প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্নের বাংলাদেশ

শাহানা ইসলাম : ঝরঝরে রোদ চারিধারে। পিচ ঢালা কালো রাস্তার উপর দিয়ে চলছে ব্যস্ত যানবাহন । কর্মমুখী মানুষ ছুটছে যার যার গন্তব্যে। ফুটপাতের ধারে পড়ে আছে শীর্ণ-ছেঁড়া কাপড় পরা ক’জন নারী-শিশু। ধুলোর মাঝেই ছোট্ট সংসার পাতানো । ক’টা হাঁড়ি , পুঁটলিÑযুবতী মায়ের কোলের শিশুটির কংকালসার শরীরটা দেখে ‘কেভিন কার্টারের’ ছবিতে দেখা সেই শিশুটির কথা মনে পড়ে গেল। ক্ষুধার্ত শিশুটির মৃত্যুর জন্য শকুনের অপেক্ষা; শিশুটি মারা গেলে শকুনটি তার মাংস খেতে পারবে।

স্বাধীনতার প্রায় কয়েক বছর পর আমার জম্ম। যুদ্ধ দেখিনি। স্বদেশী আন্দোলন দেখিনি। বাবার মুখে স্বদেশী আন্দোলনের কথা শুনেছি। একাত্তরের যুদ্ধের কথা শুনেছি। বাড়ির পাশের সাহাপাড়া নন্দী পাড়ার মা-বোনদের বোরকা পরিয়ে পাকিস্তানি আর্মি, দেশীয় রাজাকারদের চোখের আড়াল করে আত্মগোপন করে রাখার গল্প শুনেছি। শুনতে শুনতে কেঁদেছি। স্কুল জীবনে নীলিমা ইব্রাহিমের একাত্তরের বীরাঙ্গনা পড়ে কেঁদেছি। আর বার বার ভেবেছি, ইস্ ঐ সময় যদি আমার জম্ম হত? আমি যদি ঐ হায়ানাদের কবলে পড়তাম! উফ্ কি যন্ত্রণার! শ্রদ্ধায় বার বার মাথা নত করেছি একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের প্রতি। লাখো শহীদের প্রতি।

এই দেশ এখন স্বাধীন, আমি স্বাধীন দেশে জন্মেছি। বয়স বাড়তে বাড়তে, পথ চলতে চলতে মানুষের জীবন-জানালার অনেক কপাট খুলে যায়। চলার পথে মাঝে মাঝে থমকে যাই। যখন দেখি, ধুলোমাখা স্যাঁতস্যাঁতে কাপড়ে অবুঝ শিশুটিকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি, রোগা হাড্ডিসার শরীরের শিশুটিকে রাস্তায় পাথর ভাঙ্গতে দেখি, অন্তঃসত্ত্বা একজন মাকে যখন মাটির ভাঁড় মাথায় নিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরে হাঁটতে দেখিÑরেল লাইনে, বস্তিতে, ফুটপাতে, জরাজীর্ণ শরীরে যুবতী-তরুণী কন্যাদের অসহায় মলিন মুখটা দেখি…

দেশ স্বাধীন হল আমার জন্মের আগেই। পৃথিবীর আলো বাতাসের ঘ্রাণ অনুভব করতে পারার আগেই আমার জন্মদাতা বাবা আর গর্ভধারিণী মা হয়ত মনে করেছিলেন, তাদের সন্তানেরা একটা আলোকিত দেশ পাবে। যে দেশের অর্থনীতি হবে সেই মুঘল আমলের শায়েস্তা খানের আমলের মত! যখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত! সেই চৌদ্দ শতকের বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যেমন লিখেছেন, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে বাংলাতেই সবচেয়ে সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যেত!

দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগ, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ। অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে বাংলা আজ স্বাধীন। স্বাধীনতার চাতালে ঘেরা এই বাংলার বুকে যখন দেখি, এক পাশে উঁচু উঁচু অট্টালিকা আর তার নিচে পড়ে আছে ধুলোয় মাখা পীড়িত মানুষের শীর্ণ মুখশ্রীÑতখন ভাবি, স্বাধীনতার সুফল কি আসলেই পৌঁছেছে বাংলার ঘরে ঘরে?

চলতে চলতে খোলা মাঠের কাছে এসে মনটা জুড়িয়ে গেল সবুজের সতেজতায়। শরতের সুন্দর আকাশ, সাদা সাদা মেঘের ভেলার নিচে পাল তোলা নৌকার মত দুলছে নরম পালকের কাঁশফুল। যেন সাদা সাদা পাহাড়ের মেলা ডেকে বলছে ‘আমার বুকে এসো দু’হাত বাড়িয়ে, সুখের পালক মেলে আমি আছি দাঁড়িয়ে!’

বাতাসে ভাসছে সুরেলা পাখির সুকণ্ঠী সুর। মাঠের পর মাঠ। বিস্তৃর্ণ মাঠের ওপারে যেন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শরতের শুভ্র আকাশ ! সবুজ ধানের শীষ দুলছে দক্ষিণা বাতাসের তোড়ে। খোলা আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখলাম, পৃথিবীর আকাশে উৎক্ষেপণ হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১। আমি-আমরা সেই জাতির জনকের সোনার বাংলার সন্তান। শত প্রতিকূলতার ভিতর দিয়েও এগিয়ে চলছে আজকের এই বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখি, একদিন এই দেশে আবার আসবে সেই দিন, শরতের হাসির মত হাসবে নিপীড়িত প্রাণ। সুখের হাসিতে ভরবে সবার জীবনের ঝুলি! লেখক : শিক্ষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত