প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যে কারণে ফেরানো যাচ্ছে না ভারতের কারাগারে থাকা বাংলাদেশি জঙ্গিদের

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারতে গ্রেফতার বাংলাদেশের জঙ্গিদের প্রয়োজন অনুযায়ী ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, এই জঙ্গিরা সে দেশে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেছে। সেসব ঘটনায় তাদের বিচারকাজ ও তদন্ত চলছে। ফলে বোমারু মিজানসহ দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের দেশে ফেরত আনা যাচ্ছে না।

তবে বাংলাদেশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। এমনকি ভারতে গিয়েও জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ আছে। জঙ্গি সংগঠন ও গ্রেফতার জঙ্গিদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে যৌথ তদন্ত হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তবে ভারতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনির হাতে ধরা পড়া কতজন জঙ্গির বিচারকাজ চলছে বা কতজনের বিষয়ে তদন্ত চলছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতর। তবে আলোচিত কয়েজন জঙ্গি হলো—

বোমারু মিজান

ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া জেএমবি’র শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি কাওসার ওরফে বোমারু মিজানকে (৩৮) গত আগস্টে দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু শহর লাগোয়া রামনগরের একটি বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা—এনআইএ।

মিজান বিহারের গয়া ও পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের মামলার ঘটনায় আসামি। বর্ধমান হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে এনআইএ। গয়া হামলার ঘটনা তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা। মিজানকে গ্রেফতারের পর জেএমবি’র ভারত শাখার কার্যক্রমের গতি কমেছে। তাই দেশটি তাকে নিয়ে আরও তদন্ত করছে।

বোমারু মিজান গ্রেফতার হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছিলেন। তবে সেই প্রক্রিয়ায় আপাতত দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি না থাকলেও ভারতের কাছে এ বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া আছে।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেফতার হওয়ার পর ভারত বোমারু মিজান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। তবে দেশে আনার বিষয় এখনও কোনও কিছু চূড়ান্ত হয়নি।

আন্তঃদেশীয় অপরাধ তদন্তে এভাবেই অগ্রসর হওয়ার কথা বলেন তারা। শীর্ষ জঙ্গিনেতা হওয়ায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও বোমারু মিজানের গুরুত্ব রয়েছে। দেশে তার বিরুদ্ধে অন্তত ২০/২২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় তার সাজা হয়েছে।

সামিউন রহমান

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ জঙ্গি সামিউন রহমান ওরফে ইবনে হামদুনকে (৩৫) গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দিল্লির বিশেষ পুলিশের একটি দল গ্রেফতার করে। পালিয়ে সে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে বসেই সে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করেছিল। ভারতে সামিউন নিজেকে সুমন হক বলে পরিচয় দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে নিজের আসল পরিচয় বলে। দিল্লি পুলিশ ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। এর আগে ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে সামিউনকে গ্রেফতার করেছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সে মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গি কার্যক্রমে অংশ নিতে দেশ থেকে তরুণদের পাঠানোর জন্য কাজ করছিল। গ্রেফতারের পর সে জামিনে বের হয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। প্রথমে সে ভারতের মনিপুরের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছিল। তার জামিন পাওয়ার বিষয়টি জানতো না দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আনোয়ার হোসেন ফারুক

ভারতের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় ছয় জেএমবি জঙ্গিকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিজোরামের আইজল থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। তারা হলো আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে এনাম ওরফে কালো ভাই, মাওলানা ইউসুফ ওরফে বক্কর ওরফে আবু খেতাব, জাহিদুল শেখ ওরফে জাফর ওরফে জবিরুল, মো. রফিকুল ওরফে মো. রুবেল ওরফে পিচ্চি, শহিদুল ইসলাম ওরফে শামীম এবং আবুল কালাম ওরফে করিম। এদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন ফারুক, রুবেল ও জাহিদুল জেএমবির সদস্য। ফারুক ২০১৪ সালে ময়মনসিংহে ত্রিশালে পুলিশ ভ্যানে হামলা চালিয়ে ছিনতাই হওয়া জঙ্গিদের একজন। ওই সময় তাকে ধরিয়ে দিতে ৩০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ফারুক জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার কাছে রয়েছে। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। ভারতের পুলিশের সঙ্গে আমরা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেছি।’

জেএমবি সদস্য মুশারফ ও রুবেল

গত ২৪ জুলাই মুশারফ হোসেন ওরফে মুসা ও রুবেল আহমেদ ওরফে রুবেল নামে দুই বাংলাদেশি যুবককে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। ভারত দাবি করেছে, এ দুজন জেএমবির সদস্য। তবে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতর বলেছে, ‘বাংলাদেশে তাদের বিরুদ্ধে নাশকতা বা জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্ট কোনও কিছু এখনও পাওয়া যায়নি।’

গ্রেফতার হওয়া দুজনের বাড়িই ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর থানার টেংরিয়া গ্রামে। মুশারফ হোসেন মুসার বাবার নাম হাসান আলী। মুসা লেখাপড়া করেছে ময়মনসিংহের একটি মাদ্রাসায়। অন্যদিকে রুবেল সিলেটে থেকে লেখাপড়া করেছে। তবে গ্রেফতার হওয়ার আগে প্রায় ছয় মাস ধরে তারা দুজনেই নিখোঁজ ছিল। তাদের স্বজনরা কোনও খোঁজ জানতো না।

পুলিশ সদর দফতরের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘রুবেল নামের আমরা একজনকে খুঁজছি অনেকদিন ধরে। সেই রুবেল এই রুবেল কিনা, তা তদন্ত করছি। আমাদের সঙ্গে ভারতের পুলিশের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।’

মঙ্গলবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভারতের গণমাধ্যম বেশ গুরুত্ব দিয়ে জেএমবির এই দুই সদস্যের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করে। পত্রিকাগুলো দাবি করেছে, বাংলাদেশে পুলিশের টানা অভিযানে তারা পালিয়ে ভারতে গেছে। ভারতে তারা বড় নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল বলেও পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। দুজনেই ভারতের কারাগারে রয়েছে।

জেএমবি সদস্য মুসা

২০১৬ সালের ৪ জুলাই ভারতের বর্ধমান স্টেশন থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মো. মুসাউদ্দির ওরফে মুসা (৪০)। প্রথমে তাকে সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার আসামি মনে করা হলেও পরে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে সে ওই মুসা নয়। ভারত ও বাংলাদেশ পুলিশ তথ্য চালাচালি করে নিশ্চিত হয়, নাম এক হলেও তাদের ঠিকানা ভিন্ন। ভারতে গ্রেফতার মুসা জেএমবির সদস্য। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মো. মনিরুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গ্রেফতার মুসাকে বাংলাদেশ পুলিশের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওই মাসেই ভারতের সহযোগিতায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে জেএমবির সদস্য। মুসার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে।

সালেহীনও ভারতে?

ত্রিশালে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সোহেল (৪০) ভারতেই পালিয়ে আছে বলে বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে। তাকে কয়েকবার গ্রেফতারের উদ্যোগ নিয়েও শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হয় ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বোমা মিজানের সঙ্গে তার আদর্শিক পার্থক্য থাকায় তারা জেএমবির দুইটি গ্রুপকে আলাদা করে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করতো। সালেহীন ভারতে বসেই বাংলাদেশের একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে দুই দেশেরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ভারতের কারাগারে থাকা এসব জঙ্গির বিষয়ে সব সময়ই তথ্য পাচ্ছে বাংলাদেশ। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে ভারতে গিয়ে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের কত নাগরিক উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের অপরাধে ভারতের কারাগারে বন্দি বা বিচারের মুখোমুখি আছে, তা পুলিশ সদর দফতর নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি।

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার এআইজি সোহেল রানা বলেন, ‘বাংলাদেশের কতজন জঙ্গি ভারতের কারাগারে আছে— এই তথ্যটি এখনও নিশ্চিত করে পাওয়া যায়নি।’ বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ