প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘গোলেমালে গোলেমালে পিরিত কইরো না’

অসীম সাহা: যারা প্রেম বা পিরিতির মজা বোঝে, তারা যে কারো সঙ্গে পিরিত করতে যাবে না। যদিও গানে আছে, ‘পিরিতি জানে না ভাওয়া ব্যাং’। কিন্তু ওটা ‘ধর্মেই আছে কেতাবে নাই’র মতো ব্যাপার। সবচেয়ে কালো-কুৎসিত ছেলেটিও প্রেমের জন্য সুন্দরী মেয়েটিকেই খোঁজে। সবাই তো আর কৃষ্ণের মামি নয় যে, কালো হলেও তার ভুজুঙভাজুঙে ভুলে গিয়ে মধ্যরাতে কদমতলায় অভিসারে যাবে? কিন্তু কখনো কখনো ‘কালো ছেলের নাম পদ্মলোচন’ হয় জেনেই বোধহয় ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, গণস্বাস্থ্যের জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আসম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ নায়করা এখন একসঙ্গে জোট বেঁধেছেন। আমাদের কিছু কিছু পত্রিকা এই জোটবদ্ধতাকে আহ্লাদ করে নাম দিয়েছে ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’। তা, কী করে এটা জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া হলো? ‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল’গোছের জনগণ-প্রত্যাখ্যাত কিছু নেতা আর সুশীল এক হলেই জাতীয় ঐক্য হয়ে যায়? কিছু দলের জোটবদ্ধতাকে যারা জাতীয় ঐক্য বলছেন, হয় তারা মূর্খ না হয় জ্ঞানপাপী। আসলে এই জোটের নেপথ্য কুশীলব যে বিএনপি, এটা নাবালক শিশুও বোঝে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বুদ্ধিতে ও কৌশলে হেরে হালে পানি না পাওয়া বিএনপি এখন কামাল হোসেনের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন। কামাল হোসেন জামাতের সঙ্গে সখ্য করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে এখন বিএনপির সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন। তাতে তাঁর বুকে কি পাকিস্তনি ও জামাতি-উষ্ণতার ঝাঁঝ একটুও লাগেনি? যে সব হাত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে কলুষিত, তিনি সেই হাত ধরতে কুণ্ঠাবোধ করলেন না? ২০০১ সালে বিএনপি যে সংখ্যালঘুদের জন্য বাংলাদেশটাকে ‘ধর্ষণকেন্দ্রে’ পরিণত করে ফেলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের সৈনিক ব্যারিস্টার কামাল হোসেন তা বেমালুম ভুলে গেলেন? কেন? শুধু শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হবে বলে? নাকি তিনিও আইনের দৃষ্টিতে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে লুটপাট এবং হিন্দু নারীদের গণহারে ধর্ষণকে জায়েজ হিসেবে দেখছেন?

আমি বিকল্পধারার বদরুদ্দোজার চৌধুরীকে নিয়ে বেশি ভাবি না। যারা দৌড় পছন্দ করেন, তাদের মধ্যে চৌধুরী সাহেব এক নম্বরে আছেন। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হবার পর ছাত্রদল ও বিএনপিকর্মীদের তাড়া খেয়ে রেল লাইন ধরে দৌড়ানোর দৃশ্য মনে আছে? ‘সেকি ভাই যায় রে ভোলা’? ভাগ্যিস একটা মোটর সাইকেলে চড়ে জান বাঁচাতে পেরেছিলেন। কিন্তু ধরুন এবার কোনো কারণে যদি ছাত্রলীগের ছেলেপেলে এবং আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁকে আবার দৌড়ানি দিতে বাধ্য হয়, তখন তিনি পালিয়ে বাঁচতে পারবেন তো? তখন কিন্তু কামাল হোসেন, মইনুল হোসেন, জাফরুল্লাহরা তাকে বাঁচাতে আসবেন না। আর আসম রব সব সময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে কাজ করেন। হাসিনার মন্ত্রীসভায় ডাক পেলে কখন ঐক্যজোটকে ‘বিধবা’ বানিয়ে অন্যকে ‘বিয়ে’ করতে চলে যান, তার কি ঠিক আছে? আর মাহমুদুর রহমান মান্নার কথা যতো কম বলা যায়, ততোই ভালো। সাত ঘাটের জল খাওয়া লোকটির কোনো নীতি আছে? থাকলে এতোবার কি নানা দলের সঙ্গে ‘বিয়ে’ বসে এখন তিনি নিজেই ঘটক সেজে বসতে পারতেন? তা হলে এই নীতি ও আদর্শহীন লোকটার কাছ থেকে জনগণ কী আশা করতে পারে?

আর দেশে পতিত রাজনীতিক তো একজনই আছেন মওদুদ আহমেদ। যিনি দুদু ও তামাক দুটোই পছন্দ করেন এবং যেখানে যতোটুকু পান, জান পেতে নিতে কসুর করেন না। সেই মওদুদ আহমেদ কী করেন, তা দেখার জন্য ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। মৃদু মৃদু হাসির আড়ালে মওদুদ যতোটা গর্জন করতে পারেন, তা থেকে কতোটা বর্ষণ হয়, লক্ষ করুন।

বাংলা অভিধানে ‘জগাখিচুড়ি’ বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ জগন্নাথ দেবের মন্দিরের খিচুড়ি। কিন্তু এর ব্যাপকতম অর্থ হলো নানা ধরনের তরকারির সাহায্যে খিচুড়ি রান্না করা, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘হচপচ’। তো সেই ‘জগাখিচুড়ি’ বা ‘হচপচ’-মার্কা দলকে যদি জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিতে হয়, তা হলে তারচেয়ে কৌতুকপ্রদ আর কী হতে পারে? এই জগাখিচুড়ি দিয়ে বিএনপি বড়োজোর তাদের ভক্তদের মনোরঞ্জন করতে পারবেন, কিন্তু শেখ হাসিনার টিকিটিও স্পর্শ করতে পারবেন বলে মনে হয় না! জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে বঙ্গবন্ধুর হাতের স্পর্শে ধন্য হওয়া সবচেয়ে সংগঠিত দল আওয়ামী লীগের লোকেরা ও শেখ হাসিনা বসে বসে আঙুল চুষবে এতোটা ভাবা কি কুঁজোর পাহাড়ে ওঠার বাসনার শামিল নয়? অতএব পিরিত যদি করতেই হয়, তা হলে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসীদের দলগুলোকে নিয়ে করুন। তা না হলে ‘গোলেমালে গোলেমালে পিরিত’ করলে সেই গোলের ফাঁদেই ঐক্যপ্রক্রিয়ার কুশীলবরা আটকা পড়বেন, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত