প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

শিল্পে ফিরেছে প্রাণ

ডেস্ক রিপোর্ট : শিল্প-কারখানায় উৎপাদনে এবার ফিরে এসেছে প্রাণ। বৃহত্তর চট্টগ্রামে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সুবাদে দীর্ঘদিন যাবত অচল থাকা কল-কারখানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ফের সচল হয়েছে। বিনিয়োগকারী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছে। চট্টগ্রামে বিনিয়োগ-শিল্পায়নে খরা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা ফিরে পেয়েছেন কর্মচাঞ্চল্য। বছরের পর বছর গ্যাস সঙ্কটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্পখাতে দৈনিক কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছিল। এবার শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে রফতানি এবং অভ্যন্তরীণ পণ্যের চাহিদা পূরণ করা যাবে, শিল্প-সমৃদ্ধ চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ফিরবে এমনটি আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।

দীর্ঘ ৯ মাস বন্ধ থাকার পর এলএনজি সরবরাহের সুবাদে উৎপাদনের চাকা সচল হয়েছে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত বৃহদায়তন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানায় (সিইউএফএল)। ইতোমধ্যে সেখানে বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার লিঃ (কাফকো), শিকলবাহা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রাউজানের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় স্বাভাবিকের প্রায় কাছাকাছি উৎপাদন শুরু হয়েছে। রফতানিমুখী পোশাকশিল্প, নিটওয়্যার, কম্পোজিট টেক্সটাইল ও অন্যান্য কারখানায় উৎপাদন সচল হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সচলের ফলে বিদ্যুৎচালিত কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকগুলো শিল্প, কল-কারখানা সার্বক্ষণিক উৎপাদন ব্যবস্থার লক্ষ্যে গ্যাস চালিত ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু করাও সম্ভব হয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিঃ (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এলএনজির উৎস থেকে দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে যোগ হচ্ছে আরও ৫ কোটি ঘনফুট। এলএনজির উৎস থেকে সরবরাহ পাওয়া গ্যাস দিয়ে পুরোপুরি কর্ণফুলী তথা চট্টগ্রামের শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ক্রমেই এলএনজির উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আরও বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে কারিগরি সক্ষমতা এবং ব্যাপক হারে আমদানি হলে এলএনজি থেকে প্রাপ্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিড লাইনের মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয় দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ১৪ আগস্ট থেকে কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ীতে অবস্থারত টার্মিনালযুক্ত বিশেষায়িত জাহাজের এলএনজি পাইপলাইনের মাধ্যমে আনোয়ারা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সরবরাহ শুরু হয়। শুরুর দিকে দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট এবং গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মিলছে। সেই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের আংশিক ৫ কোটি যুক্ত হয়ে এখন ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস মিলছে। ইতোপূর্বে চট্টগ্রামে গ্যাসের চরম সঙ্কটকালে জোগান ছিল মাত্র ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ঘনফুট।

জাতীয় গ্রিডের গ্যাস ছাড়াই এলএনজির উৎস থেকে চট্টগ্রামে চাহিদার সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থাৎ ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা যাবে এমনটি আশা করছে পেট্রোবাংলা এবং কেজিডিসিএল। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি কেজিডিসিএল-এর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবাসিক, বাণিজ্যিক, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও শিল্প-কারখানা খাত মিলে গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এরমধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৫ লাখ ৯৭ হাজার। গ্যাসের ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ আবাসিক খাতে এবং বাদবাকি সিংহভাগই শিল্প, কল-কারখানা ও বাণিজ্যিক খাতের প্রায় ৩ হাজার গ্রাহককে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা ও কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় বৃহৎ গ্রাহকদের (বাল্ক কাস্টমার) জন্য আলাদা ফিডার সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর দু’মাসের মধ্যে আলাদা সরবরাহের কাজ সম্পন্ন হবে। এর ফলে কাফকো, সিইউএফএল ও অন্যান্য ভারী শিল্প, কল-কারখানা ও বিদ্যুৎ খাতের বড় গ্রাহকরা ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস জোগান পাবে। অবশিষ্ট ২৭ থেকে ৩২ কোটি (মোট ৪৫ থেকে ৫০ কোটি) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে শিল্প-বাণিজ্য ও আবাসিক গ্রাহকদের মাঝে। এতে করে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাবেন।
এদিকে পেট্রোবাংলার এলএনজির চালান কাতার ছাড়াও শিগগিরই আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া থেকে আমদানির প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এলএনজির উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রামে শিল্পায়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমানে কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে ৭শ’ শিল্পখাতের গ্রাহকের আবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।

ভারী, মাঝারি শিল্প-কারখানার প্রধান অঞ্চল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। দেশের প্রথম ইপিজেডসহ বেশকটি শিল্পাঞ্চল এখানে অবস্থিত। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানার সূতিকাগার চট্টগ্রাম। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দীর্ঘদিন থমকে যায়। অর্ধশতাধিক বছরের পুরনো বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) অচলপ্রায়। কর্ণফুলী রেয়ন মিলস (কেআরসি) আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, পাহাড়তলী হয়ে সীতাকুন্ড পর্যন্ত বিশাল শিল্প এলাকায় দুই ডজনেরও বেশি পাটকল, বস্ত্রকল, কার্পেট মিলসহ ভারী কল-কারখানা সম্পূর্ণ অচল ও বন্ধ। এর বেশিরভাগই এখন মালামালের গুদাম ও গো-চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

নামিদামি অনেক শিল্প-কারখানার জায়গায় নির্মিত হয়েছে এমএস রড তৈরির (স্টিলস রি-রোলিং) মিল। শিল্প কল কারখানার সুদিন হারিয়ে ফেলেছে চাটগাঁ। শিল্পকারখানা একে একে রুগ্ন ও অসাড় হয়ে পড়ে। ছোট হয়ে আসে চট্টগ্রামের শিল্প-কল, কারখানার বৃহৎ জগত। শিল্পখাতে দুর্দশার পেছনে প্রধান কারণ চাহিদার বিপরীতে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি। এরপর দায়ী শিল্প-কারখানা স্থাপনের উপযোগী প্লট বা স্থান সঙ্কট। তাছাড়া সর্বগ্রাসী চোরাচালানে মার খাচ্ছে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন। উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামকে বিনিয়োগের ‘আদর্শ স্থান’ বলা হলেও তেমন আসেনি নতুন বিনিয়োগ। গ্যাস বিদ্যুৎ সঙ্কটে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্ন সচল রাখা যায়নি। স্থবিরতা নেমে আসে কর্মসংস্থানে।

এ কে খান শিল্পগোষ্ঠি, ইস্পাহানি শিল্পগোষ্ঠি, মীর্জ্জাবু অ্যান্ড কোং, ইব্রাহিম মিঞার মতো নতুন কোনো বনেদি শিল্প পরিবারের উত্থান নেই চট্টগ্রামে। ঐতিহ্যবাহী এসব শিল্পপতি পরিবার চট্টগ্রামের উন্নয়নেও নিজস্ব উদ্যোগে যথেষ্ট অবদান রাখেন। পাশাপাশি জনহিতকর কর্মকান্ড, খেলাধূলা ও সামাজিক কাজে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটন শিল্পখাত, শিপিং খাত, গভীর সমুদ্রে ট্রলার শিল্পখাতগুলো বিকাশ লাভ করেছে প্রধানত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই। চট্টগ্রাম বন্দরে গোড়ার দিকে কাঠের তৈরি বেসরকারি জেটি-বার্থ দিয়েই কার্যক্রম সচল হয়।
উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত এলএনজির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখার তাগিদ দিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। সূত্র : ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত