প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্দলীয় না নিরপেক্ষ?

ডেস্ক রিপোর্ট : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে গত ৯ বছর ধরে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানিয়ে আসছিল বিএনপি। কিন্তু রবিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের উদ্দেশে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। সেখানে তিন নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পদত্যাগ ও সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা।’ এমনকি জনসভার ব্যানারেও ‘নির্দলীয়’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এরপর বিএনপি দীর্ঘদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসে বিএনপি। এরপর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানায় বিএনপি। এখন দলটি সেখান থেকে সরে এসে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে। কেন নির্দলীয় শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে- এ নিয়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার শব্দের মধ্যে অর্থের কোনও পাথক্য নেই। কারণ বিএনপির দাবি হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারে কোনও দলের নেতাকে প্রধান করা যাবে না। অর্থাৎ নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমারা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি জানিয়ে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। সাত দফা দাবি থেকে কেন নির্দলীয় শব্দটি কেন বাদ দেওয়া হয়েছে আমি জানি না। তবে নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ সরকারের মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না।’
দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘আমাদের দাবি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার। এখন লিখিত দেওয়া দাবিগুলোতে হয়তো কোনও কারণে নির্দলীয় শব্দটি বাদ পড়েছে। এটা মেজর কোনও সমস্যা নয়।’

দলটির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান শাশসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ শব্দের অর্থের কোনও পার্থক্য নেই। আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার শব্দটি রাখতাম। কিন্তু বাদ দিয়েছিলাম এই কারণে যে শব্দটি হাইকোর্ট বাদ দিয়েছিলেন বলে।’
তিনি বলেন, ‘যে নামেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হোক- এ নিয়ে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। আমাদের দাবি হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকারে কোনও দলের সভাপতি বা সভানেত্রীকে রাখা যাবে না।’

প্রসঙ্গত, রবিবারের সমাবেশে দলটির পক্ষে দাবিনামা হিসেবে সাত দফা ও ১১টি লক্ষ্য ঘোষণা করেন সমাবেশের সভাপতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। উল্লিখিত সাত দফা হচ্ছে
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই-
১. দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,
২. জাতীয় সংসদ বাতিল করা
৩. সরকারের পদত্যাগ ও সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা
৪. সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ নিশ্চিত করা
৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান নিশ্চিত করা
৬. যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যব্ক্ষেক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যব্ক্ষেণে তাদের ওপর কোনও ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ না করা।
৭.
ক) দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,
খ) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনি ফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনও মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা
গ) পুরনো মামলায় কাউকে গ্রেফতার না করার নিশ্চয়তা
ঘ)কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মতপ্রকাশের অভিযোগে ছাত্র-ছাত্রী, সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা।

বিএনপির ১১ লক্ষ্য
১. রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা
২. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলীয়করণের ধারার বদলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা
৩. রাষ্ট্র ক্ষমতায় গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা
৪. স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা
৫. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করা
৬. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
৭. কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও অধিকতর কার্যকর করা
৮. সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা
৯. ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এই মূলনীতিকে অনুসরণ করে জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। বিশেষ করে প্রতিবেশী সুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১০. কোনও ধরনের সন্ত্রাসবাদকে প্রশয় না দেওয়া এবং কোনও জঙ্গি গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া
১১।
ক. নিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবনমান নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বেতন-মজুরি নির্ধারণ ও আয়ের বৈষ্যম্যের অবসানকল্পে সমতাভিত্তিক নীতি গ্রহণ এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার-ভাতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যবীমা চালু, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, শিল্প-বাণিজ্য ও কৃষির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও আধুনিক করা
খ. স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক এবং উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে জীবনমুখী শিক্ষানীতি চালু, প্রযুক্তি-বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে মানবসম্পদের উৎকর্ষ সাধন, জাতীয় উন্নয়নের সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা নিশ্চিত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জীবন, সম্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
গ. তৈরি পোশাক শিল্পের অব্যাহত উন্নয়ন এবং শিল্প ও রফতানি খাতকে বহুমুখী করা, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে উন্নয়নের ধারাকে গ্রামমুখী করা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, ঝুঁকিমুক্ত ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিভার বিকাশ ও তাদের আধুনিক চিন্তা-চেতনাকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানোর জন্য শিক্ষা, তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

সর্বাধিক পঠিত