প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কবে শেষ হবে তদন্ত

ডেস্ক রিপোর্ট : উত্তর বাড্ডার তুলা ব্যবসায়ী জুয়েল আলী হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখনও এ হত্যার নেপথ্য রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। মামলাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে এখন ন্যস্ত হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে চারবার। মামলার তদারকি করতে বাদীপক্ষের ছোটাছুটি আর অর্থও কম যায়নি, মানসিক অশান্তি-যন্ত্রণা তো আছেই। তার পরও খুনের রহস্য উদ্ধার ও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশ নিহতের পরিবার।

জুয়েল আলী হত্যা মামলার মতো ঢাকা মহানগরে অর্ধশতাধিক হত্যা মামলা বছরের পর বছর বন্দি তদন্তের লাল ফিতায়। এক বছর থেকে অর্ধ যুগের বেশি সময় ধরে তদন্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে মামলাগুলো। কোনো কোনো হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং আসামি শনাক্ত হয়নি। কিছু ঘটনার আসামি শনাক্ত হলেও তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ধরনের অন্তত ২০টি মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে তারা হতাশ ও শঙ্কিত। তারা বলছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বিচার প্রক্রিয়া। কিন্তু সে তদন্তই শেষ হচ্ছে না। দ্রুত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের দাবি তাদের প্রত্যেকের।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট কেউ কেউ বলছেন, মামলাগুলো তাদের কাছে এসেছে ঘটনার অনেক পরে। এর মধ্যে ঘটনাস্থলসহ আলামতের অনেক কিছুই বদলে গেছে। কোনো কোনো মামলার ক্লু পর্যন্ত নেই। আসামিও অজ্ঞাত। তাই তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।

জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম বলেন, অনেক সময় সাক্ষী পাওয়া যায় না, ক্লু থাকে না, আসামি অজ্ঞাত থাকে এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতেও দেরি হয়। সব সময়ই চেষ্টা থাকে, মামলার সঠিক তদন্ত করার। এসব কারণে তদন্তে সময় লাগে। তবে যেসব মামলার ক্লু থাকে, সেগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ হয়।

সাবেক জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল ইকতেদার আহমেদ বলেন, ‘যেসব মামলায় অপরাধ সংশ্নিষ্ট সাজা ১০ বছরের বেশি এবং দায়রা জজ আদালত কর্তৃক বিচার্য, এসব মামলায় ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করতে হবে। তা না হলে অপরাধ জামিন অযোগ্য হওয়ার পরও আদালত যথার্থ মনে করলে অপরাধীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। এটি আইনের বিধান হলেও আদালতগুলো খুব কমই এ বিধান অনুসরণ করেন। যেসব মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, সেসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি দেন না।’

২০১৩ সালের ২৮ জুন উত্তর বাড্ডায় জুয়েল আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যা মামলার বাদী নিহতের স্ত্রী জোসনা আক্তার ইভা বলেন, ‘ঘটনার তদন্তই শেষ হলো না এখনও, বিচার পাবো কবে?’ তিনি অভিযোগ করেন, জুয়েলের ভাইবোনদের সঙ্গে পৈতৃক বাড়ির ফ্ল্যাট ভাগাভাগি নিয়ে তার (জুয়েল) দ্বন্দ্ব চলছিল। এই দ্বন্দ্বের জেরে তার স্বামী খুন হতে পারে। বিষয়টি তদন্ত সংশ্নিষ্টদের তিনি জানিয়েছেন। এর পরও সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করা হয়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মকবুল হোসেন বলেন, ভাড়াটে তিন হত্যাকারী এই খুন করেছে। কিন্তু পরিকল্পনাকারী এবং মোটিভ সম্পর্কে জানা যায়নি। দুই খুনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা পরিকল্পনাকারী সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেনি। কারণ তাদের প্রধান মাশকুর রহমান ইসন এই হত্যার ভার নিয়েছিল। সে গ্রেফতার না হওয়ায় পরিকল্পনাকারী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

‘বলার সব হারিয়ে ফেলছি’ :২০১২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। বিকেল বেলা। হাজারীবাগের ভাগলপুর লেনের বাসায় একা ছিল ১২ বছর বয়সী ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তাসনিম রহমান করবী। এ সময় কে বা কারা বাসায় ঢুকে শ্বাসরোধে ও গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে তাকে। তারপর ছয় বছর পূর্ণ হতে চলেছে আলোচিত এ হত্যার ঘটনার। কিন্তু আজও তদন্ত ফাইলেই আটকে আছে এ মামলা, কোনো ক্লু উদ্ঘাটন হয়নি। একমাত্র মেয়ের হত্যার বিচার দাবিতে অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হচ্ছে না আইনজীবী দম্পতির।

করবীর বাবা আইনজীবী মিজানুর রহমান জানান, তার এমন কোনো শত্রু নেই, যে কারণে তার মেয়েকে খুন হতে হবে। মেয়েরও কারও সঙ্গে তেমন শত্রুতা থাকার কথা নয়। অথচ কেন কী কারণে কারা বাসায় ঢুকে করবীকে হত্যা করল, সেটি তদন্ত করে বের করতে পারছে না পুলিশ। একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা বদল হচ্ছে, ঘটনার রহস্য আর বের হচ্ছে না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, বলার সব হারিয়ে ফেলছি। অবস্থা এমন যে, মনে হচ্ছে আমাকেই প্রমাণ করতে হবে কারা খুন করেছে মেয়েকে। থানা পুলিশ ও ডিবি ঘুরে মামলাটি এখন সিআইডিতে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম বলেন, তিনি এই মামলার নবম তদন্ত কর্মকর্তা। তিন মাসের মতো তদন্তভার পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার পাঁচ-ছয় বছর পর এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা তত সহজ নয়। তবে তিনি আশাবাদী করবী হত্যারহস্য বের করে আনতে পারবেন।

অন্ধকারে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা :দক্ষিণখানের সিরিয়াল কিলার কে, তা আজও অজানাই রয়েছে। কেন, কী কারণে সে বাসা ভাড়া নেওয়ার নাম করে বাড়িওয়ালাদের টার্গেট করে, সেই রহস্যও রয়েছে অন্ধকারে।

২০১৬ সালের ২৮ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ দিনের মধ্যে দক্ষিণখান এলাকায় চারটি বাসায় ঢুকে মাথায় কুপিয়ে দুই নারীকে খুন এবং দুই নারীকে হত্যার চেষ্টা চালায় এক ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার। চারটি ঘটনার ধরন একই। দুই নারী হত্যাচেষ্টা মামলা দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আদালতে। হত্যা মামলা দুটি তদন্ত করছে পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। ক্লু-লেস মামলাটি অন্ধকারেই রয়েছে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট দুপুরে দক্ষিণখানের পূর্ব মোল্লারটেক তেঁতুলতলার সুরাইয়া বেগমকে (৫২) কুপিয়ে হত্যা করে এক যুবক। ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে আশকোনার একটি বাড়ির মালিককে হত্যাচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একইদিন বিকেলে গাওয়াইর দক্ষিণপাড়ার আরেক বাড়ির মালিক ওয়াহিদা আক্তার সীমাকে হত্যা করা হয়। ৩১ আগস্ট দক্ষিণ আজমপুরে একইভাবে কুপিয়ে আহত করা হয় জেবুন্নিসা চৌধুরীকে (৫৫)। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত বছর মারা যান তিনি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আশকোনার মেডিকেল সড়কের বাসায় মাহিরা বেগমকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।

২০১৫ সালের ১৩ মে পল্লবীতে নিজের ফ্ল্যাটে খুন হন গৃহবধূ সুইটি আক্তার ও তার মামা আমিনুল ইসলাম। জোড়া খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়নি। শনাক্ত হয়নি খুনিরাও। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মোকছেদুর রহমান বলেন, তার আগে আরও তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা জোড়া খুনের মামলা তদন্ত করেছেন। মামলাটি ক্লু-লেস। তাই আসামি শনাক্ত ও খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে দেরি হচ্ছে।

সাড়ে ছয় বছর আগে ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি দম্পতি পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ মামলা এখন র‌্যাবের কাছে।

হতাশা বাড়ছে রীনা বেগমের :২০১৬ সালের ২৮ মার্চ দিনদুপুরে কদমতলীর বাসার মধ্যে কিশোর স্বাধীনকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তদন্তাধীন স্বাধীন হত্যা মামলার মোটিভ ও খুনি সম্পর্কে এখনও অন্ধকারে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা। সিআইডিতে রয়েছে মামলাটি। গত আগস্ট মাসে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হলেও বাদী ও নিহতের মা রীনা বেগম জানেন না। কারণ নতুন তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর সঙ্গে মামলার বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করেননি। রীনা ১৬ সেপ্টেম্বর কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশ তদন্তে গুরত্ব দিচ্ছে না। মামলা যত পুরনো হচ্ছে, ততই হতাশা বাড়ছে তার। সিআইডির এসআই মিজানুর মামলাটির তদন্ত করছেন বলে জানান তিনি। মিজানুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি বদলি হয়েছেন বরিশালে। মামলাটি পরিদর্শক মীর মোতালেবের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে মিজানুর বলেন, ওই ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে আটজনকে আটক করা হয়। কিন্তু তাদের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ২০১৫ সালের ১১ জুন মধ্য বাড্ডায় বাসার মধ্যে গৃহবধূ শাপলা ওয়াহিদ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি বলে জানান মামলার বাদী ও নিহতের স্বামী কাজী ওয়াহিদুজ্জামান। এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবর ভাটারা থানার বারিধারা জে ব্লকের প্রত্যয় মেডিকেল ক্লিনিকে আসাদুল ইসলাম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনায় তার বাবা রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন ভাটারা থানায়। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। রফিকুল বলেন, চার বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি। কার্যত তদন্তে কোনো পুলিশি তৎপরতা নেই। ছেলেকে হারানোর পর থেকে আমি অসুস্থ। ছেলের শোকে মনোবল হারিয়ে ফেলেছি।

এ ছাড়া জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন এবং ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় হত্যাকাে র তিন বছর হয়ে গেলেও আদালতে চার্জশিট দেননি তদন্ত সংশ্নিষ্টরা। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত