প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

হক ভাইকে নিয়ে যৎসামান্য

ফরিদ কবির: আমি সম্ভবত অল্প বয়স থেকেই ছিলাম পাকা! বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেই আমি ভারি ভারি বই পড়তে শুরু করেছিলাম। সে সময়ে যে বইগুলো আমার পড়ার বয়স হয়নি, আমি সেসব বই পড়তে শুরু করেছিলাম! এবং এতে একটা সুবিধা আমার হয়েছিলো। আমি ভালো লেখাগুলো বুঝতে পারতাম! বিশেষ করে, নতুন ধরনের লেখাগুলো আমি সনাক্ত করতে পারতাম!

হক ভাইয়ের লেখাগুলো আমাকে তেমনই টানতে শুরু করেছিলো। আমি তাঁর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ লেখা পড়েছি। কিন্তু হক ভাই উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক এমনকি কবিতায়ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও তিনি যেন ছিলেন তাঁর নিজের আলোর চাইতেও কিছুটা নিষ্প্রভ! কেন? এ প্রশ্নটি আমি নিজেকেও করেছি অনেকবার! আমার ধারণা, কবিতায় তিনি বাংলাদেশের প্রথম ৫ জনের একজন! কিন্তু তা সত্ত্বেও কবি হিসেবে তাঁর নাম খুব কমই উচ্চারিত হতো। নাগাড়ে দশ জন কবির নাম উচ্চারণ করলেও কবি বা সমালোচকেরা তাঁর নামটি উচ্চারণ করতেন না! উপন্যাস বা ছোট গল্পের ক্ষেত্রেও তাঁর নাম খুব কমই সমীহ নিয়ে উচ্চারিত হতে দেখেছি। বিভিন্ন আড্ডায় তাঁর অবস্থান যেন ছিলো কিছুটা দ্বিতীয় সারিতে! প্রথম নিঃশ্বাসের সঙ্গে এই যে তাঁর নাম কেউ উচ্চারণ করতেন না, তার পেছনের কারণটা পরে আমি আবিস্কার করেছি!

হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনটি আমার আজ স্পষ্ট মনে পড়ে না! তবে এটুকু মনে আছে, প্রথম দিনই আমি তাঁর ‘দূরত্ব’, ‘অন্তর্গত’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম! কিছু উপন্যাসে তিনি ইংরেজি বা উর্দু সংলাপের বদলে সাধুরীতি ব্যবহার করেছিলেন, কথা উঠেছিলো সেসব নিয়েও। তাঁর ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’ ও ‘পরানের গহীন ভিতর’ নামের দুটো কবিতার বই নিয়েও কথা হয়েছিলো। প্রায় একই সময় রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহও কবিতায় আঞ্চলিক বা মিশ্র-ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তা নিয়ে আমাদের কিছু কথাবার্তা হয়েছিলো। ঠিক কী তিনি বলেছিলেন, তার বিস্তারিত আমার মনে নেই। তবে, তিনি আমাকে সম্ভবত পছন্দ করেছিলেন এটা বুঝতে পেরে যে আমি তার অনেকগুলো বই এরই মধ্যে পড়ে ফেলেছি। ফলে, মাঝেমধ্যেই যাতে তাঁর গুলশানের বাড়িতে আমি যাই সে আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন!

আমি মাঝেমধ্যে সে সময় গুলশানে তাঁর বাড়িতে যেতাম! হক ভাইয়ের কাছে যে খুব বেশি লোক যেতেন, তা আমার মনে হয় না! বিশেষ করে, খুব কম তরুণ কবি-লেখককেই আমি তাঁর বাড়িতে দেখেছি! এমনকি, তাঁর সঙ্গে আমার এই যোগাযোগ দেখে অনেকেই বিস্মিত হতেন! এমনকি, অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার কী কথা হয়!

এর বড় কারণ, কোনো এক অজানা কারণে তরুণ লেখক-কবিরা হক ভাইয়ের বাসায় যেতেন না। সেই সময়টাতে আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, এমনকি আহমদ ছফাকে কেন্দ্র করে অনেক আড্ডা হলেও হক ভাইকে কেন্দ্র করে তেমন আড্ডা গড়ে ওঠেনি!

এর দুটি কারণ ছিলো বলে আমার মনে হয়! এক, তিনি সবার সঙ্গে খুব বেশি মিশতেন না। খুব নির্বাচিত লেখক-কবিদের সঙ্গে তিনি মিশতেন বলেই মনে হতো। দুই, প্রায় সকল সময়েই তাঁর সঙ্গে সরকারের শীর্ষ লোকদের যোগাযোগ আছে বলে অনেকে সন্দেহ করতেন! এর ফলে অনেকেই তাঁর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেন! আমার এমনও মনে হয়, হক ভাইয়ের কাছ থেকে লেখকরা দূরত্ব বজায় রাখতেন কিছুটা ভয় থেকেও। সেটা হচ্ছে, হক ভাইয়ের পড়াশোনা ছিলো বহুমাত্রিক ও বহুবিচিত্র। তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতে হলে কিছুটা জানাশোনা না থাকলে চলবে কেন? আমার নিজেরও মনে হয়, অন্য যে কোনো কবি-লেখকের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হলেও হক ভাইয়ের সঙ্গে খুব কমই সাহিত্য বিষয়ে তর্ক করেছি! আমার নিজেরও তাঁর সঙ্গে সাহিত্য বিষয়ে তর্ক করার ব্যাপারে একটা ভয় কাজ করতো!

হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এতোটাই ঘনিষ্ট ছিলো যে তাঁর সঙ্গে আমার অনেক ব্যক্তিগত আলাপও হতো। তিনি আমার চাকরি সম্পর্কে, আমাদের সংসার ও দাম্পত্যজীবন সম্পর্কেও খোঁজখবর নিতেন! আমার অনুমান, তিনি আমাকে বেশ স্নেহই করতেন! আমার পদোন্নতি হতে একবার দেরি হচ্ছিলো, শুনেই তিনি বললেন, দাঁড়াও, এক্ষুণি আমি প্রফেসর আজাদকে ফোন দিচ্ছি। আমি তাকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু তিনি এই স্বীকারোক্তি আদায় করে নিয়েছিলেন, যেন কোনো সমস্যা হলে আমি তাকে জানাই।

আমি তাঁর সঙ্গ বরাবর পছন্দ করতাম! কারণ, তাঁর কাছ থেকে সব সময়েই কিছু না কিছু জানা যেতো, শেখা যেতো। সত্যি বলতে, ঢাকায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আহমদ ছফা ছাড়া আর কোনো লেখক-কবির কাছ থেকেই কিছু জানা যেতো না। তবে যে কোনো কারণেই হোক, সে সময়টাতে আমাদের মতো তরুণ লেখক-কবিদের কাছে সবচাইতে জনপ্রিয় ছিলেন কবি আহসান হাবীব ও শামসুর রাহমান!
হক ভাই সে অর্থে কখনো জনপ্রিয় ছিলেন না। জনপ্রিয় লেখক তিনি ছিলেন না। তবে তাঁর যথেষ্ট পাঠক আছে বলে আমি মনে করি। কেননা, তাঁর যে কোনো বই বেরোলেই আমি তা সংগ্রহ করতাম। আমার মতে তিনিই ছিলেন তার সময়ের সবচাইতে নিরীক্ষাপ্রবণ লেখক। তাঁর নিজের একটা অননুকরণীয় গদ্যভাষা ছিলো, যে ভঙ্গিতে তিনি লিখতেন। এমন আলাদা একটা গদ্যভাষা বাংলাভাষায় খুব কম লেখকেরই আছে। উপন্যাস বা ছোটগল্পের বিষয় অনুযায়ী তিনি প্রায়ই তাঁর ভাষা বদলে ফেলতেন! তা সত্ত্বেও তাঁর গদ্য পড়ে তাঁকে সনাক্ত করতে কারোর অসুবিধে হয় না! সৈয়দ হকের কৃতিত্ব এখানেই। আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথের পর সৈয়দ শামসুল হকই একমাত্র লেখক, সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়ই যার গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রিবিউশন আছে!

আশির দশকের মাঝামঝি সময়ে আমি কিছু সময়ের জন্য একটা প্রকাশনা সংস্থায় উপদেষ্টা হিশেবে কাজ করেছিলাম। একদিন আমি হক ভাইকে তাঁর একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি দিতে অনুরোধ করলে তিনি দিতে রাজি হলেন! কয়েক মাস পর তিনি ‘জলেশ্বরীর গল্পগুলো’ নামে একটা পাণ্ডুলিপি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আগে গল্পগুলো পড়বে। তারপর তোমার মতামত জানাবে।
পাণ্ডুলিপি পড়ে আমি একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি তাঁকে ফোন করে আমার মুগ্ধতা জানালে হক ভাই খুব খুশি হয়ে গেলেন। এতোটাই যে তিনি আমাকে একদিন ঢাকা ক্লাবে তার সঙ্গে পানাহারের আমন্ত্রণ জানালেন।

হক ভাই সম্পর্কে একটা অভিযোগ আমি শুনতে পেতাম, তিনি মানুষ হিশেবে কিছুটা কৃত্রিম! অনেকেই আমাকে এটা বলতেন যে হক ভাই ততোটা আন্তরিক নন। যদিও আমার তা কখনো মনে হয়নি। তবে, তাঁর কিছু কিছু কাণ্ড আমাকেও যে বিস্মিত করেনি তা নয়। অনেক জায়গায় তিনি অকারণেই ডিক্টেট করতে চাইতেন। তিনি বুঝতে চাইতেন না, এটা অন্যের ইগোকে আহত করবে কিনা!
আমি তখন দৈনিক আজকের কাগজে। আমার বন্ধু কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এ কাগজের সাহিত্য সম্পাদক। তিনি একবার বেশ দীর্ঘ একটা কবিতা দিলেন। তারপর শাহরিয়ারকে বললেন, কবিতাটি যেন পুরো দু’ কলাম জুড়ে ছাপা হয়। তিনি এও বলে দিলেন, ওই কলামে কবিতা দেয়ার পর যদি কিছু স্পেস থাকে তাতে আর কোনো কবিতা যেন না দেয়া হয়। শাহরিয়ার বললো, তবে সেখানে কী দেবো, হক ভাই?
হক ভাই বললেন, সেখানে সম্ভব হলে ইলাস্ট্রেশন দিয়ে দিও।
আমার মনে আছে, এতে শাহরিয়ার বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। সে হক ভাইয়ের কবিতার নিচে আমার কবিতা ছেপে দিয়েছিলো। এতে হক ভাইও বেশ নাখোশ হয়েছিলেন।
একই সময়ে তিনি আমাকেও একটি কলাম দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর কলামটি যেন আমি সিঙ্গেল কলামে ছাপি। এমনকি, তিনি তাঁর ন্যাড়া মাথার একটি ছবি দিয়ে সেটিসহ ছাপতে বলেছিলেন! সব দৈনিক কাগজেরই একটা নির্দিষ্ট ফরমেট থাকে। ইচ্ছা করলেও সেটা হুট করে পালটানো যায় না! আমি যতোই তাঁকে বোঝাই, সেটা সম্ভব না, তিনি কিছুতেই বুঝতে চান না!
আমি রাজি না হলে তিনি পত্রিকার সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানের কাছে চলে গেলেন! এতে আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম! কারণ আমরাই তাকে নাঈমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। কাজেই আমাকে ডিঙিয়ে নাঈমের কাছে গেলে আমার কেমন লাগবে তা তিনি বুঝতে চাননি! নাঈম আমাকে লেখাটি হক ভাইয়ের পছন্দমতো ছাপাতে বললেও আমি সেটা নানা অজুহাতে ছাপাইনি।

এসব সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আমার প্রিয় লেখকদের একজন। তাকে বাইরে থেকে যতই কঠিন, হিশেবি আর কৃত্রিম মনে হোক না কেন, তিনি ভেতরে ভেতরে ছিলেন অন্য আরো অনেকের মতোই নরম, আন্তরিক।

১৯৮৬ সালের কথা। আমার একবার বেশ কিছু টাকার দরকার হয়ে পড়লো। সে সময়টায় আমি আর্থিকভাবে ছিলাম খুবই বিপর্যস্ত! আমার বন্ধুদের কাছে টাকার অঙ্কটা তখন বেশ বড়ই! আমার কী মনে হলো, আমি হক ভাইয়ের বাসায় গেলাম! আমার ভাগ্য সুপ্রসন্নই ছিলো বলতে হবে। হক ভাই বাসায়ই ছিলেন! আমাকে দেখে হক ভাই বললেন, কী ব্যাপার তোমাকে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে!
আমি কীভাবে বলবো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না!
তিনি বললেন, চা খাবে তো?
আমি বললাম, খেতে পারি।
তিনি উঠে গিয়ে চায়ের জন্য বলে এসে আমার সামনে বসলেন। তারপর আবারও বেশ আন্তরিক স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলবে?
আমি কয়েকবার ঢোক গিলে বললাম, হক ভাই, আমার বেশ কিছু টাকা দরকার।
হক ভাই এ কথায় কিছুটা চমকালেন! আমি হঠাত টাকা চেয়ে বসতে পারি তিনি হয়তো সেটা কল্পনাই করতে পারেননি! কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে হয়তো বোঝার চেষ্টা করলেন, আমার বিপদ ঠিক কতোটা।
তারপর বললেন, কতো টাকা?
আমি বললাম, তিন হাজার!
তিনি বললেন, তিন হাজারই লাগবে?
আমি মাথা নাড়লাম।

হক ভাই দেবেন কিনা আমি বুঝতে পারছিলাম না! আমার সে সময় কেন জানি মনে হতে থাকলো, তাঁর কাছে আমার আসাটা ঠিক হয়নি!
যারা হক ভাইকে চেনেন, তাদের কাছে তার এমনই একটা ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে যাতে সকলেরই মনে হবে, হক ভাই আর যাই হোক, টাকা দিয়ে কাউকে হেল্প করবেন না!

আমি চা খাচ্ছিলাম! হক ভাই আমাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছিলেন! এখান থেকে কোথায় যাবো, বাসায় সবাই ঠিক আছে কিনা- এসব।
আমি চা শেষ করে উঠলাম। বললাম, হক ভাই, আমি আসি।
হক ভাই বললেন, একটু বোসো। আমি আসছি।

হক ভাই ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আমার দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, নাও এটা রাখো।
টাকাটা নেয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন, কবে ফেরত দেবে?
আমি বললাম, আগামি মাসের প্রথম সপ্তাহে।

কিন্তু সেই টাকাটা আমি তাঁকে কখনোই ফেরত দিতে পারিনি! তিনিও কখনো আমার কাছে চাননি!

বাংলা ভাষা হক ভাইয়ের সাহিত্যকর্মের জন্য নিশ্চয়ই ঋণী থাকবে। কিন্তু তাঁর কাছে আমার ঋণ দু’ রকমের!
তাঁর সাহিত্যকর্ম আর, তাঁর তিন হাজার টাকা।
এর কোনোটাই শোধ করার সাধ্য আমার নেই।

সূত্র: কবি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত