প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

নড়িয়ায় নদীভাঙন ও ট্রাম্পের জলবায়ু নীতি

ফজলে রাব্বী খান : মাথার উপর খোলা আকাশ, চোখে শূন্য দৃষ্টি, উদাস চোখে তাকিয়ে আছেন কাদের ফকির। মুলফতগঞ্জে বসত বাড়ি আর ১২ শতক জমি ছিল তার আগের রাতেও। শুধুমাত্র এক রাতের ব্যবধানে রাক্ষসী পদ্মা তাকে করেছে সর্বস্বান্ত। এখন সে ভিটে-মাটি বিহীন সর্বস্বান্ত একজন মানুষ। সে এখনো জানেনা পরিবার নিয়ে বাকি জীবনটা কোথায় থাকবে, জীবিকাই বা কি হবে। শুধু কাদের ফকির নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াল পদ্মার আগ্রাসী গ্রাসে শুধুমাত্র নড়িয়া উপজেলায় সর্বস্বান্ত ও গৃহহীন হয়েছেন প্রায় ৭ হাজার পরিবার। এই উপজেলার অনেকেই ইউরোপ প্রবাসী। সেই প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সে নড়িয়ায় গড়ে উঠেছিলো অনেক দৃষ্টি নন্দন অট্টালিকা। নড়িয়ার এমন অনেক স্থাপনাই এখন পদ্মার গ্রাসে বিলীন। শুধুমাত্র এবারের নদীভাঙ্গণে নড়িয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে আমাদের বাজেটের পরিমাণ ছিল ৩,৪০,৬০৫ কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু নড়িয়া থেকেই কেড়ে নিয়েছে বাজেটের প্রায় ১% অর্থ! বাংলাদেশের প্রায় ৩৯টি উপজেলা সরাসরি নদী ভাঙনের শিকার, আর প্রায় ১০০ উপজেলা স্বল্পমাত্রায় হলেও নদীভাঙন দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ ।

ধারণা করা হচ্ছে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় নাগাদ বিশ্বের গড়পড়তা তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেড়ে যাবে এবং ফলশ্রুতিতে সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ৮ হতে ১০ ফুট। এরফলে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে উপকূলীয় ৫৬.৮ লক্ষ একর এলাকা পানির নিচে প্লাবিত হবে, যা সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ১৫.৮ %।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায় বাংলাদশের মত ৩য় বিশ্বের দেশগুলোর নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এই দায় আমেরিকা-ইউরোপের পরিবেশ দূষণকারী ধনী দেশগুলোর। দ্য গার্ডিয়ানের এক রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের পরিবেশ দূষণের ৭১% করে থাকে উন্নত বিশ্বের ১০০টি কোম্পানি। সম্প্রতি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় সাবেক ওবামা প্রশাসনের গৃহীত ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান’ বাতিল করেছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কার্বন নিঃসারণ হ্রাস করা সহ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্যারিস চুক্তি থেকেও সরে এসেছেন তিনি। ক্রমাগত অস্বীকার করে যাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তনের সত্যতার কথা।

জলবায়ু পরিবর্তন এদেশে শুধু নদী ভাঙন ডেকে আনেনি, এনেছে বন্যা সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এবছর আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছে। বজ্রপাতে নারায়ণগঞ্জের রহিমা বেগমের মৃত্যু বা নদী ভাঙনে নড়িয়ার সর্বস্বান্ত কাদের ফকিররের মত এই দরিদ্র দেশের অসংখ্য মানুষদের শুধু আমেরিকা-ইউরোপের পাপের খেসারত দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার এখনই সময়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ফ্রাঙ্কেস্টাইনকে রুখতে না পারলে নড়িয়ার মত হারিয়ে যেতে দেখতে হবে বাংলাদেশের ১৫% অঞ্চলকে। ট্রাম্পদের পুঁজিবাদী স্বার্থের কাছে এই সুন্দর পৃথিবীকে হারাতে চাইনা।

লেখক : প্রকৌশলী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত