প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

জামায়াত-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন, অস্ট্রেলিয়া থেকে: নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে জোটের রাজনীতি জমে উঠেছে। বর্তমান রাজনীতির ব্যক্তিসর্বস্ব কতিপয় ক্ষুদ্র দল মিলে সম্প্রতি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছে। তার সাথে গণফোরাম মিলে হয়েছে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। একসময়ের হেভিওয়েট নেতা ও পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতি থেকে করুণভাবে বিতাড়িত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আওয়ামী রাজনীতিতে অপাংক্তেয় হয়ে পরবর্তীতে নখ-দন্ত-বিষহীন গণফোরাম গঠন করে দুই যুগের বেশী সভাপতি হিসেবে থাকা ড. কামাল হোসেন, এবং রাজনীতিতে দিশাহীন-গন্তব্যহীন আ স ম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমানরা মিলে এই নয়া রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করেছেন।

বর্তমান রাজনীতির মহাসমুদ্রে কুলকিনারাহীন, মাইনকার চিপায় থাকা বিএনপিও অনেকটা আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার জোটে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সামিল হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে এখনো জোটবদ্ধ হয়নি। ইতিমধ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর নাট্যমঞ্চে ঐক্য প্রক্রিয়ার সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা যোগদান করেছেন, বক্তৃতাও করেছেন। ওই সভার আগের দিন বিএনপি নেতৃবৃন্দ বারিধারায় গিয়ে ষোল বছর আগে কৃত অন্যায়ের জন্য ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কাছে ক্ষমাও চেয়ে এসেছেন। পত্রিকায় মঞ্চে নিদ্রামগ্ন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের ছবি ছাপালেও উপস্থিত দর্শকম-লির ছবি চোখে পড়েনি। তবে ঢাকা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, মিলনায়তন ভর্তি ছিল প্রধানত বিএনপি এবং জামায়াতের লোকজন দিয়ে।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন বিশদলীয় ঐক্যজোটের যোগ দেবার মাঝখানে সামান্য একটা সাসপেন্স কাজ করছে। ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে ঐক্য প্রক্রিয়ার জোটে সামিল হতে বলেছেন। বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরীও জামায়াতের বিপক্ষে সোচ্চার। এক সময় জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সংসদে এমপি হিসেবে থাকলেও এখন তিনি আর জামায়াতকে সহ্য করতে পারছেন না। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মাহী বি চৌধুরী বা ড. কামাল হোসেনদের এহেন জামায়াত বিরোধিতা শুনতে বা দেখতে ভাল লাগলেও এটা কি আদৌ সত্যি? নাকি স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীপুষ্ট জামায়াত-শিবিরবিরোধী তরুণ প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে ধোঁকা দেওয়ার একটা অপচেষ্টা?

উনিশশো একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মিত্র ছিল এদেশীয় ঘাতক রাজাকার-আলবদররা। এদের রাজনৈতিক গুরু ছিল জামায়াতে ইসলামী। এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই যে শুধু চায়নি তা নয়, বরং যুদ্ধের সময় হত্যা-ধর্ষণের মত নানাবিধ যুদ্ধাপরাধ সংগঠনে সহায়তা করেছিল। স্বভাবতই স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। সে সময়ে জামায়াতে ইসলামীর কতিপয় শীর্ষনেতা পাকিস্তানে নির্বাসনে চলে যায়। যারা নির্বাসনে যেতে পারেনি বা গ্রেফতার এড়াতে পেরেছিল, তারা তখন নানাভাবে আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চে আশ্রয় নিয়েছিল। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে ১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জামায়াতে ইসলামীর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। দলটির নেতাকর্মীরা ফিরে আসার অনুমতি পায় এবং ১৯৭৯ সালের মে মাসে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামী যে বাংলাদেশে কখনো উল্লেখযোগ্য হারে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জন করতে পারবে না, এটা তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররা শুরুতেই জানতো। এই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তির জন্য অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপি’র জন্ম হয়েছিল।

দল হিসেবে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদা হলেও রসুনের মত তাদের রাজনৈতিক গোড়া কিন্তু একই জায়গায়। জন্মের পর থেকে আজ অব্দি দলদুটোর শীর্ষ নেতারা কথায়-আচরণেও বারবার এটি প্রমাণ করেছেন। বিএনপি নেতা তারেক রহমান প্রকাশ্যেই বলেছেন, ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল একই মায়ের দুই সন্তান। জামায়াত ও বিএনপির নেতারা এখনো পরস্পরের রাজনৈতিক সখ্যের কথাই বলছেন। বিএনপির কৌশলী রাজনৈতিক অবস্থান এখানে ‘আগারটাও খাবো, আবার গোড়ারটাও’। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে আলোচনার সময় বিএনপি জামায়াতকে সাথে রাখছে না, তবে বিশদলীয় জোটে জামায়াত ঠিকই আছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে, ফলে দলীয় প্রতীক দাড়িপাল্লাা প্রতীকে তাদের নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সুতরাং, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের বিনপির মাঝে মিশে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নাই। রাজনীতির বৃহৎ গাণিতিক হিসেবে জামায়াত-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই সত্য ড. কামাল হোসেন এবং প্রাক্তন বিএনপি নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীও জানেন। প্রকাশ্যে জামায়াতকে দূরে রাখলেও বাস্তবে তাকে পৃথক করা সম্ভব নয়। তারপরও জামায়াতবিরোধী ভোটার বিশেষ করে তরুণদের ভোট পাবার জন্য ঐক্য প্রক্রিয়ার এটি একটি আপাত রাজনৈতিক অপকৌশল। তবে বিএনপি-জামায়াত-ঐক্য প্রক্রিয়ার সম্মিলিত এই অপকৌশলের সাফল্য এখন অনেকটা ঝুঁকির মুখে। বর্তমানে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে আমজনতা এখন আর অতটা বোকা নয় যে, জামায়াতবিহীন বিএনপি বললেই বিশ্বাস করবে। সেক্ষেত্রে এইসব লুকোচুরি বাদ দিয়ে বিএনপি এবং ঐক্য প্রক্রিয়ার উচিত জামায়াতকে নিয়েই প্রকাশ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা। বিশেষ করে লড়াইটা যখন আওয়ামী লীগের সাথে আওয়ামী বিপক্ষ শক্তির, তখন আর এত রাখঢাক কীসের?

লেখক : কলামিস্ট ও চিকিৎসক। চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত