প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইনমন্ত্রীর জন্যই ওয়াহহাব মিয়া অভিষিক্ত, সিনহাকে জানান প্রধানমন্ত্রী

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ২০০৯ সালের ২২ ডিসেম্বর সে সময়ের প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিনের অবসরে যাওয়াটা ছিল নির্ধারিত। তিনি মো. তফাজ্জল ইসলাম ও মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে ডিঙান। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর শপথ নিয়ে মো. তফাজ্জল ইসলাম ১৭তম প্রধান বিচাপতি হন এবং ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর অবসরে যান। দুই মাসেরও কম সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন। তাকে প্রধান বিচারপতি করার কারণটি হচ্ছে তিনি বেঞ্চে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি করেন।

যখন খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি তখন তিনি আপিল ডিভিশনটি সংকুচিত করে তিন সদস্যে সীমাবদ্ধ করেন: সেখানে তার সঙ্গে ছিলাম আমি ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন। মো. আবদুল ওয়াহহাব মিয়াকে এড়াতে সরকার পদপূরণে দেরি করছিল। অথচ কোর্টে কাজের চাপে মাত্র তিনজনের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা সম্ভবপর হচ্ছিল না। সে সময় আবদুল ওয়াহহাব মিয়া হাইকোর্ট ডিভিশনে সবচেয়ে সিনিয়র জজ। যখন সরকার তাকে আপিল ডিভিশনে পদোন্নতি দিতে নিষ্ক্রিয় ছিল, তাতে বোঝা যাচ্ছিল সেখানে অপরাপর জুনিয়র জজকে দায়িত্ব দিলে সুপ্রিম কোর্ট বারে ক্ষোভ দেখা দিতে পারে, কারণ তিনি আওয়ামী লীগ মতাদর্শের ছিলেন না, বরং বিরোধী রাজনীতিকদের সঙ্গে তার ছিল ঘনিষ্ঠতা। তিনি বারের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্ট বার তখন বিএনপি সমর্থক আইনজীবিদের করায়ত্তে ছিল ও আবদুল ওয়াহহাব মিয়া তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি বার অ্যাসোসিয়েশনে দুইবার সচিব ছিলেন। তিনি তার পদোন্নতির জোর তৎপরতা চালান। এক সময় তিনি উন্মুক্ত কোর্টে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন এবং সেটা বার অ্যাসোসিয়েশন ও বিচারকদের আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়।

অবশেষে আবদুল ওয়াহহাব মিয়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে নাজমুন আরা সুলতানা, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মুহাম্মদ ইমান আলী ও হাসান আবুল ফয়েজ সিদ্দিকের সঙ্গে নিজের নামটি যুক্ত করতে সক্ষম হন। শেষের তিনজনই ছিলেন তার জুনিয়র। পরে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি জুডিশিয়ারি সম্পর্কে জানতে চেয়ে এক পর্যায়ে আমাকে বলেন যে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কারণে আবদুল ওয়াহহাব মিয়াক দায়িত্ব দিতে বাধ্য হন। পরে জেনেছি ওয়াহহাব মিয়া আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাকে আলিঙ্গন করেন এবং পদোন্নতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশের ক্ষেত্রে তাকে বোঝাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে আনিসুল হক আমার কাছে সেই ভুলটি স্বীকার করেন এবং জানান সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমালোচিত হচ্ছেন।

অনেক সময় আমি প্রধান বিচারপতির শুধু তার ছুটিতে ভ্রমণকালীন নয়, বরং নিয়মিত কোর্ট চলাকালীন অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির অফিসের দায়িত্ব পালন করেছি। এমন দায়িত্বপালনকালীন একদিন যুগান্তর পত্রিকায় ফারুক আহমেদের দুর্নীতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন দেখলাম। প্রতিবেদনটি মামলার নম্বর ছেপেছে। কয়েকদিন আগেই ঢাকার বিশেষ জজ হিসেবে ফারুক আহমেদ অবসরে যান। তাতে অভিযোগ করা হয়েছে অবসরে যাওয়ার ছয় মাস আগে থেকে তিনি ব্যাপক দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। খবরটি পড়ে আমি দ্রুত সেই কোর্টে যাই। তদন্তে দেখলাম তিনি দিনে দুই বা ততোধিক মামলায় রায় দেন। আরও দেখলাম, সাক্ষির উপস্থিতিগত পদ্ধতির ভিত্তিতে এক বা দুইজন সাক্ষির জেরা ও অপরাপর সাক্ষির উপস্থিতি ঘটার আগেই তিনি রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি বন্ধ করে দোষীকে খালাস দেন। আমি দুই মাসের জুডিশিয়াল রেকর্ডে দেখলাম, তিনি প্রায় একশো মামলার নিস্পত্তি করেছেন, যার অধিকাংশই স্বর্ণ অথবা অন্য মূল্যবান পণ্য চোরাচালানের ছিল। দেখলাম রাষ্ট্রপক্ষের সঙ্গে ষড়যন্ত্র বা সহযোগিতা, যা বেঞ্চ অ্যাসিসটেন্ট ও আইনজীবিদের তদন্তে বেরিয়ে আসে। অধিকন্তু, রাষ্ট্রপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া এভাবে রায় দেয়া সম্ভব ছিল না। আমি বেঞ্চ অ্যাসিসটেন্ট ও অন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলাম প্রিন্টার এনে মামলাগুলোর রেকর্ড প্রিন্ট করতে, যাতে আমি একটি রিপোর্ট তৈরি করতে পারি, কারণ পরদিন প্রধান বিচারপতি তার অফিসে ফিরবেন। দেখলাম যে মামলাগুলো শুনানির জন্য প্রস্তুত ছিল না, সেক্ষেত্রে নিজে অভিযোগ তৈরি করে পরদিন জেরা ঠিক করে একজন সাক্ষিকে পরীক্ষণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ বন্ধ করেন এবং রায়গুলো দেন।…আমি রাত ১০টায় রিপোর্টটি চূড়ান্ত করি এবং রেজিস্ট্রারারকে না ফেরা পর্যন্ত অফিস খোলা রাখতে বলি। অবসরে যাওয়া সেই কর্মকর্তার ব্যাপক দুর্নীতির বিস্তারিত রিপোর্টটি তদন্তের উল্লেখ করে দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দেই এবং নির্দেশনা দেই যাতে মন্ত্রণালয় তার পেনশন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখে। তাতে এটাও উল্লেখ করি সময়াভাবে অন্য মামলাগুলো তদন্ত করা যায়নি। খবরটি গণমাধ্যমে পরদিন ফাঁস হলে প্রধান বিচারপতি এসেই জিজ্ঞানা করেন কেন তা দাখিল করেছি এবং তা প্রত্যাহার করতে বলেন। তাকে জানালাম তার ক্ষমতাবলে করতে পারেন, কিন্তু আমি করবো না। ওই কর্মকর্তা ছিলেন দুর্নীতিপরায়ন এবং মন্ত্রণালয় তার নামটি তিনবার প্রস্তাব করেছে জিএ কমিটিতে, যা প্রধান বিচারপতি ও হাইকোর্ট ডিভিশনের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত। এই কর্মকর্তা ছিলেন কিশোরগঞ্জের এবং প্রধান বিচারপতিও একই এলাকার। বিষয়টি আইনমন্ত্রীর নজরে আনা হলে, তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

দ্রষ্ট্রব্য: ধারাবাহিক পর্যায়ে বিচারপতি সিনহা রচিত বইয়ের ষষ্ট অধ্যায়ের চুম্বকাংশগুলোই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ই-মেইল: [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ