প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এ মাসে রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়বে

ডেস্ক রিপোর্ট : জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী রাজনীতি মূল মেরূকরণ পাবে এই অক্টোবরেই। একদিকে যেমন এ মাসেই নির্বাচনকেন্দ্রিক অনেক সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে; তেমনি নির্বাচনী বৈতরণী পেরুতে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে রাজনৈতিক দলগুলো। এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন মাত্রা পাবে নির্বাচনী রাজনীতি। সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামা রাজনৈতিক দলগুলোর নানা নির্বাচনী কর্মসূচি ও সভা-সমাবেশে মুখর হয়ে উঠবে দেশ। রাজনীতি তো বটেই, দেশের সবকিছুই আবর্তিত হতে থাকবে নির্বাচনকে ঘিরেই।

নির্বাচনকেন্দ্রিক অনেক সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এ মাসেই। এ মাসের শেষের দিন অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর থেকেই শুরু হবে পরবর্তি ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ক্ষণগণনা। আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন করতে চাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ২১ অক্টোবর বসছে বর্তমান জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন। সংবিধান অনুযায়ী এক সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন ডাকতে হবে। ফলে এই অধিবেশনেই বহুল আলোচিত নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারসহ নির্বাচনসংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ সংশোধনীর প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে। একইভাবে ৩১ অক্টোবরের আগেই অর্থাৎ এ মাসেই সরকারকে গঠন করতে হবে নির্বাচনকালীন সরকার।

সরকারের এসব সিদ্ধান্তে নতুন মাত্রা পাবে রাজনীতি। বিশেষ করে বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন সরকারের দিকেই তাকিয়ে সবাই। কেমন হবে সে সরকার, সেখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বা টেকনোক্র্যাট থেকে অন্য কোনো দলের কোনো প্রতিনিধি থাকবে কিনা তা চূড়ান্ত হবে এ মাসেই। এর জন্য আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সংলাপ বা আলোচনার কি হবে সেটাও জানবে সবাই। ইভিএম ব্যবহার, নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে কী ধরনের সংশোধনী আসছে তা যেমন এ মাসের শেষ অধিবেশনেই চূড়ান্ত হবে; আবার এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে নির্বাচনী রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয় তাও দেখা যাবে এ মাসেই।

পাশাপাশি নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাবও প্রকাশ পাবে এ মাসে। নির্বাচনসংক্রান্ত অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান সরকার বা ক্ষমতাসীনরা কীভাবে করে এ মাসেই তা জানবে সবাই; তেমনি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের কী ধরনের অংশগ্রহণ থাকে তাও স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা এই দুই দলের বাইরে জোট রাজনীতির মেরুকরণও স্পষ্ট হবে। তেমনি যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কোনোদিকে মোড় নেয় তাও এ মাসেই জানতে পারবে সবাই। নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী কী বিএনপির জোটের সঙ্গেই থাকবে নাকি দলটি স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে রাজনীতি করবে তাও স্পষ্ট করতে হবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে।

এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণও চলছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষ করে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা আর নিলেও সেক্ষেত্রে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই

নাকি মুক্ত অবস্থায়; সে প্রশ্নই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। সেক্ষেত্রে সামনে চলে আসছে সব দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গটিও। তাছাড়া আগামী ১০ অক্টোবর বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করেও বিশেষ মাত্রা যুক্ত হবে নির্বাচনী রাজনীতিতে। কেননা এই হামলার জন্য বিএনপিকেই মুলত দায়ি করে আসছে সরকার এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানসহ অভিযুক্তদের অনেকেই এই দলের শীর্ষ নেতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরকে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে খুব সাবধানে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ মাসেই বোঝা যাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের মনোভাব। মূলত এ মনোভাবকে কেন্দ্র করেই দেশের নির্বাচনী রাজনীতির রূপ প্রকাশ পাবে। একইভাবে বিএনপিকেও খুব সতর্ক থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নানা কারণে দলটি কোণঠাসা। হাতে সময়ও কম। সুতরাং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যাতে সময়ক্ষেপণ হয়। মূলত এ মাসই হবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য নেওয়া পরিকল্পনার উপযুক্ত সময়।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আমাদের লক্ষ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা। জনগণ আমাদের ভোট দেবে। কারণ আমাদের উন্নয়ন অর্জন, শেখ হাসিনা সরকারের জনপ্রিয়তা এবং নেত্রীর প্রতি দেশের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে। ফলে নির্বাচন বানচালের কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মেনে নেওয়া হবে না। সহিংসতাকে বরদাশত করা হবে না। এজন্য অক্টোবর থেকেই আমরা মাঠে অবস্থান নেব।

অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির এখন প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। তিনি মুক্ত হওয়ার পরই আমরা নির্বাচনের চিন্তা করব। সরকার যদি জনগণের দাবি মেনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে তাহলে তাতে অবশ্যই আমরা অংশ নেব। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ আমরা সব সময়ই চাই, সেটা অক্টোবরেই হোক আর অন্য কোনো মাসেই হোক।

তবে এ মাসে নির্বাচনী রাজনীতি যে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে তার আভাস মিলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নির্বাচনী কর্মসূচি ঘোষণায়। গত শনিবার রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে ১৪ দল আয়োজিত কর্মী সমাবেশ থেকে জোটের মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। ৯ অক্টোবর রাজশাহী, ১০ অক্টোবর নাটোর ও ১৩ অক্টোবর খুলনায় ১৪ দল সমাবেশ করবে। পরে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে এই অক্টোবরেই ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ক্ষমতাসীনরা। এই কর্মী সমাবেশ থেকে দলের নেতারা আন্দোলনের নামে যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করবে তাদের ধরিয়ে দেওয়া ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি বিএনপি অক্টোবর থেকে মাঠে থাকার যে ঘোষণা দিয়েছে তাও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ গরম করার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, গতকালের সমাবেশ থেকে নির্বাচনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নানা নির্বাচনী দাবিতে আগামী ৩ অক্টোবর সব জেলায় ও ৪ অক্টোবর মহানগরীগুলোতে সমাবেশ করবে। এছাড়া অক্টোবরজুড়েই রাজপথে গরম কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১ অক্টোবর থেকে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। তিনি গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এবার সরকারকে খালি মাঠে গোল দিতে দেওয়া হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আমরা আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণ করে এ সরকারকে অপসারিত করব। তা করব শান্তিপূর্ণভাবে ভোটের মাধ্যমে। কোনো ভায়োলেন্সের মাধ্যমে নয়।’

এমনকি এ অক্টোবরেই খোলাসা হবে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার রাজনীতি। এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তার আভাসও মিলবে এ মাসে। কেননা নির্বাচনে যেতে হলে এ মাসেই এই জোটকে তাদের নির্বাচনী লক্ষ্য প্রকাশ করতে হবে। বিশেষ করে বিএনপিকে জোটে নেবে কিনা তা স্পষ্ট করতে হবে। তবে এই জোটের দিকে সতর্ক নজর রেখেছে ক্ষমতাসীনরাও। শনিবারের সমাবেশ থেকে ১৪ দলীয় জোটের নেতারা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে থাকা ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ বলে দাবি করেছেন এবং এই ঐক্য প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগের সমাবেশের ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় ঘোষণার কথা ১০ অক্টোবর। এ মামলার আসামিদের মধ্যে তারেক রহমানসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা ও ঘনিষ্ঠদের নাম রয়েছে। এ নিয়ে বিএনপিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। রায় ঘিরে কঠোর কর্মসূচির প্রস্তুতি রয়েছে দলের। একইসঙ্গে সহিংসতা করলে রাজপথেই প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

এ মাসের শেষ সপ্তাহে গঠন হবে নির্বাচনকালীন সরকার। বিএনপি বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকার গঠনের দাবি করে আসছে। সংবিধানের বাইরে যেতে নারাজ সরকার। ফলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন পরবর্তী রাজনীতি কেমন হয় তাও জানা যাবে এ মাসেই।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। তারা সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত তারা। বিশেষ করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘিরে এখন থেকেই সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। নিরাপত্তায় কোনো রকম ঝুঁকি নেবে না আওয়ামী লীগ।

বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের এসব কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগও। দলের নেতারা বলেছেন, বিগত সময়ে বিএনপি রাজপথে নেমেই মানুষ হত্যা, জ্বালাও পোড়াও করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের কোনোভাবেই মাঠ দখলে নিতে দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সন্ত্রাস-সহিংসতা করলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে প্রতিহত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। -প্রতিদিনের সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত