প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে রানা দাশগুপ্তের ভাগ্যে কী জুটেছিল?

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে

 

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিলো; ক্ষমতায় গেলে তারা যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করবে। ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সক্ষম হয় এবং পুরনো হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ে ট্রাইবুনাল গঠন করতে চায়। সে বিষয়ে শফিক আহমেদ ও জাস্টিস আবদুর রশিদসহ আমি কাজ করি, কেননা শফিক আহমেদ প্রসিকিউটর ও জজ নির্ধারণে আমাদের সহযোগিতা চান। আমি ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আইনজীবী রানা দাশগুপ্তের নাম অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাব করি। মোহাম্মদ নিজামুল হককে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হয়, কারণ তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতীকী ‘গণআদালত’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সবুজ সংকেত পেয়ে আমি রানা দাশগুপ্তকে দ্রুত ঢাকায় চলে আসার অনুরোধ জানাই। আমি তাকে আবদুর রশিদের বাসায় নিয়ে যাই এবং সেখানে আমাদের অনেক আলোচনা হয়। রানা দাশগুপ্ত চট্টগ্রামে তার ভালো প্র্যাকটিস ছেড়ে আসতে চাননি। তবু অনিচ্ছায় আমাদের প্রস্তাবে রাজি হন। সেটা আইনমন্ত্রীকে জানানো হয়। অথচ দেখা গেলো, অজানা কারণে রানা দাশগুপ্তকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো। তারপর আমরা তাকে চীফ প্রসিকিউটর করার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু টিপু সুলতানকে সে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কারণ আইনমন্ত্রীসহ উপর পর্যায়ে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো, যদিও তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ্য। এমনকী দেখলাম, রানা দাশগুপ্তকে প্রসিকিউটর তালিকাতেও রাখা হয়নি।

বলা বাহুল্য, রানা দাশগুপ্তকে রাজি করাতে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল এবং সেভাবে আমি তাকে ঢাকা আসার অনুরোধ জানাই। ট্রাইব্যুনালের সংবিধান প্রণয়নে নিজামুল হকের সঙ্গে অপর দুই সদস্য ছিলেন এটিএম ফজলে কবির ও অবসরপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট জজ একেএম জহির আহমেদ। রানা দাশগুপ্তের পরিবর্তে জহির আহমেদকে নেয়া হয়। সেটা ছিল মন্দ বাছাই, যাতে সরকারের পরে টনক নড়ে। কিন্তু ততোটা সময়ে অনেক ভুল ঘটে গেছে। ট্রাইব্যুনালের কাজ যথাযথভাবে এগোয়নি। মো. নিজামুল হক অযথা সুদীর্ঘ রায় লিখে সময়ক্ষেপন করেছেন, এমনকী ছোটো আবেদনের নিষ্পত্তিতেও। স্বাভাবিকভাবেই তা ট্রায়ালে বিলম্ব ঘটায়। এটা ট্রাইবুনাল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব, ট্রাইবুনাল প্রশাসন ও কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা।

সাধারণভাবে ধারণা ছিল, মূলত প্রয়াত আমিনুল হকের সঙ্গে সুদীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে নিজামুল হকের ক্রিমিনাল ল সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে কেস হ্যান্ডলিংয়ে অনুকূল ফলাফল পাওয়া যাবে। সবাই ভেবেছিলো, ভালো পছন্দ। কিন্তু ফল বিরূপ হয়। তিনি সারাবছরে একটা কেসেরও ট্রায়াল শেষ করতে পারেননি। তাকে অ্যাপিলেট ডিভিশনে পদোন্নতি দেয়ার জন্য তিনি থেকে থেকেই আমাকে তাগাদা দিতেন, এমনকী একই সময়ে প্রধান বিচারপতি বা সমমর্যাদার পদে আসীন হতে লবিং করেন। তিনি যখনই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, তাকে বলতাম, অন্তত এক বা দুইটা কেসের নিষ্পত্তি করুন। অন্তত একটা না করলে পদোন্নতি হবে না।

অবশেষে ট্রায়াল গতিসম্পন্ন না হওয়ায় আইনমন্ত্রী, এয়ার কমোডর (অব.) একে খন্দকার, পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের চেয়ারম্যান আরেকটি ট্রাইবুনাল গঠন করতে চান। তথাপি দেশ চলছিলো সংসদীয় সরকারের অধীনে, কেবলমাত্র কাগজে। এমনকী ১৯৯১ সালে সরকারপদ্ধতি সংবিধানে সংশোধন করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে সুসংহত করা হয়। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি আমল, সব সিদ্ধান্তই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নেয়া হতো। তাই নীতিনির্ধারণে আইনমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রয়োগের যৎসামান্যই এখতিয়ার ছিল। শফিক আহমেদ ও একে খন্দকার আরেকটি ট্রাইবুনাল গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী সহসাই তা বাতিল করে দিলেন এই বলে যে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, যাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিটি রক্ষা করা হয়। তাই এতে সফলতা আসার সম্ভাবনা ছিল অনেকটাই ক্ষীণ। পরে আমি জেনেছি, দুইজন সিনিয়র মন্ত্রী একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি, যখন প্রধানমন্ত্রী তা নাকচ করাসহ তাদের ভগ্নহৃদয়ে ফিরিয়ে দেন।…নিজেরও জাতির প্রতি কর্তব্য রয়েছে। ভাবলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশ স্বাধীন না হলে নিজে হয়তো বড়জোর স্কুলশিক্ষক কিংবা আইনজীবীই থাকতাম।

দ্রষ্টব্য: এই ধারাবাহিকে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার রচিত বইয়ের অষ্টম অধ্যায়ের চুম্বকাংশ তুলে ধরা হয়েছে। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত