প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

পীরালির কারিশমা ও রাজনীতির ভণ্ডামি

হাসানুল কাদির : পীর সাহেব হুজুর। কত শ্রদ্ধা, কত মর্যাদা, কত ভালোবাসার সম্বোধন! এই বাংলাদেশে শুধু নয়, ইনডিয়া পাকিস্তানেও পীর সাহেব হুজুরদের কদর সমানে সমান। বাংলাদেশি মানুষ হিসেবে নিজের দেশকে এক্ষেত্রে আমি এগিয়ে রাখার পক্ষে। মানে, অন্য দেশগুলোর তুলনায় এদেশে পীর সাহেব হুজুরদের কেরামতি বেশি জাহির করা হয় বলে এসব হুজুরদের প্রতি আমজনতার আকর্ষণও বেশি।

পবিত্র মক্কা-মদিনা তথা ইসলামের উৎসভূমিতে কোনো পীরালি-ফকিরি নেই। এমনকি গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই উপমহাদেশীয় ব্রান্ডের কোনো পীর-ফকির-হুজুর নেই। আছেন অসংখ্য আল্লাহওয়ালা সুমহান মানুষ। অভাব নেই, ইসলামে দক্ষ ও অভিজ্ঞ, তা জ্ঞানে এবং আমলে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায় এবং নিজের জীবনে বাস্তবায়নে-সব দিক থেকেই অতুলনীয় বহু অলি-বুজুর্গ-গাউস-কুতুব। তাদের সেসব দেশে কোনোভাবেই পীর বলা হয় না। এমনকি পীরদের তরফে আমাদের দেশে যা তাদের মুরিদদের মধ্যে প্রচার করা হয় এবং মুরিদদের দিয়ে যা করানো হয়-এমন কোনো ঘটনা বা কাণ্ডের অবতারণাও সেখানে কল্পনা করা যায় না। সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট বরেণ্য ব্যক্তিরা নিজেদের নিয়ে এমন কিছু হচ্ছে জানলে আত্মহত্যা করে হলেও আল্লাহর দরবারে নিজেকে গোনাহগার বলে ক্ষমাভিখারি হবেন। জি, এটাই বাস্তবতা! বিশেষ দ্রষ্টব্য, ইসলাম আত্মহত্যা সমর্থন করে না।

একটি নজির তুলে ধরি। বছর কয়েক আগে চরমোনাইর দুই নম্বর পীর ফয়জুল করীমকে সউদি আরবে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কারণ, সেখানে গিয়েও তিনি বাংলাদেশি স্টাইলে পীরালি শুরু করেছিলেন। তারা সউদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থমাফিক বাংলাদেশি ভক্ত-মুরিদান দিয়ে অবশ্য আরও আগে থেকেই পীরালি করেন। তা করতেন খুবই সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে। অনেকটা যেমন বাংলাদেশে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন আমলের ঘরোয়া পলিটিকস চর্চার মতো। বরং তার চেয়ে আরও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। চরমোনাইর দুই নম্বর পীর ফয়জুল করীমকে সেখানে গ্রেফতারের খবর বাংলাদেশের মিডিয়াতেও প্রচার হয়েছিল। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর অবশেষে কোনো কেরামতি বা ঝাড়-ফুতে নয়, বিশেষ তদবিরে তার মুক্তি মিলেছিল। তিনি দেশে ফিরেছেন।

জনাব ফয়জুল করীমকে আমি ভাই বলি। তিনিও ভাই বলেই সম্বোধন করেন। ব্যক্তিগত মূল্যায়নে, তিনি ভালো। চরমোনাইর মরহুম অর্থাৎ মরা পীরের ছেলে এবং জিন্দা পীরের ছোট ভাই হওয়ার কারণেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। ওই দুই পীরের তুলনায় জ্ঞানে-গুণে ফয়জুল করীম ভাই এগিয়ে। চরমোনাইর পীর রেজাউল করীম সাহেবের সঙ্গেও কয়েকবার সাক্ষাৎ-সাক্ষাৎকার হয়েছে। একাত্তর টিভির জন্য একটি ডকুমেন্টারি তৈরিতে তাঁর কমেন্ট নিতে গিয়েছিলাম পীর সাহেবের দলীয় অফিসে। ঐ উপলক্ষে পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে বেশ কিছু দিন আগে একসঙ্গে এক দসতরখানে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল। চরমোনাইর মরহুম পীর মাওলানা ফজলুল করীম সাহেবের সঙ্গেও সম্পর্ক এবং পেশাদারি যোগাযোগ ছিল। তা ১৯৯৪ সাল থেকেই। বয়স তখন আমার ১৬ বছর। লিখিত আকারে নয়, তাঁর মুখোমুখি ইন্টারভিউ নিয়েই কয়েকবার বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করার সুযোগ হয়েছে। দুঃখিত, তাঁর জানাজা নামাজে শরিক হতে পারিনি। সাংবাদিকতার পেশাদারি দায়িত্বের কারণে তাদের বহু ঘটনা-দুর্ঘটনা-রটনা-গুঞ্জন-কেরামতির সাক্ষী হতে হয়েছে। তাই এখন ইতিহাস। সেই ইতিহাস গৌরবের সৌরভের যেমন, তেমনি লজ্জাকেও হার মানায়!

চরমোনাইর পীর পীরালির পাশাপাশি রাজনীতি করেন। তা শুধু চরমোনাইর পীর নয়, ব্রান্ড এবং ননব্রান্ডের আরও অসংখ্য পীর রাজনীতির মাঠে খেলাধুলা করেন। ফরিদপুরের আটরশির পীরও জাকের পার্টি বানিয়েছিলেন। ছেলে মোস্তফা আমীর ফয়সালকে পার্টির চেয়ারম্যানিও দিয়ে গেছেন। গোলাপফুল মার্কায় ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে যদ্দুর জানি, তিনটি আসনেও তাদের জামানত রক্ষা হয়নি। সেই আটরশির পীরের খাস মুরিদ এবং ভক্ত ছিলেন প্রেসিডেন্ট (ওই সময়) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পীর সাহেবদের দোয়ায় এরশাদ সাহেবেরা নাকি ক্ষমতায় চলে যান, ক্ষমতায় টিকে থাকেন, আরও কতশত ভাবগম্ভীর বিশ্বাস। তাই যদি বাস্তব হবে, তাহলে আটরশির পীর নিজের ছেলেকে প্রেসিডেন্ট বানালেন না কেন? নিজেরই বা প্রেসিডেন্ট হতে বাধা ছিল কী? নাকি আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেসিডেন্ট হতে মুসলমানদের নিষেধ করে গেছেন!

বলছিলাম, চরমোনাইর পীরের কথা। দুই পীরের লড়াই। বিশাল রিপোর্ট। ঢাকার একটি ট্যাবলয়েড দৈনিকের রিপোর্টের কথা মনে হলো। দুই পীর মানে দেওয়ানবাগ এবং চরমোনাই। কয় দিন কী উত্তাপই না ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই পীরের ভক্ত-মুরিদদের মধ্যে। পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ। মুখোমুখি মিছিল। শেষতক মারামারি। কয়জন মরেছিল, ঠিক এই মুহূর্তে মনে আসছে না। মামলা তো এখনও ঝুলছে। মামলা কি দুই পীরের নামে? নাহ। মামলা হয়েছে সেই বিনাহিসাবে জান্নাতলোভি মুরিদদের নামে। আরও…
কুতুববাগের পীর জাকির শাহ। খাতিরের মানুষ। নরম কোমল মিষ্টি হাসেন। সুফিসম্রাট দাবি করেন দেওয়ানবাগের পীর মাহবুবে খোদা। সে কারণে কুতুববাগের জাকির শাহ জমানার মুজাদ্দিদ এবং আরও অনেক কিছু। এরশাদ সাহেব এখন বেশি যাতায়াত করেন এই জাকির শাহর কাছে। বুঝি না, কেন তিনি পীর সাহেবের দোয়ায় বা কেরামতিতে আরেকটি বারের জন্য প্রেসিডেন্ট হতে পারছেন না! নাকি জাকির শাহ ভণ্ড?

এরশাদ সাহেব কওমি সিলসিলার সুপারস্টার পীর যাত্রাবাড়ির হুজুর মাহমূদুল হাসানের দরবারেও যাতায়াত করেন দীর্ঘদিন থেকেই। কুতুব, পীরে কামেল, আল্লামা, হাক্কানি, মুহিউস সুন্নাহ, শায়খ, জমানার থানুভি কত শত লকব ব্যবহার করেন মাহমূদুল হাসান সাহেব। তার ভক্ত-ছাত্র-শিক্ষকেরাও বিশ্বাস করেন, এই যাত্রাবাড়ির হুজুরই দেশ চালান। তিনি হাসিনাকে চাইলে হাসিনা, খালেদাকে চাইলে খালেদা ক্ষমতায় যান। এরশাদকে চাইলে এরশাদও মুহূর্তেই ক্ষমতায় বসবে। কিন্তু হুজুর চান না। এমনকি হুজুর চাইলে আপনাকেও ক্ষমতা দিয়ে দিতে পারেন। হুজুরের আঙুলের ইশারায় সব হয়। এত্ত বড় বড় তিন ব্রান্ড পীর সম্পর্কে আরেক ব্রান্ড পীর কুতুববাগের জাকির শাহর মন্তব্য, এরা বাতিল। এসব ব্রান্ড পীরের দরবারে দীর্ঘদিন ঘুরে ঘুরে এরশাদ সাহেবরা যে কী পান-আল্লাহ মালুম। তবে, এরশাদ সাহেবদের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি এবং আরও মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রী-এমপিরা এসব পীরদের কাছে যাতায়াতের কারণে সংশ্লিষ্ট পীরেরা অনেক লাভ করেন। বহুমুখী ক্ষতির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। এরশাদ সাহেবরা কি তা বুঝেন?

দেশজুড়েই নির্বাচনের ধুমধাম। হাতে বলতে গেলে কারও সময় নেই। বিশেষ করে রাজনীতিকদের ঘুম তো আরও আগ থেকেই হারাম হয়ে আছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে আরামে আছেন। তারেক রহমান লন্ডনে বসে বাংলাদেশের টুকটাক খবর রাখছেন। খালেদার আরামের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার। তারেকের টুকটাক খবরদারির কারণে বেচারা বিপদে পড়তে পারেন। এই বার্তা তাকে দেওয়া হয়েছে। ফলে, তিনিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত লন্ডনে ঘুমাচ্ছিলেন। ড. কামাল এবং ডা. বি চৌধুরীদের চোখেমুখে ঘুম নেই। কী বিশাল চান্স! এই চান্স কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তাই, কোমরবেঁধে বা গলায় গামছা ঝুলিয়ে নয়-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নাম দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতির যুদ্ধে মানে দুই জনই প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রী হতে দৌড়ে আছেন। ইনডিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালাম বলেছেন, সেটা স্বপ্ন নয়, যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে। যে স্বপ্নের কারণে চোখে ঘুম আসে না, সেটাই প্রকৃত স্বপ্ন। জনাব আবদুল কালামের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বাস্তবে ড. কামাল এবং বি চৌধুরী সাহেবদের দেখলে যে কেউ সাপোর্ট করবেন।

বাংলাদেশি রাজনীতির বিশাল স্টেডিয়ামে খেলতে নেমেছে চরমোনাইর পীরের দলও। হাতপাখা মার্কায় তারাও নাকি এবার ৩০০ আসনেই লড়বে। মিছিলে তারা স্লোগান দিচ্ছে, আমার ভাই তোমার ভাই, পীর সাহেব চরমোনাই। দুর্মুখেরা বলছেন এভাবে- আমার ভাই তোমার ভাই, পীর সাহেব চিন্তা নাই। তাদের ব্যাখ্যা, আটরশির পীর বহু আগেই ৩০০ আসনে গোলাপ ফুল (১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসার সঙ্গেও যার বিশেষ সম্পর্ক এবং সংযোগ আছে) মার্কায় ইলেকশন করে যেহেতু জামানত রক্ষায়ও ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান বাংলাদেশি রাজনীতির বিশাল চান্সে বড়জোড় চরমোনাইর পীরের দুইচার জন প্রার্থীকে দ্বিতীয়/তৃতীয় পজিশনে দেখা যেতে পারে। ফলে পীর রেজাউল করীম এবং ফয়জুল করীম দুই ভাইয়ের আসলেই চিন্তা নাই। দোয়া চাই, পীর সাহেব চরমোনাই।

লেখক: সাংবাদিক ও সিইও, রেডগৃন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত