প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ক্রোধ

ফাতেমা বেলি সায়মা: আজ অনেকদিন পর নিলার কাছে যাচ্ছি। নিলার বিয়ের পরপরই আমি দেশের বাইরে চলে যাই। আমার আরও দুমাস পর দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু নিলার খবরটা শুনে একটু তাড়াতাড়িই আসতে হলো। আমি সায়মা, নিলার খুব ছোট বেলার বান্ধবি। সারাজীবন ওর সাথে একসাথেই ছিলাম, মানে স্কুল-কলেজ সবকিছুই একসাথে। প্রায় ছয় বছর পর দেশে ফিরলাম। কিন্তু এই ফেরার মধ্যে কোন আনন্দ ছিল না, আমি জানিনা আমার প্রিয় বান্ধবিকে কিভাবে কি অবস্থায় দেখবো। বাড়িটার কাছে আসতেই কেমন যেন একটা মনে হলো। সামনের ফুলের বাগানটা শুকিয়ে গেছে একেবারে, বোঝাই যাচ্ছে কেউ যতœ নেয় না। বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ, কোন উচ্ছ্বাস নেই, কেমন যেন ফ্রিজ হয়ে আছে। অবশ্য এমনই থাকার কথা, প্রাণহীন একটা বাড়ি আর কেমন হবে।

দরজাটা নিলার হাজবেন্ডই খুলে দিল। আমি উনাকে সালাম দিলাম। উনি আমাকে বসতে বললেন,

আজই এসেছেন?

না ভাইয়া গতকাল রাতে এসেছি,

ওহ ভালো।

নিলার হাসবেন্ডকে দেখলাম কেমন উস্কোখুস্কো, অথচ বেশ পরিপাটি ছিলেন উনি। আমি কিছুক্ষণ পর নিলার রুমে গেলাম। দেখলাম নিলাকে, ফ্লোরে বসে আছে, আর অসংখ্য খেলনা নিয়ে সাজাচ্ছে, আবার এলোমেলো করছে আবার সাজাচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। আমি ডাকলাম ওকে, নিলা তাকালো না। তারপর ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে ডাকলাম, নিলা শুনছিস?

এবার তাকালো, কিন্তু মনে হয় না সে চিনতে পেরেছে,

নিলাকে দেখে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এত সুন্দর চোখের নিচে কালি পড়েছে অনেক। চুলগুলো এলোমেলো, আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নিলা কাঁদছে আমাকে দেখে, তাহলে বোধ হয় এখন চিনতে পেরেছে। আমি কিছু বলতে নিচ্ছিলাম, ও আমাকে চুপ করে দিয়ে বললো, চুউপ আমার মেয়ে ঘুমায় এখন কথা বলিস না, এখন যা এখান থেকে। আমি সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে বের হয়ে আসলাম রুম থেকে। বসার ঘরে নিলার হাসবেন্ড বসে ছিল, আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কিছু বললো নিলা আপনাকে? চিনতে পেরেছেতো?

হ্যাঁ পেরেছে কিন্তু ওর অবস্থাতো অনেক খারাপ ভাইয়া। হুম ডাক্তার বলেছে ও আর ভাল হবে না, যতই দিন যাবে ও আরো অসুস্থ হয়ে যাবে।

নিলার হাসবেন্ড আমাকে বললো,

আপনিতো জানেন কি প্রচ- রাগি আর জেদি মেয়ে ছিল নিলা। যা ভাবতো তাই করতো, যা চাইতো তাই পেতে হতো, আর না হলেই প্রচ- রেগে যেত।

হুম জানি, ছোটবেলা থেকেই আমি জানি ওকে, এতটা রাগি হলেও কিন্তু খুব নরম মনের মেয়েও।

হুম নরম মনের হয়ে তাতে কি লাভ হলো সায়মা?

সেইতো আমাদের মেয়েটা এইটুকু বলেই থেমে গেলেন। আমি বললাম, আমি বেশ কিছুদিন দেশে থাকবো আর এই সময়টা আমি ওকে আবার ডাক্তার দেখাবো। লাভ নেই সায়মা, ডাক্তারের কাছে যেতে প্রচ- ভয় পায়। আমাদের মেয়েটাও ডাক্তার ভয় পেত।

কি হয়েছিল আসলে সেদিন? বলবেন আমায়?

নিলার হাসবেন্ড এতক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল না, এখন আমার দিকে তাকিয়ে বললো, বসুন বলছি…

সেদিন নিলা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছিল, ওর নাকি বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিলো। আমি ওকে বলেছিলাম আজকে কাজের চাপ বেশি, আজ আর যাওয়া হবে না, অন্যদিন যাবো। আমি দেরি করেই অফিস থেকে ফিরলাম, ওকে আর বাইরে নিয়ে যেতে পারলাম না সেদিন। ঐ যে বললাম ভীষণ জেদি আর একরোখা। যা বলবে তাই চাই।

আমি ফেরার পর আমাকে ও বললো, আমি নাকি আগের মতন নেই, ওকে আর আগের মত সময় দেই না, আমি চুপ ছিলাম বলে ও আরো রেগে গিয়েছিল। আর রেগে গেলে ও অন্য মানুষ হয়ে যায়।

একসময় রেগে গিয়ে ওর পাশে সাইড টেবিলে রাখা কাঁচের ফুলদানিটা আমার দিকে ছুঁড়ে মারলো, আমরা কেউই জানতাম না যে আমার পেছনেই আমাদের ছোট্ট মেয়ে আলো দাঁড়িয়ে আছে। ফুলদানিটা ছুঁড়ে মারতে দেখে আমি সরে গেলাম, আর তখনি ওই ভারি ফুলদানিটা আমার মেয়ের মাথায় খুব জোরে লাগলো।

আমার ছোট্ট মেয়েটা সাথে সাথেই মাটিতে পড়ে গেল। সারা ঘর রক্তে ভেসে গেল। হাসপাতালে নেয়ার আগেই আমার সোনা মেয়েটা না ফেরার দেশে চলে গেল, এতটুকু সময় দিল না আমাকে।

নিলার হাসবেন্ড দুইহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর বললো,  সেদিন থেকেই ওর এই অবস্থা। আমার মেয়ে গোসল করতে চাইতো না। গোসলের সময় হলে সারা বাড়ি দৌড়াতো, ওকে ধরা যেত না। একটু পরেই নিলাও সারা বাড়ি দৌড়াবে, আলোকে ধরতে। ও মানতেই চায় না যে আলো আর নেই। সেদিনের পর থেকে আমিও আর ঘুমাই না, ঘুমালেই মনে হয় সারা ঘর বুঝি রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

নিলার অকারণ রাগ আর জেদই ওকে শেষ করে দিলো, সাথে আমাকে আর আমার মেয়ে আলোকেও। জানি না কখন থেকে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমি নিলার ঘরে গিয়ে ওকে খুব করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।

গ্রন্থনা : নৌশিন আহম্মেদ মনিরা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত