প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইন প্রণেতারাই আইনের প্রয়োগ করবেন, নাকি অন্যরা

অঘোর মণ্ডল : রাজনীতির ভাষা বহুরকম। ক্ষমতায় থাকলে একরকম। ক্ষমতার বাইরে গেলে কণ্ঠ এক থাকে। ভাষা ভিন্ন হয়ে যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে মন্ত্রী, এমপিরা যেভাবে কথা বলছেন, সেটা ক্ষমতার অভিমুখ ধরে চলা রাজনীতির ভাষা।

জাতীয় সংসদ অধিবেশন আগামী মাসে আবার বসবে। সেখানে বিষয়টা আলোচনা করে আইনটা সংশোধন করার সুযোগ এখনো আছে। তা না হলে একটা কথাই বলার আছে। সীমাহীন মুক্ত সাংবাদিকতাকে আইনের সীমারেখা দিয়ে আটকে রাখতে চাইলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রন্ত হবে দেশের গণতন্ত্র। দেশের উন্নয়ন। গণতন্ত্রের সংকীর্ণ পরিসরে দেশের উন্নয়নের সঠিক চেহারাও তুলে ধরা যায় না। সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিল পাস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা বলেছেন, সংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য এ আইন নয়। আর একটু তীক্ষè রসিকতা মিশিয়ে বলা হয়েছে; যদি সংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য এ আইন হতো তাহলে ‘সাংবাদিকরা টক শো-তে এই আইনের সমালোচনা করে কথা বলছেন কীভাবে!’ হ্যাঁ, আইনটা নিয়ে সাংবাদিকরা কথা বলছেন। আলোচনা-সমালোচনা করছেন। কিন্তু তারা বার বার বলছেন, এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে রুদ্ধ করতে পারে। সাংবাদিকদের কণ্ঠকে রোধ করতে পারে। তাদের সেই শঙ্কা কেন, সেটা সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের কাছে জানতে চাওয়া উচিৎ। কারণ, যারা সংসদে আইনটি পাস করলেন, প্রয়োগটা কিন্তু তারা করবেন না। করবেন আমলা-পুলিশ-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনরা।

আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী দেশ স্বাধীনের পর একটা পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। ‘গণকণ্ঠ’ নামক সেই পত্রিকার একটা সাইনবোর্ড এখনো হাতিরপুলে ইস্টার্ন প্লাজার কোণায় ঝুলছে। কিন্তু তারা এই পত্রিকাটার শৈশবে সেই সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সত্যের চেয়ে অসত্যের মিশেলে যা লিখতেন তার কিছু তো আর্কাইভে এখনও আছে। তাহলে সেগুলো কী দেশপ্রেমিক সাংবাদিকতার নমুনা হিসেবে সাংবাদিকতার পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে!

বর্তমান তথ্যমন্ত্রীও সে সময় যে ভাষায় আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করতেন সেগুলো নিয়ে যদি কেউ মামলার উদ্যোগ নেন তাকে কী স্বাগত জানানো হবে! নাকি বলা হবে, আইনটি সে সময় ছিল না। নতুন আইন পাস হওয়ার পর থেকে সেই কার্যকর হবে।

ভাল কথা। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। ইতিহাসের সংজ্ঞা অনেকে অনেকভাবে বলার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের কাছে ইতিহাস হচ্ছে শুধু তাদের সাফল্যগাঁথার অংশ! তাদের ইতিহাসে ব্যর্থতা বলে কিছু থাকে না। ভুল বলে কিছু থাকে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাস হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের সেতুবন্ধন। সেই ইতিহাস অনেকে ভুলে যাচ্ছেন।

মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলে সামনের দিকে এগিয়ে চলার আহ্বান জানাছেন। ভাল কথা। কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে অতীতকে ভুলে গেলে চলবে না। আবার আগামীর কথা না ভেবে উদ্দেশ্যহীন পথচলা আরো বিপজ্জনক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ ফোরামকে প্রায় এক করে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্র আর সরকারকেও গুলিয়ে ফেলার এক চেষ্টা। আইন পাস করেছেন আইন প্রণেতারা। কিন্তু যারা প্রয়োগ করবেন তারা কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তার আগে এই আইন প্রণেতাদের দিয়ে নিজেদের সুরক্ষা আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন। সাংবাদিকতার মত পেশাকে অনেকটা ‘গুপ্তচর’ বৃত্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে! অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করার পথটাকে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে চাইলে, তিনি সাংবাদিকদের চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করে নিজের দুর্নীতির তথ্য নথিপত্র দিয়ে সহায়তা করবেন, এরকম সত্য যুগের বাসিন্দা হয়ে গেছি আমার সবাই; এটা ভাবার কোন কারণ নেই!

আবার অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই তথ্য কমিশন সাংবাদিকদের সব তথ্য দিতে পারছে তাও নয়। তাদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়ার কথা ভুলে যান। এখনও জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ওয়েব সাইটে অসংখ্য অসত্য তথ্যে ভরা আছে। সেই অসত্য তথ্য তুলে ধরে এই ডিজিটাল আইনে মামলা করার দায়িত্ব নেবেন কে?

জাতীয় সংসদে যারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করলেন, তাদের কাছে খুব বিনীতভাবে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। ডিজিটাল বাংলাদেশে আপনাদের সম্পর্কেই বিভিন্ন সরকারি ওয়েব সাইটে সঠিক তথ্য নাই। তার কী হবে?

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ক’বার জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্য সেই তথ্যটাও ভুল ছিল সংসদের ওয়েব সাইটে! সাংবাদিক হিসেবে সেটা তাকে দেখানোর পর তিনি সংসদ সচিবালয়ে নিজে ফোন করে সঠিক তথ্য আপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই অবস্থা বেশিরভাগ সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দিন কয়েক আগে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখা গেলো একজন প্রতিমন্ত্রীর জাতীয়তা লেখা ছিল ভারতীয়! এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য সঠিক করতে যে মন্ত্রণালয় দায়িত্বশীলতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না; তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ বেশি করতে পারে। এই শঙ্কা মোটেও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বহির্বিশ্বে অপপ্রচার গণমাধ্যম না সামাজিক ফোরাম করছে বা করেছে সেটা স্পষ্ট করা উচিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যম আর ফেসবুকের মত সামাজিক ফোরামকে এক করে ফেলা হচ্ছে কী-না সেটা সরকারের পরিষ্কার করা উচিৎ। অনেক মন্ত্রী-এমপিও এখন ফেসবুকে নিজেদের প্রচার-প্রচারণা চালাছেন। সেটার সত্য-অসত্য আগামীতে বিবেচনা করবেন কারা? সেই ভবিষতের কথাও অগ্রিম ভেবে রাখা ভাল।

ক্ষমতার অভিমুখ ধরে রাজনীতির ভাষায় সব সময় কথা বলা যাবে; এমনটি যারা ভাবছেন, তাদের আরও একটা বিষয় ভেবে রাখা উচিৎ, গণতন্ত্রে ক্ষমতা সব সময় একমুখি নয়। তাই নিজেদের পাস করা আইন বাতিলের জন্য তাদেরই আবার সোচ্চার হতে না হয়। ফেসবুক থেকে

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত