প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

পরকীয়া ‘বিতর্ক’ ও ‘মনোগ্যামিতা’র ধাপ্পা

সাদিয়া নাসরিন : দক্ষীণ এশিয় সমাজে ‘পরকিয়া’ যৌনপেশার চেয়েও ঘৃণীত। এই সমাজে যৌনকর্মির কাছে যাওয়াটা একজন পুরুষের জন্য পরকিয়ার তুলনায় লঘু অপরাধ। কারণ, পুরুষ যখন একজন যৌনকর্মির কাছে যায়, তারা ধরেই নেন সেই যৌনকমির্র স্বামী নেই, স্বামীর প্রতি কমিটমেন্ট ভাঙ্গার প্রশ্ন নেই (?), সুতরাং পুরুষতন্ত্র পুরুষকে এই নিভর্রতা দিয়েছে যে, ‘গণিকাগমন’ সমাজে বিশৃংখলা তৈরি করেনা!

অতএব, পরকিয়া নিয়ে এই যে আমাদের পুরুষ সমাজের ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার, এতো বিতর্ক সেটা আসলে একজন নারীর তার স্বামীর প্রতি কমিটমেন্ট ভঙ্গ করা নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আতংক থেকে। সমাজ ঠিক করে দিয়েছে একজন নারী তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ততা ভঙ্গ করলেই সমাজে বিশৃংখলা হয়। অথচ পুরুষের এই সমাজ পুরুষের বহুগামিতাকে সবসময়ই স্নেহসুলভ প্রশ্রয় দিয়েছে।

মূলত পরকিয়া হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের বাই ডিফল্ট। বিয়ের মতো একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্যই পরকিয়ার মতো অনৈতিক (?) সম্পর্কটি জিইয়ে রেখেছে পুরুষতন্ত্র। এক সময়ের বহুপতিœক পরিবারের পরিবর্তে যেদিন থেকে ‘এক নারী এক পুরুষের’ বিয়ে প্রথা চালু হয়েছে সেদিন থেকেই পুঁজিবাদি-পিতৃতান্ত্রিক-মনোগ্যামাস সমাজে ছত্রাকের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অবৈবাহিক সম্পর্ক।

অন্যদিকে, যে যৌননিষ্ঠার ধারণার ভিত্তিতে ‘মনোগ্যামি ফ্যামিলি’ বা একক বিয়ে প্রথা চালু হয়েছে, বেশিরভাগ পুরুষই কিন্তু সেই যৌননিষ্ঠা পালন করেনি। বরং একক পরিবার গঠন করার পর পুরুষ ব্যাপক হারে শুরু করেছে যৌনতাক্রয়ের সংস্কৃতি। ধীরে ধীরে বসত গড়লো যৌন পল্লী, স্বীকৃত হতে থাকলো পুরুষের বহুগামিতা, যা আগেও ছিলো। আবার যৌনপল্লী যেতে পুরুষের বেশিদিন ভালো লাগেনি বলে এক সময় শুরু হলো ‘পরস্ত্রীগমন’। আর তখনই ব্যপ্তি পেলো পরকিয়া শব্দটির ঘৃণ্যতা। কারণ, পরকিয়া শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে এর একপাশে থাকা ‘পরস্ত্রী’কে যেভাবে ফোকাসে দেখতে পাওয়া যায়, পুরুষটি কখনো তেমনটা ফোকাসে আসেনি।

পৃথিবীর ইতিহাসে পুরুষতন্ত্র নারীকে সবচেয়ে বড় যে ধাপ্পাটি দিয়েছে তার নাম মনোগ্যামিতা, যেখানে যৌননিষ্ঠার দায় আরোপিত হয়েছে শুধু নারীর উপর। নারীর মনে যৌনতা নিয়ে ট্যাবু তৈরি করে, শিশুকাল থেকে মগজের মধ্যে ‘বিয়ে’ ঢুকিয়ে দিয়ে তার সামনে প্রতিষ্ঠিত করেছে মনোগ্যামিতার আদর্শ। পুরুষতন্ত্র ঠিক করেছে, নারীর বিশ্বস্ততা পুরুষের জন্য বেশী জরুরি। কেননা এখানে সন্তানের মালিকানার প্রশ্ন আছে। সামজিক শৃংখলা রক্ষার দায় আছে।

সুতরাং আপনি মানেন বা না মানেন, যতোদিন বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি ধর্মের মন্ত্র দিয়ে মানুষের পছন্দ ও মনস্তত্ত্বকে ‘বৈধ অবৈধ’ বলে নিয়ন্ত্রণ করবে, রাষ্ট্র তার আইন দিয়ে ‘প্রেম’কে শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নির্দিষ্ট করে বাকি সব সম্পর্ককে অবৈধ বলে সিদ্ধান্ত দেবে, নারীর গর্ভ ও গর্ভজাত সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিয়েকে ইলাস্টিকের মতো টানতে শেখাবে, ততোদিন পরকিয়ার মত অনৈতিক (?) সম্পর্কে জড়াতে থাকবে মানুষ। ইউসুফ জুলেখা-লাইলি মজনু-রাধা কৃষ্ণের মিথ থেকে কেনেডি মনরো-মনিকা ক্লিন্টন, এসবই কিন্তু সেই ‘পরকিয়া’ নামক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

এই বাস্তবতা স্বীকার করা বা না করা আপনার স্বাধীন ইচ্ছা। আপনি বড়জোর জাজমেন্টাল হতে পারবেন, পরকিয়া নিয়ে ছিঃছিকার করতে পারবেন, আইন তৈরি করতে পারবেন, কিন্তু তাতে সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষার বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারবেন না। বিশ্বস্ততার বোধ পারষ্পরিক, এটা পারষ্পরিক সম্মান ও মানসিক যোগাযোগ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে আসে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত