প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যেতে টাকা আসতে টাকা, নির্যাতন ফ্রি!

ডেস্ক রিপোর্ট: কুলসুম বেগম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজধানীর পুরান ঢাকায় বসবাস করেন। বাবা ভাইয়ের বোঝা হয়ে সংসারে থাকতে চাননি তিনি। নিজেকে স্বাবলম্বী করতে নানা চেষ্টা করেও ব্যর্থতার কারণে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ২০১৭ সালের শেষের দিকে ট্র্যাভেল এজেন্সির এক দালালের মাধ্যমে তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন স্বাবলম্বী হওয়ার।

ট্রাভেল এজেন্সির দালাল কুলসুম বেগমকে বোঝান, বিনা খরচে সৌদি আরবে গিয়ে সেখাকার কারখানায় কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন তিনি। বিনা খরচে বলা হলেও সৌদি আরবের পাঠানোর আগেই নানা অজুহাতে কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নেন ওই দালাল।

বাবার কষ্টের উপার্জনের টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়েও কুলসুম এই ভেবে খুশি ছিলেন যে, তাকে বিদেশে পাঠানোর সব প্রক্রিয়া শেষ করেছেন ওই দালাল। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বিমানবন্দরে হাজির হন কুলসুম। ওই দিন রাতের ফ্লাইটে রওনা হন সৌদি আরবের উদ্দেশে। দালালের সহযোগিতায় এই পুরো কাজটি করে দেয় ‘বেসকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি।

কিন্তু সৌদি আরবের মাটিতে পা দিয়েই কুলসুমের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। কারণ কারখানায় কাজের কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া হয় কুলসুমকে। নিয়তিকে মেনে নিয়ে সেই বাসায় গৃহকর্মীর কাজেই যোগ দেন কুলসুম। কয়েক দিন যেতেই তার ওপর নেমে আসে নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন।

সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করেও কুলসুম তার কাজ চালিয়ে যান। পরদেশ, ভিন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং একই সঙ্গে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তীর নির্যাতনে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন কুলসুম। তবুও চলছিল মেনে নেওয়ার লড়াই। কিন্তু এত কিছুর পরেও যখন মাস শেষে তার বেতনের টাকাও সময় মতো পাচ্ছিলেন না, তখনই কুলসুম সিদ্ধান্ত নেন, আর ভিনদেশে থাকবেন না। ফিরে যাবেন বাবা-ভাইয়ের কাছে, ফিরে আসবেন নিজের দেশে। কিন্তু ততদিনে কেটে গেছে প্রায় ৬ মাস। এরপর দেশে ফিরে আসার জন্য সৌদি আরবের সেই এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন কুলসুম। কিন্তু সেখানকার ম্যানেজার শফিক আহমেদ তাকে কোনোভাবেই সহযোগিতা করেননি বলে অভিযোগ করেন কুলসুম।

যে বাসায় কুলসুম কাজ করতেন, সেখানে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না কুলসুমকে। তাই এক দিন বাধ্য হয়ে গোপনে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেন বড় ভাই গোলজার হোসেনকে।

বাংলাদেশে থাকা বড় ভাই গোলজারকে কুলসুম বলেন, ‘ভাই আমি ১১ দিন পর একটা খেজুর খাইছি। আমারে তুই বাঁচা, আমারে তুই নিয়ে যা।’

অপর প্রান্তে থাকা বড় ভাই গোলজার বোনের এমন আকুতি শুনে ছুটে যান ফকিরা পুলের ‘বেসকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে, যে এজেন্সির মাধ্যমে কুলসুম সৌদি আরব যান।

শত অনুরোধ ও ঝগড়া বিবাদ করেও এজেন্সি থেকে তার বোনকে দেশে ফিরে আনার কোনো আশ্বাস পাননি গোলজার। এ সময় আগমন হয় নতুন এক দালালের।

নতুন দালাল গোলজারকে জানান, কিছু টাকা খরচ করলে এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে তার বোনকে দেশে ফিরে আনার ব্যবস্থা করে দেবেন। গোলজার এক প্রকার বাধ্য হয়েই ওই দালালকে প্রথম দফায় ৫ হাজার টাকা ও পরে আরও কয়েক দফায় বেশ কিছু টাকা দেন তিনি। নতুন এ দালালের হাতে টাকা দেওয়ার কয়েকদিন পরেই (আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে) দেশে ফিরিয়ে আনা হয় কুলসুমকে।

কুলসুমের বড় ভাই গোলজার হোসেন বলেন, ‘কুলসুমকে সৌদি পাঠাতে দালালদের টাকা দিতে হয়েছিল। সেই দালালরাই কুলসুমকে বিদেশে নিয়ে বিপাকে ফেলেছিল। আবারও সেই দালালদের হাতেই টাকা দিয়ে কুলসুমকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা বাধ্য হয়েছি। এখনো চার মাসের বেতন পাননি কুলসুম। আর কষ্ট, নির্যাতন সেটা তো ফ্রী। সেটার বিচার আর কে দেবে, সেটার দামই বা কে দেবে?’
একই অবস্থা উত্তরবঙ্গের একটি জেলার মেয়ে জমিলার (ছদ্ম নাম)। স্বামী ছাড়া নিজের একমাত্র ছেলেকে মানুষ করতে অনেক আগেই ঢাকায় এসে একটি গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিলেন জমিলা।

দীর্ঘদিন গার্মেন্টসে কাজ করলেও ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি তার। এরই মধ্যে দালালের প্রলোভনে পড়ে সৌদি আরব যান জমিলা। যাবার আগেই পাসপোর্ট ও ভিসার খরচের নামে তিনিও বেশ কিছু তুলে দেন এক দালালের হাতে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে বিমানের ওঠার আগে জমিলা ভাইদেরকে ফোনে জানান, তিনি সৌদি যাচ্ছেন। হঠাৎ এমন খবর শুনে ভাইদেরও কিছুই করার ছিল না। জমিলাকেও সৌদি আরবে পাঠানোর পুরো কাজটিই করে দেয় ‘বেসকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামের ফকিরা পুলের সেই ট্রাভেল এজেন্সি।

বিদেশে গিয়ে প্রথম দুই মাস ঠিকভাবে কাটলেও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন জমিলা। শারীরিক অসুস্থতা আর সহ্য করতে না পেরে চলতি মাসেই বড় ভাইকে ফোনে বলেন, ‘ভাই আমারে তুই দেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর। আমি এখানে থাকলে আর বেঁচে থাকমু না।’

জমিলা তার ভাইকে আরও বলেন, ‘সৌদি থেকে কিছু দিন আগে কুলসুম নামের এক মেয়েকে দেশে নিয়ে গেছে। কে নিয়ে গেছে তুই একটু খোঁজ নিয়ে আমারে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর।’

এরপর জমিলার বড় ভাই ঢাকায় এসে যোগাযোগ করেন কুলসুম ও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সেই দালালের সঙ্গে। প্রথম দিনের চুক্তিতে সেই দালালের হাতে তুলে দেন ৫ হাজার টাকা। বোনকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস পেয়ে বাড়ি ফিরে যান জমিলার বড় ভাই। কিন্ত ওই দালাল টাকা খেয়েও দিনের পর দিন ঘোরাতে থাকেন জমিলার বড় ভাইকে। অবশেষে জমিলার বড় ভাই আবারও ঢাকায় এসে যোগাযোগ করেন ওই এজেন্সিতে। কিন্তু তার বোনকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও পরক্ষণেই আবার সুর পাল্টায় বেসকো ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার জাহাঙ্গীর আলম।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ওই দালালচক্র আবারও জমিলার বড় ভাইয়ের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমিলা দেশে ফিরে আসেনি। তাকে আনার কোনো প্রকিয়া চলছে কী না, সেটাও এখনো সুস্পট করেনি বেসকো ইন্টারন্যাশনাল।

শুধু কুলসুম আর জমিলা নয়, অনুসন্ধানে জানা গেছে এই ট্রাভেল এজেন্সি কিছু দালালদের সহযোগিতায় শতাধিক নারীকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে। এদের বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যেই দেশে ফিরেছেন, অনেকেই দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। সৌদি থেকে কোনো নারী বাংলাদেশে ফিরে আসার কথা শুনলেই তার কাছে ভিড় জমান নির্যাতিত অন্য নারীরা। যারা দেশে ফিরতে চায়, বাংলাদেশে ফেরত আসা নারীদের কাছে তাদের কেউ কেউ নিজের ছেলে-মেয়ে, স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর লিখে দেন। আর এটা বলে দেন, তারা যেন সৌদি আরব থেকে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

সৌদি আরব থেকে যা জানালেন

গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়া নারী জমিলা ও বাংলাদেশে তার স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় ।

সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে অবস্থান করা জমিলা মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার শরীরটা খুব খারাপ। পোলাটার জন্য কিছু টাকা কামাইতে এত কষ্ট করে বিদেশ আইছি। কিন্তু আমার কপালের দোষ, আমার কপালে এই সব ছিল। আমারে দেশে নেবার ব্যবস্থা করেন’।
জমিলা আরও বলেন, ‘বাসার কাম কাজ সবই করে নেয়। তারা তো আমারে টাকা দিয়া কিনা নিছে। কাম তো করাবোই। কয়েক দিন আগে শরীর খুব বেশি খারাপ হইছিল। আমার সারা শরীরে আগুনের মতো জ্বালাপোড়া শুরু হইছিল। হেরা (গৃহকর্তা) আমারে হাসপাতালেও নিয়া গেছিল। আমি আর সহ্য করতে পারছি না, বাবা আমারে দেশে নিয়া যান। এখানকার এজেন্সির লোক কইছে আমারে বাসা পাল্টাইয়া অন্য বাসায় কামে দিব, কিন্ত আমি আর অন্য বাসায় কামে যাইতে চাই না। আমারে দেশে নেন।’

সক্ষম চার সন্তান দেশে, পেটের দায়ে বৃদ্ধা মা বিদেশে

অনুসন্ধানে জানা যায়, ট্রাভেল এজেন্সি বেসকো ইন্টারন্যাশনাল বাগেরহাটের ৪৭ বছর বয়সী নারী নীরুফা বেগম নামের এক নারীকেও সৌদি আরব পাঠিয়েছে। কিন্তু সেই নারীও দেশে ফিরতে চান। তাই বাংলাদেশে ফিরে আসার সময় কুলসুমের কাছে নিজের বড় ছেলের মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছেন, ‘মা আমার পোলারে বলিস, তোমার মা ভালো নেই, আমারে যেন দেশে নিয়ে যায়।’

মোবাইলে কথা হয় নীরুফা বেগমের বড় ছেলে সাগর শেখের সঙ্গে।

মুঠোফোনে সাগর শেখ বলেন, ‘আমরা দুই ভাই-দুই বোন। ছোট দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। আমরা দুই ভাইও বিয়ে করেছি। সবারই আলাদা সংসার। ছোট ভাইটা একটা দোকান করে। আর আমি এলাকায় ইলেকট্রিকের কাজ করে সংসার চালাই। আমার মা কয়েক মাস আগে সৌদি আরবে গেছেন। কীভাবে গেছেন, কী হয়েছে সব কিছু আমার বড় বোন জানে। তবে আমাদের এলাকার রনি নামের এক দালালের মাধ্যমে গেছে বলে শুনেছি।’

সর্বশেষ কবে মায়ের খোঁজ নিয়েছেন জানতে চাইলে সাগর বলেন, ‘প্রায় মাস খানেক বা তারও আগে হবে।’

চার সন্তান থাকতে এই বয়সে কেন মাকে বিদেশে যেতে হলো, জানতে চাইলে সাগর বলেন, ‘এই সব আমার বড় বোন জানে।’ এরপর আর কোনো সুদুত্তর দিতে পারেননি নীরুফা বেগমের ছেলে।

দালাল ধইরা বিদেশ গেছে বোন

সিলেটের স্বামী পরিত্যক্তা পারভিন। নিজের একমাত্র মেয়েকে বোনের কাছে রেখে স্থানীয় দালাল ধরে সৌদি গেছেন ৬/৭ মাস আগে। তিনিও দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে আপন বড় বোনের মোবাইল নম্বর পাঠিয়েছেন।

সেই নম্বরের সূত্রধরে পারভিনের বড় বোন মরিয়মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

মরিয়ম বলেন, ‘পারভিন দালাল ধইরা বিদেশ গেছে। তার মেয়েটারে আমার কাছে রেখে গেছে। মাসে মাসে মেয়ের জন্য টাকা পাঠায়। কিছু দিন আগেও ফোনে কথা হইছে। তবে দেশে আসার ব্যপারে তখন কিছু বলে নাই পারভিন।’

মরিয়ম আরও বলেন, ‘পারভিনের স্বামী নাই। তাই সে বিদেশ গেছে। তয় সেখানে সমস্যা হইছে কী না সে রকম কিছু তো কয় নাই।’

সৌদিতে কাঁদছেন মেয়ে, এজেন্সির দরজায় মা

সৌদি আরবে বর্তমানে অবস্থানরত নির্যাতিতা আরেক নারী মিনারা বেগম। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বারিচায়। দুই ভাইয়ের একমাত্র বড় বোন মিনারা। কিন্তু সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মাস ছয়েক আগে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু মিনারার সঙ্গে ভাগ্যের আচরণ বদলেনি।

গত মাসে মিনারা কাঁদতে কাঁদতে ফোনে মা কে জানান, তিনি কীভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

মেয়ের কান্না শুনে স্থির থাকতে পারেননি হতভাগী মা। নরসিংদী থেকে ছুটে এসেছেন ফকিরাপুলের ট্রাভেল এজেন্সি বেসকো ইন্টারন্যাশনালে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুলের বেসকো ইন্টারন্যাশনালের সামনে কথা হয় মিনারার মা জহেরার বেগমের সঙ্গে।

জহেরা বেগম বলেন, ‘বাবারে আমার দুইটা ছেলে আর একটা মাত্র মেয়ে। মেয়েটা বড়। গবিরের সংসার, বিয়ে দিছিলাম, হের জামাইও কোনো কাজ কাম করে না। কত কষ্টে দিন কাটাতো, কী বলমু। গত ৬ মাস আগে এই এজেন্সি তাকে সৌদি পাঠাইছে। এখন মাইয়া ফোন করে কান্দাকাটি করে। আমরা এর আগে শনিবার এজেন্সিতে আইছিলাম। হেরা কইছে মেয়েরা আনবো না, বাসা পাল্টায় দেব। আমি কইছি বাসা পালটানো লাগবো না। আমার মাইয়ারে আইনা দেন। আবার শনিবারে ডাকছে, আজ আইয়া দেখি সেই লোক অফিসে নাই।’ কথাগুলো বলেই হু হু কান্না শুরু করেন জহেরা বেগম।

এজেন্সিতে গিয়ে যা দেখা গেল

বেসকো ইন্টারন্যাশনালের নামে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরেজমিনে ওই এজেন্সিতে গিয়ে দেখা গেল ভিন্নচিত্র। একটি ফ্ল্যাটের বড় রুমের মধ্যে পুরো এজেন্সির অফিসটি। সেই কক্ষের মধ্যেই দরজার পাশে বানানো হয়েছে একটি রিসিপশন। তবে সেই রিসিপসনে কেউ ছিলেন না। রিসিপসনের ঠিক পাশেই রয়েছে তিনটি কম্পিউটার টেবিল। সেই টেবিলে বসে কাজ করছেন এক ব্যক্তি। আর গ্লাসের পার্টিশন দেওয়া একটি রুমের মধ্যে বড় চেয়ার টেবিলে বসে আছেন এক ব্যক্তি। ঠিক তার পাশের রুমের দরজাটি বন্ধ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেই রুমে বসেন জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন, যিনি বেসকো ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার। তবে সেই দিন জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ কাজে বাইরে থাকায় তার দেখা পাওয়া যায়নি।

মালিকের চেয়ারে বসেন ‘পিয়ন’

প্রথম দিনে সেই এজেন্সির মালিককে পাওয়া না গেলেও ফোনে যোগাযোগ করা হলে পরের দিন আবার আসতে বলেন তিনি। পরের দিন তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্ত ওই দিন তার রুমটি খোলা ছিল। রুমের মধ্যে দুটি বড় বড় চেয়ার টেবিল সাজানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে এখানেই বসেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।

একটি চেয়ার খালি থাকলেও অপর একটি চেয়ারে দিব্যি বসে ছিলেন একব্যক্তি। তিনি জানালেন, আজ এজেন্সির মালিক অফিসে আসবেন না। তখন তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখানকার পিয়ন’। কিন্ত পিয়ন হলে মালিকের চেয়ারে বসে আছেন কীভাবে? জানতে চাইলেই উত্তেজিত হয়ে যান ওই ব্যক্তি।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এই অফিসের মালিক তিনজন। যার যার কাজ সে করে। এসব আমি জানি না।’ এই বলে চেয়ার থেকে উঠে বেড়িয়ে যান তিনি। এরপর খাজা নামের এক ব্যক্তি এজেন্সির ওই রুমে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন যে, মরিয়ম, জমিলা ও মিনারা তাদের এজন্সির মাধ্যমেই সৌদি আরবে গিয়েছেন।

যা বললেন এজেন্সির কর্ণধার

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসকো ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার পরিচয় দেওয়া জাহাঙ্গীর আলম  মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা সরকারি নিয়ম মাফিকই সব কাজ করেছি। আমাদের এজেন্সি সরকারিভাবে নিবন্ধিত। আমরা ১০০ জন নারীকে সৌদিতে পাঠাইছি। এর মধ্যে মাত্র ২-৩ জন ফেরত এসেছে। আর কোনো মেয়ে আমাদের ফেরত আসে নাই। সবাই সেখানে ভালোভাবেই আছে, ভালোভাবেই কাজ করছে। সেখানে একজন মানুষকে নিয়ে যেতে খরচ হয়, আকামা করাতে খরচ হয়। তাই চাইলেই একজনকে ফেরত আনা যায় না। আমার তো এটা ব্যবসা। তবে কেউ যদি খুব বেশি সমস্যা বোধ করে, তাকে আমরা বাসা পাল্টিয়ে দেবার ব্যবস্থা করি।’

জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ‘যারা ফিরে এসেছে তারা দেশে এসে অনেক মিথ্যা কথা বানাইয়া কইছে। দেশে ফিরতে চাওয়া জমিলা, মিনারাসহ অন্যদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে তারপর বিস্তারিত বলতে পারব। আমরা ওই মেয়েদের সাথে কথা বলব এবং সৌদি এজেন্সির সাথে কথা বলব। এরপর এটা কী হবে তা জানাতে পারব।’

সৌদিতে গেলেন-ফিরলেন যত নারী

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন বাংলাদেশি নারীরা। এরমধ্যে সৌদি আরব থেকে প্রতি মাসেই নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিক যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপরও ২০০৯ সালে ৩৮৬, ২০১০ সালে ৪৪, ২০১১ সালে ১৬৬, ২০১২ সালে ৪৮৪, ২০১৩ সালে ১৬৭ ও ২০১৪ সালে ১৩ জন নারী শ্রমিক সৌদি আরবে গিয়েছেন।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে ২০ হাজার ৯৫২ জন নারী সৌদি যান। ২০১৬ সালে আগের বছরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৬৮ হাজার ২৮৬ জন। আর ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারী শ্রমিক সৌদি আরবে গিয়েছেন।

বুক ভরা স্বপ্ন ভেঙে নানা রকমের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন শত শত নারী শ্রমিক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাস কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ৩ মে থেকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯৪ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। এখনো অনেক নারী দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান। সৌদি ফেরত ও ফিরতে চাওয়া নারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, ‘যারা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে দেশে ফিরছেন তাদের আমরা কাউন্সিলিং করে সুস্থ করে তুলছি। এ ছাড়াও যারা সেখানে আছেন তাদের উদ্ধার করে দেশে আনারও ব্যবস্থা করছি।’

সৌদি ফেরত নির্যাতিতা নারীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দা সাহানা বারী বলেন, ‘এই মুহূর্তে কতজন নারী দেশে ফিরেছেন সেই পরিসংখ্যানটা বলা যাচ্ছে না। আর যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন বলে অভিযোগ করছেন তাদের প্রত্যেকটি অভিযোগই যাচাই-বাছাই করা হয়।’

এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু দিন ধরেই দেখছি সৌদি আরব থেকে আমাদের অধিকাংশ নারী শ্রমিকরাই শারীরিক ও মানসিক নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছে। আমরা এটাও জানতে পেরেছি অনেক ট্রাভেল এজেন্সি অনেক নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি পাঁঠিয়েছে। আর তাদের কাছে থেকে দালালদের মাধ্যমে বেশ কিছু অর্থও হাতিয়ে নিয়েছে।

অদক্ষ শ্রমিকদের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না উল্লেখ করে তৌহিদুর হক আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে গিয়ে যখন ওই নারীরা আবার দেশে ফিরতে চাচ্ছে, তখনও তাদের আত্মীয় স্বজনের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ওই দালাল চক্র ও এজেন্সির মালিকরা। তবে সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যেটা আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। সেটা হলো, দক্ষ শ্রমিক ছাড়া আসলে কাউকে বাইরে পাঠানো ঠিক না। এই নারী শ্রমিকরা যদিও বেশির ভাগ বাসায় কাজের জন্য গিয়েছে। তবুও তাদের দক্ষ ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন ছিল। কারণ আমাদের দেশের বাসার বাড়ির কাজের সাথে ওই দেশের কাজের সব মিল থাকে না। তাদের দেশে ভিন্ন ধরনের একটা কালচার। তাদের একটা বাড়ির কাজের কথা বলে নেয়া হলেও দেখা যায় পুরো বাড়ির সব কাজ তাকে করতে হয়। এই ক্ষেত্রে সরকার বা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের সাথে বিষয়টি স্পষ্ট করেনি। ফলে তারা একটি ধোঁয়াশার মধ্যে থেকেই আসলে সৌদি চলে গেছেন। সৌদি আরবের বাংলাদেশের যে দূতাবাস রয়েছে তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হল, তারা এই সব নারীদের পাশে কতটা দাঁড়িয়েছে?’

সমাজ বিজ্ঞানী তৌহিদুর হক বলেন, ‘এই সব নির্যাতিত নারীরা যখন ফেরত এসে নির্যাতনের বনর্না দেয়, তখন জাতি হিসেবে সেটা আমাদের ভাবায়। আমরা তাদের কোন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- এই ধরনের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। আর ওই সব নারীদের পাওনা টাকাগুলো ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা। অনেক নারীকে ফেরত আসার পরে দেখা যায় তাদের পরিবার তাদের নিতে চায় না। সেই বিষয়টা দেখাভাল করা। তাদের পাশে সরকারকে সর্বাত্মকভাবে দাঁড়াতে হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে এই অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে একটি নিয়ম নীতির মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যে সরকারের একটি উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নারীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে বাণিজ্য করল। এরও একটি সুরহা সরকার যত দ্রুত করবে ততই ভালো। এতে সরকারের প্রতি প্রবাসী শ্রমিকদের আস্থা বাড়বে।’ সূত্র: প্রিয় সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত