেয়েদের বাইরের দুনিয়ায় পাঠানো ‘পাপ’।

মিনারা বেগম এখন তার চার মেয়ের তিনজনকে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। তার আশা, পরিবারের সবাইকে তিনি শিক্ষিত করবেন। সন্তানদের পড়ালেখা করানোর বিষয়ে মিনারার যে নিষ্ঠা, তা ইতোমধ্যে প্রতিদান দিতে শুরু করেছে রহিমা। এখন সে অর্থ আয় করছেন, এবং তা পুরো পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি।

মিনারা দুঃখ করে বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা। আমাদের পায়ের নিচে কোনো মাটি নেই। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমাদের অবস্থা খাঁচায় থাকা মুরগির মতো। আমরা এমনকি, যে গাছ লাগিয়েছি তার ফলও দাবি করতে পারি না।’ তারপরও তার আশা, সন্তানরা নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে নিতে পারবে, যাতে উদ্বাস্তু হওয়ার কলঙ্ক লেগে থাকবে না।

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত