প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিজের স্বার্থেই মিয়ানমারের পাশে চীন

ডেস্ক রিপোর্ট: মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ এবং ওই ঘটনায় সৃষ্ট সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে এ দেশের সম্পর্ক আরো জোরালো হয়েছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাপ থেকে মিয়ানমারকে চীনের আগলে রাখার চেষ্টায় ওই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বিশ্বসম্প্রদায় যখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় চীন।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব সমর্থন না করতে চীনের জোরালো আহ্বান সত্ত্বেও বিপক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র তিনটি। সেগুলোর একটি চীনের, অন্য দুটি বুরুন্ডি ও ফিলিপাইনের।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলছেন, বুরুন্ডি ও ফিলিপাইন যে চীনের কথা শুনেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রধানত তারা কেউই আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) বা এ ধরনের কোনো বিচারিক কাঠামোতে যেতে চায় না। বাইরের কোনো তদন্ত উদ্যোগকেও স্বাগত জানায় না তারা। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশঙ্কায় বুরুন্ডি নিজেই গত বছর আইসিসির সদস্য পদ ছেড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোটের (আসিয়ান) সদস্য ফিলিপাইনে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে আইসিসির প্রাথমিক অনুসন্ধান চলছে। ফিলিপাইনও চায় না বাইরের কেউ ওই অঞ্চলে নাক গলাক।

গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ সংকট সম্পর্কিত তিনটি প্রস্তাব নিয়ে ভোট হয়েছে জাতিসংঘে। গত বছরের ১৬ নভেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সামাজিক, মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক কমিটিতে (থার্ড কমিটি) মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৩৫ ভোটে। বিপক্ষে ভোট পড়েছিল ১০টি (চীন, রাশিয়া, সিরিয়া, বেলারুশ, জিম্বাবুয়ে এবং আসিয়ানের পাঁচ সদস্য কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম)। ২৬টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। গত ৫ ডিসেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে গৃহীত প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছিল চীন, বুরুন্ডি ও ফিলিপাইন। গত বৃহস্পতিবার রাতে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয় ৩৫-৩ ভোটে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিগত বছরগুলোতে মিয়ানমার পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর এ সুযোগে মিয়ানমারে স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক-বাণিজ্যিক কৌশলগত অবস্থান জোরদার করেছে চীন। মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগের বেশির ভাগই চীনের। এমনকি রাখাইন রাজ্যেও চীনের বড় স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের চীন-নির্ভরতা এ উপস্থিতি ও সম্পর্ক জোরদারের বড় সুযোগ করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপে স্ট্র্যাটেজিক (সুদূরপ্রসারী সার্বিক লক্ষ্যাভিমুখী) স্বার্থ নিয়ে চীন, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হয়েছে।

চীনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাউথ চায়না সি স্টাডিজের (এনআইএসসিএস) গবেষক নিয়ান পেঙ সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমার-চীন সম্পর্ক আরো সুসংহত হয়েছে। সু চির সরকার চীন-মিয়ানমার তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু করাসহ রাখাইন রাজ্যে কিয়াউকপিয়ু জেলায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে চীনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি করেছে।

মানবাধিকার পরিষদে এবার বাংলাদেশের বন্ধু জাপান ও নেপাল ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। গত বছর ভারতও এমন অবস্থান নিয়েছিল। তবে ভারত বর্তমানে মানবাধিকার পরিষদের সদস্য নয়। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা আর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া এক বিষয় নয়। কিছু দেশ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে কার্যত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের পক্ষে (প্রস্তাবের পক্ষে) অবস্থান নিয়ে থাকে। তারা এ সংকট সমাধানে দুই দেশের সঙ্গেই কাজ করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান অনেক বদলেছে। এখন ওই দেশটির ভাবনা বাংলাদেশের ভাবনার কাছাকাছি। বিশেষ করে, ভারত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এ সংকটের সমাধান দেখছে। এ জন্য ভারত মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছে এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়ি নির্মাণ করছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকটে রাশিয়ার সরাসরি তেমন স্বার্থ নেই। তবে বিশ্বের অনেক ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া পরস্পরকে সমর্থন দিয়ে থাকে। সে হিসাবে এখানে চীনের সঙ্গে রাশিয়াও আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি সই করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তিগুলোর চাপের কারণেই নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক, এটি প্রায় সব দেশই চায়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়নের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বিষয়ে চীনের মতো দেশগুলোর আপত্তি আছে। তারা একে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা হিসেবে দেখে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য চীন তাগিদ দিয়ে আসছে। এ সংকটে বাইরের শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা চায় না চীন। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সংকটের সমাধান না পেয়ে এর পাশাপাশি বহুপক্ষীয় উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের এ উদ্যোগের কারণেই এটি এখন পুরোপুরি আন্তর্জাতিক ইস্যু।

মিয়ানমারের পুরনো ছবক : বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১টায় নিউ ইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী চ টিন্ট সোয়েকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ওই বৈঠকের পর চীনের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মিয়ানমারের সুরে বলেন, রাখাইন রাজ্যের সংকট অত্যন্ত জটিল ও ঐতিহাসিক। এ সমস্যা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের। চীন চায় না, এ সংকট আরো জটিল বা বিস্তৃত হোক। এ সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণ চায় না চীন। সূত্র: কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত