প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নজরদারিতে পুরনো মামলার আসামিরা

ডেস্ক রিপোর্ট : জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে সহিংসতার পুরনো মামলার আসামিদের ওপর নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুরনো মামলার রেকর্ডভুক্ত আসামিরা আদালত থেকে জামিনে আছেন না বাইরে রয়েছেন সে খবর নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। সূত্র জানায়, বিগত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং পরে সহিংসতার জন্য ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছিল। মামলাগুলোর অধিকাংশই অভিযোগ হচ্ছে, গাড়িতে আগুন ও পুলিশের কাজে বাধা। ওই মামলার অধিকাংশই বাদী ছিলো পুলিশ। মামলা দায়েরের পর অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার অনেক আসামি পলাতক রয়েছে।

পুলিশের হাতে ধরা পড়া এবং আত্মসমর্পণকৃত আসামিরা আদালতের মাধ্যমে জামিনে রয়েছে না পলাতক রয়েছে তা তদন্ত করছে পুলিশ। এছাড়াও যেসব মামলার যথাযথ তদন্ত হয়নি সেই মামলাগুলোর যথাযথ তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জননিরাপত্তার ঝুঁকি এড়ানো ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য এসব উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্লানিং) মো. রুহুল আমিন চৌধুরী মানবজমিনকে জানান, গত সংসদ নির্বাচনের সময় সহিংসতার জন্য যারা দায়ী এবং মামলার রেকর্ডভুক্ত আসামি পুলিশ তাদের নজরদারিতে রাখবে। তারা জামিনে আছেন না কারাগারে আছে তা মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের দিয়ে তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে। তিনি জানান, সামনের নির্বাচনে খুব সতর্ক অবস্থানে থাকবে পুলিশ। আগে যারা সহিংসতা করেছে তাদের নজরদারি ছাড়াও নতুন করে যদি কেউ সহিংসতা করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ এসব ব্যক্তিদের অতীতে ছাড় দেয়নি সামনেও ছাড় দিবে না।

ঢাকার রমনা থানার ওসি কাজী মাইনুল আলম জানান, আগের নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছিল সেসব মামলার আসামিরা কারা ছিল তা নজরদারি শুরু হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার ওসি মেহেদী রাসেল জানান, নির্বাচনের আগে তালা এলাকায় প্রচণ্ড সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গাছ কেটে সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সেসব নাশকতার মামলার আসামিরা এখন কোথায় তা খোঁজ রাখা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গি থানার ওসি এবিএম সাজিদুল হক জানান, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে এবং পরে দুষ্কৃতিকারীরা নাশকতা করেছিল। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছিল। ওই মামলার আসামিরা কে কোথায় আছে তা দেখা হচ্ছে। র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক কর্নেল ইমরানুল হাসান জানান, আগের নাশকতার মামলাগুলোর আসামিদের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন বিভাগ থেকে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই বছরে দেশের বিভিন্নস্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওইসব ঘটনায় সরকার ও বিরোধী জোট একে অপরকে দোষারোপ করে। ওই ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশের থানাগুলোতে প্রায় ৩৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার আসামির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। ওই মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামির হচ্ছে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মী। পুলিশ বিভিন্নস্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তারের আওতায় আনে। অনেকেই আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়। কেউ কেউ বাড়িতে থাকতে না পেরে পলাতক জীবনযাপন করছে। অনেক নাশকতার মামলার আসামি ক্রসফায়ারে মারা গেছে।

সূত্র জানায়, সামনের নির্বাচনে আগের ঘটনার যাতে পুনারাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে পুলিশ। ইতিমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে বিগত ৫ বছর আগে পুরনো মামলার নথিগুলো তলিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামীদের অবস্থান সম্বন্ধে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে নেমেছে গোয়েন্দারা। মামলার আসামিদের অবস্থান এবং কারা তাদের সহচর ছিলো তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিল ওই মামলার ক্লু ধরে তদন্তের মাধ্যমে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে। নাশকতার মামলার আসামি প্রকাশ্যে এলেই গ্রেপ্তার করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়াও ঘটনার ক্লু ধরে কারা ওইসব সহিংসতায় ইন্ধন যুগিয়েছে, অর্থ দিয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনবে পুলিশ।

বিশেষ করে যেসব মামলা বিস্ফোরক ও বাসে আগুন দেয়ার জন্য দায়ের হয়েছিল ওই মামলাগুলোর আসামিদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দারা সমন্বয় করে ওয়ার্ড ভিত্তিক পুরনো মামলার আসামিদের খোঁজ নিচ্ছে। সহিংসতার মামলার আসামিরা যাতে ঢাকা বা বিভাগীয় শহরে অবস্থান করতে না পারে সেইদিকেও নজরদারি করবে আইনশৃঙ্খলা পুলিশ। ইতিমধ্যে ঢাকার ২৫৩টি বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে গতি আনার জন্য বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ ওইসব আসামিদের নজরদারির ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব সোর্স ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিবে। যেসব মামলার এখনো চার্জশিট দেয়া হয়নি ওই মামলার দ্রুত চার্জশিট দেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরনো মামলার আাসমিদের ধরা গেলে তারা আর নতুনভাবে সংগঠিত হতে পারবে না। এছাড়াও সামনে সহিংসতার হার কমে যাবে। এতে জননিরাপত্তার ভিত্তি আরো ভিত্তি শক্ত হবে। এই মামলার আসামিদের ধরা এবং নজরদারির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো হয়রানির শিকার না হয় সেইদিকেও নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে।

জোরদার হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং: একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল ধরনের নাশকতা ও সহিংসতা রোধে দেশে জোরদার করা হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং। যেসব এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে সেসব এলাকায় গতি আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে এবং পরে প্রত্যেক জেলা ও থানা এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যদের নিয়ে মিটিং করবে পুলিশ। জেলা পর্যায়ে এসপি এবং থানা পর্যায়ে সার্কেল এএসপি ও ওসিরা উপস্থিত থাকবেন। মিটিংয়ে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কারা নাশকতা করে পরিবেশকে ঘোলাটে করছে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য স্থানীয় জনতার সাহায্য চাইবে কমিউনিটি পুলিশ।

এই কার্যক্রমে জনগণকেও সম্পৃক্ত করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কমিউনিটি পুলিশিং এর সভায় যেসব দুর্বৃত্তের নাম আসবে সেই দুর্বৃত্তের অভিযোগের ব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। সামনের নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সকল ধরনের সহিংসতা রোধে এই কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের আলোকে পুলিশ এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব বিষয় জানা গেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (কমিউনিটি পুলিশিং) সহেলী ফেরদৌস মানবজমিনকে জানান, ‘অপরাধ দমনে পুলিশকে সহযোগিতার জন্যই কমিউনিটি পুলিশিং সৃষ্টি হয়েছে। জেলা ও থানা ভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং রয়েছে। সামনের নির্বাচনে তারা দেশের জন্য লাইফ গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তিনি বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ে সব দলের লোকজন থাকে। অপরাধ দমনে যাতে কারও দ্বিমত না থাকে সেই বিষয়টিতে ঐক্যমত আনা হবে।

উল্লেখ্য, গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কমিউনিটি পুলিশিংকে সক্রিয় করার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সভায় একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু, নির্বাচনের কার্যক্রমে এই সংগঠনকে কাজে লাগালে পরে সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে এবং এর বিভাজন দীর্ঘমেয়াদী থাকতে পারে এমন আশঙ্কায় সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ওই সময়ের সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচনের আগে এবং পরে সহিংসতা আরো কমে আসতো বলে ধারণা করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের সংগঠনকে কাজে লাগানো হবে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে আগের যেসব এলাকায় সহিংসতা বেশি হয়েছিল তার সকল নথি পুলিশ সদর দপ্তর বিভাগের ক্রাইম প্রিভেন্ট বিভাগে রয়েছে। সেসব নথি দেখে দেশের বিশেষ ৩৪ জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাছাড়া যেসব জেলার পাশ দিয়ে মহাসড়ক রয়েছে নথিভুক্ত করা হয়েছে সেসব এলাকাকে। বিশেষ করে ৩৪টি জেলার কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যক্রমেক জোরদার করা হবে। পাশাপাশি ঘটনার সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখবে পুলিশ।

নির্বাচনের আগে এবং এই ৩৪টি জেলার বাইরে কোনো জেলায় নাশকতা হলে সেসব এলাকাকে পর্যালোচনার আওতায় আনা হবে। নাশকতার তদন্তের জন্য পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যরা পুলিশকে তদন্ত কাজে সহযোগিতা করবে। এলাকাবাসী যেন নির্ভয়ে পুলিশকে নাশকতাকারীদের বিষয়ে তথ্য প্রদান করে এতে সাহস জোগাবেন সংগঠনের সদস্যরা। এ সময় সংশ্লিষ্ট জেলার এসপির অফিস ও থানায় বিশেষ সেল খোলা হবে। সংগঠনের সদস্যরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাসহ সবার সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন করবে। সেসব অনুষ্ঠানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
সূত্র : মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত