প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই পলায়ণপর ও এক পলাতকের গল্প

‍বিভুরঞ্জন সরকার: মঙ্গলবার সকালে ঘুম ভাঙলো অপরিচিত একটি নম্বরের ফোন কলে। আমি হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে হেড়ে গলায় একজন তেড়ে উঠলেন, খুব তো খাইদাই করলেন। আজ থেকে বন্দনা আরো বেশি হবে নিশ্চয়ই।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। বললাম, আপনি কে সেটা যেমন চিনতে পারলাম না, তেমনি কি বিষয়ে কথা বলছেন তাও বুঝতে পারছি না।

ওদিকে ভদ্রলোক যে হাসছেন সেটা টের পাই। তিনি বলেন, আমি একজন সংবাদপত্র পাঠক। আপনার লেখা পড়ি। আপনি ইদানীং একটু বেশি হাসিনা বন্দনা করেন। এটা ভালো লাগে না। গতরাতে (সোমবার) ঢাকা ক্লাবে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপপরিষদ এক বড় খানাপিনার আয়োজন করেছিল। আপনার মতো এত বড় হাসিনা-সুহৃদের ওই দাওয়াত থেকে বাদ পড়ার তো কথা নয়। ভালোমন্দ খেয়ে যখন এসেছেন, তখন আজ থেকে নিশ্চয়ই আরো দাওয়াত পাওয়ার আশায় আরো বেশি করে সরকারের প্রশংসা করবেন। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী আর বিএনপি ধরাশায়ী; ইত্যাদি লিখবেন!

আমি বিনয়ের সঙ্গেই বলি, ভাই আমি ঢাকা ক্লাবের দাওয়াত পাইনি, তাই যাওয়া বা খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

আওয়ামী লীগের প্রচার টিমে আপনি নেই? এটা তো ভাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এমনি এমনি এমন সার্ভিস দিচ্ছেন?

ভদ্রলোকের কথায় রাগ হয়। কিন্তু মজা করার জন্যই বলি, আমি ভাই ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা। দুই বাচ্চা খেয়ে লাফায়, তিন নম্বরটা না খেয়েই লাফায়। আমি খাওয়ার বা পাওয়ার জন্য লিখি না। আমি যা লিখি সেটা আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে লিখি। আমি দীর্ঘদিনের একটি শখ খালেদাবন্দনা করে একটা নিবন্ধ লেখার। কিন্তু তিনি আমাকে সে সুযোগ দিচ্ছেন না।

ভদ্রলোক আমার কথায় সম্ভবত খুশি হতে পারলেন না বললেন, বিএনপি বা খালেদা একটিও ভালো কাজ করেননি, আপনি তাই মনে করেন?

না, আমি তা মনে করি না। আমি বলি, তবে তিনি যে রাজনীতি করেন সেটা খারাপ।

ভদ্রলোক আমার ওপর ক্ষিপ্ত হবেন আশঙ্কায় আমি তার কঠিন জবাবের অপেক্ষায় থাকি। তিনি কোনো বিরূপ কথা না বলে আমার লেখা স্টাইলের প্রশংসা করেন। বলেন, আপনার সব মতের সঙ্গে একমত হতে পারি না তবে আপনার লেখা পড়তে ভালো লাগে।

নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে? আমারও লাগে। তাকে ধন্যবাদ দেই। তিনি বলেন, ভাই আমিও কোন দল করি না। তবে বিএনপির প্রতি একটু দুর্বলতা আছে।

এরপর তিনি যা বলেন তাতে আমার অবাক হওয়ার পালা। তিনি বলেন, আজ আপনি ‘দুই পলায়ণপর এবং এক পলাতকের গল্প’ হেডিং দিয়ে একটা লেখা লেখেন। আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।

আমি বুঝতে পারি না। আবার তাকে কোনো প্রশ্নও করি না। আমাকে চুপ থাকতে দেখে তিনি বলেন, ভাই বাংলাদেশের ভেতরে বসে দুইজন এবং লন্ডনে বসে একজন রাজনীতি নিয়ে যে ভয়ানক খেলা খেলতে যাচ্ছে, সেটা শুরুতেই ব্যর্থ করতে না পারলে আমাদের পস্তাতে হবে। ডক্টর কামাল হোসেন এবং ডাক্তার বদ. চৌধুরীকে আমি পলায়ণপর নেতা মনে করি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কামাল হোসেনের সামনে সুযোগ ছিল বড় নেতা হওয়ার, আওয়ামী লীগের হাল ধরার। তিনি তা করেননি, পারেননি। তিনি পালিয়ে বেড়িয়েছেন, সুবিধাবাদী ভূমিকা পালন করেছেন।

তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের সমর্থনে গজের প্রার্থী হয়েছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী। ওসমানীর শেষ নির্বাচনী জনসভায় কামাল হোসেনের ভাষণ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি আগের রাতে বিদেশ চলে যান। জনসভায় তার অনুপস্থিতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কারণ ওই নির্বাচনে ওসমানীর মূল শক্তি ছিল আওয়ামী লীগ। তখন থেকেই তাকে আমি পলায়ণপর নেতা বলি।

তিনি বলতে থাকেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ডাক্তার চৌধুরীরও সুযোগ ছিল বিএনপির কান্ডারী হওয়ার। পলায়ণপর মনোভাবের কারণেই তিনিও সেখানে ব্যর্থ হন। তাকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল বিএনপি। আবার অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে তাকে রাতের অন্ধকারে বঙ্গভবন থেকে তাড়িয়েও দিয়েছিল। দল গঠন করে চমক দিতে গিয়ে বিএনপির ধাওয়া খেয়ে রেললাইনে দৌড়ানোর পরই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়েছিল।

ভদ্রলোক বলতে থাকেন, বিএনপির বর্তমান কান্ডারি তারেক রহমান। তিনি আইনের ভাষায় একজন পলাতক ব্যক্তি। দ-প্রাপ্ত। সাহস থাকলে তিনি দেশে ফিরে আইনি মোকাবেলার চেষ্টা করতেন। সেটা করার সৎ সাহস তার নেই। তিনি লন্ডনে বসে কলকাঠি নাড়ছেন সরকার পতনের। আশা করছেন, সরকার পতনের পর তিনি রাজার বেশে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করবেন। কামাল, বদ. চৌধুরী কি মেনে নেবেন ‘পলাতক’ তারেক নেতৃত্ব? আবার দেশের মানুষ কি মেনে নেবেন দুই পলায়ণপর ও এক পলাতকের নেতৃত্ব?

আমি কিছু বলি না। মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে : যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে …

দৃষ্টি এড়ানো, পালিয়ে বেড়ানো নেতাদের ডাকে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঝড় ওঠার সম্ভাবনা যারা দেখছেন তাদের সঙ্গী হতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু পারছি না। ক্ষমো মোর এ দীনতা।

লেখক: গ্রুপ যুগ্ম -সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত