প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাতলার বুকে লাল শাপলার স্বর্গ

খোকন আহম্মেদ হীরা: গ্রামের নাম সাতলা হলেও শাপলার কারণে পর্যটকদের কাছে এটি শাপলার বিল নামেই পরিচিত। এখানে লাল শাপলার সাথে সবুজ প্রকৃতির মাখামাখি দূর থেকেই চোখ পরে পর্যটকদের। কাছে গেলে ধীরে ধীরে সবুজের পটভূমিতে লালের অস্তিত্ব আরও গাঢ় হয়ে ধরা দেয়। চোখ জুড়িয়ে দেয় জাতীয় ফুল শাপলার বাহারি সৌন্দর্য্য। শাপলার বিলের অবস্থান বরিশালের উজিরপুর ও আগৈলঝাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায়।

প্রতিদিন বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ভ্রমণ পিপাসুরা স্ব-পরিবারে ছুটে আসছেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য শাপলার বিলের নয়নাভিরাম দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার জন্য। শাপলার বিল ঘুরে দেখতে পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের সু-ব্যবস্থা।

স্থানীয় চার উদ্যোক্তা পর্যটকদের জন্য বিলের মধ্যে খাওয়ার ও থাকার সু-ব্যবস্থা করেছেন। দেশ-বিদেশীদের কাছে শাপলার বিলের ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

উজিরপুরের প্রত্যন্ত এক গ্রামের নাম সাতলা। আর সাতলা গ্রামের আকর্ষণ ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশেষখ্যাতি রয়েছে লাল শাপলার। গত কয়েক বছর থেকে ভ্রমনপিপাসুরা সাতলা গ্রামকে লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে সাতলা নামের সাথে শাপলার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই স্থানীয়দের কাছে। বিলে ঠিক কতো বছর আগে থেকে এভাবে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে তারও কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেননি কেউ। এই বিলে শুধু শাপলাই ফোটে না, শীতের মৌসুমে যখন পানি কমে যায়, তখন এখানে কৃষকরা ধান চাষ করেন। সাধারণত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই বিলে লাল শাপলা ফুল ফোটে।

সাতলার পরিচিতি: উজিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা সাতলা বর্তমানে একটি পর্যটকমুখী এলাকা হলেও এটি একটি বিলের নাম। একসময়ে বর্ষাকালে এটা সম্পূর্ণ ডুবে থাকতো। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত প্রথম সাতলায় বাঁধ দেয়ার কাজ শুরু করেন। তারপর বিল থেকে বিশাল এলাকা উত্থিত হয়ে বর্তমানে মনোরম এলাকায় পরিণত হয়েছে সাতলা গ্রাম। এই বিলে প্রাকৃতিকভাবে শাপলা ফোটে। ছোট নদী, হাওর ও বিলবেষ্টিত ছোট একটি গ্রাম সাতলা।

বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়ন। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজের মধ্যেই চোখে পরে লাল শাপলার আভা। কিছুটা সামনে গেলেই নিজ অস্তিত্বের জানান দেয় ফুটন্ত লাল শাপলা। আর আস্তে আস্তে পরিস্কার হতে থাকে সবুজের মাঝে লাল শাপলার অবস্থান।

গ্রামের মধ্যদিয়ে বয়ে যাওয়া বাস চলাচলের রাস্তাটি গ্রামটিকে এনে দিয়েছে গতিময়তা। আর বিলের মাঝে ফুটন্ত লাল শাপলা গ্রামটিকে করেছে পরিপাটি। গ্রামের সাদাসিধে লোকজনের অতিথিপরায়ণতা যেকোন ভ্রমনপিপাসুদের মানসিকভাবে করে তোলে প্রাণবন্ত। এ ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ও খাজুরিয়া গ্রামের কয়েকশ’ হেক্টর জমি নিয়ে এ বিলের মূল অবস্থান। সবচেয়ে বেশি শাপলার উপস্থিতি দেখা মেলে সাতলার নয়াকান্দি ও মুড়িবাড়ি নামক এলাকায়। সাতলা শুধু লাল শাপলার উৎস নয়, বলা চলে এটি লাল শাপলার গ্রাম।

কীভাবে ঘুরবেন : লাল শাপলার বিলে ঘোরার জন্য অবশ্যই নৌকার প্রয়োজন হবে। এজন্য রয়েছে অসংখ্য নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত ট্রলার। সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ঘোরার জন্য আপনি নৌকা ও ট্রলারের পুরো বিল ঘুরে দেখতে পারবেন। নৌকা ও লোকজনের পরিমাণভেদে নৌকায় ভ্রমণের জন্য এ খরচের পরিমাণ তিন থেকে পাঁচশ’ টাকা। আর ঘুরতে বেরোনোর সময় অবশ্যই সাথে ক্যামেরা নিতে ভুলবেন না। কারণ, এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশকে দ্বিতীয়বার স্মরণ করতে চাইলে ক্যামেরায় তোলা ছবির বিকল্প নেই। ঘুরতে ঘুরতে শাপলার পাতার ওপর দেখা মিলতে পারে ছোট-বড় সাপের। ভয়ের কারণ নেই, এগুলো আপনার কোনো ক্ষতি করবে না। তবে সাবধানে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়।

কখন ঘুরবেন: সাধারণত আগস্টের শেষের দিকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে এই বিলে লাল শাপলা ফুল ফোটে। আর শাপলার আসল সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত। শাপলার প্রকৃত সৌন্দর্য ও ফুটন্ত অবস্থায় পেতে অবশ্যই এই সময়টাতে আপনাকে ঘুরতে হবে। কারণ সূর্যের উপস্থিতির সাথে সাথে শাপলা তার আপন সৌন্দর্যকে গুটিয়ে নেয়। তাই ফুটন্ত শাপলা পেতে হলে বিলের আশপাশে রাতযাপন করে অবশ্যই খুব ভোরে শাপলার বিলে যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য খুব ভালো একটা ব্যবস্থা নেই সাতলায়। তবে আরামদায়ক রাতযাপনের জন্য স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে তাদের আশ্রয়ে থাকা যেতে পারে। এতে খুব সকালে শাপলার বিলে ভ্রমণ আপনার জন্য সহজতর হবে। পার্শ্ববর্তী হারতা বাজারে রাতে থাকার জন্য স্বল্পখরচের দুটি হোটেল আছে, তবে সেটা শহুরে লোকজনের জন্য খুব একটা আরামদায়ক হবেনা। আরামদায়ক রাতযাপনের জন্য অবশ্যই উজিরপুর বা বরিশালের শরণাপন্ন হতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি সাতলার স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে থাকার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। এমনকি খাওয়া-দাওয়াও সারতে হবে এখানে। অবশ্যই আপনি তাদের অতিথিপরায়ণতায় মুগ্ধ হবেন।

কীভাবে যাবেন: ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে পয়সারহাট বা বৈঠাকাটাগামী যুবরাজ বা তরীকা-২ লঞ্চে হারতা নেমে খুব সহজে সাতলায় আসতে পারেন। ডেকের ভাড়া ২৫০ থেকে ৩০০ এবং সিঙ্গেল কেবিন এক হাজার থেকে বারোশ’ টাকা। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল লঞ্চে বরিশাল শহরে এসে সাতলা যেতে পারেন। নথুল্লাবাদ বাসস্টেশন থেকে ৩০ মিনিট পরপর সরাসরি সাতলার উদ্দেশে বাস ছাড়ে। যেখানে জনপ্রতি ভাড়া ৯০ টাকা। এছাড়া বরিশাল থেকে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার কিংবা মাহিন্দ্রা ভাড়া করেও যাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, বিলের সৌন্দর্য উপভোগের উপযুক্ত সময় ভোর থেকে সকাল আটটা এবং পড়ন্ত বিকেলে শাপলার রূপ-সৌন্দর্য বেশি। সূর্যের তেজ বাড়তে থাকলে শাপলা ফুলের পাপড়ি ছোট হয়ে যায়। ভ্রমনপিপাসুরা দীর্ঘদিন থেকে সাতলা বিলকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। অতিসম্প্রতি বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রাম চন্দ্র দাস, জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুমা আক্তার, গৌরনদীর ইউএনও খালেদা নাছরিন সাতলা বিল পরিদর্শন করেছেন। তারা দৃষ্টিনন্দন এই বিল ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন।

হারতার পাশের ইউনিয়ন আগৈলঝাড়ার বাগধায় সাতলার মতোই আরও তিনটি বড় বিল রয়েছে। বিলগুলোর নাম নয়াকান্দি, পটিবাড়ি ও কালবিলা। এসব বিলেও আষাঢ় থেকে কার্তিক মাসের মধ্যে লাল শাপলা ফোটে। এই চার বিলে পর্যটকরা যাতে সহজে যাতায়াত করতে পারেন সেজন্য উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা নিয়েছে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সাতলা বিল এলাকায় একটি আনসার ক্যাম্প স্থাপন এবং থাকার জন্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি ডাকবাংলো নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সাতলা বিলে যেকোনো পর্যটক এলে তারা মুগ্ধ হবেন। আর বরিশালের জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, সাতলা বিলে পর্যটনকেন্দ্র করার বিষয়টি পর্যটন করপোরেশনকে জানানো হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত