প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধামাধরা পুঁজিবাদের একাধিপত্য কাটাতে হবে

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে ধামাধরা পুঁজিবাদের একাধিপত্য কাটাতে হবে। গতকাল এক গবেষণার উদ্বোধনী কর্মশালায় দেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষকরা এমন মত পোষণ করেছেন।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় জানানো হয়, অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের সহযোগিতায় সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) তাদের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনের (ইডিআই) গবেষণা কর্মসূচির আওতায় ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশনাল ডায়াগনস্টিক টুল’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করতে যাচ্ছে। গবেষণাটির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ডায়াগনস্টিক টুলের একটি কাঠামো তৈরি করা হবে; যা নীতিনির্ধারকদের দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে এবং সেগুলো সংস্কারের জন্য উপযুক্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। তানজানিয়া ও বেনিনের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে।

উদ্বোধনী কর্মশালায় গতকাল দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মোট তিনটি অধিবেশনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অংশ নেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষকরা। প্রথম অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্য ও “বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট চ্যালেঞ্জেস-ব্যাকগ্রাউন্ড পেপার” শীর্ষক প্রেজেন্টেশন পেশ করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। অধিবেশনে ‘হোয়াই ইজ ইনস্টিটিউশনাল ডায়াগনস্টিক টুল ইম্পর্টেন্ট ফর ডেভেলপমেন্ট?’ শীর্ষক বিষয়ে উপস্থাপনা পেশ করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট ও প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ার ইমেরিটাস ড. ফ্রাসোঁয়া বুরগিনিয়োঁ। অধিবেশনটিতে গেস্ট অব অনার ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

দিনব্যাপী আলোচনায় আলোচকদের মধ্যে আরো ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের (সিডিইআর) নির্বাহী চেয়ারপারসন ড. রুশিদান ইসলাম রহমান ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ. কে. ইনামুল হক।

বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ কারণে সামগ্রিক উন্নয়নচিত্র এক রকম; আর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের চিত্র আরেক রকম। মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি— এসব সূচকে দেশ অনেক এগোচ্ছে। কিন্তু সুশাসন, জবাবদিহিতা ও সহজে ব্যবসা করার সূচকে পেছনে হাঁটছে। রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন বলা হলেও সেগুলো প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ের ঘাটতি এজন্য দায়ী। এর ফলে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সময়মতো শেষ হচ্ছে না।

বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ওপর আলোকপাতের সময় অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের জমিস্বল্পতার কথা সবারই জানা। যখন এর সঙ্গে জমির দুর্বল ব্যবস্থাপনা যোগ হয়, তখন বড় সমস্যা দেখা যায়। এ সমস্যা আরো তীব্র হয়, যখন শিল্পায়নের ধাপ পরিবর্তন হয়। ব্যবসায়ীরা ক্রনি ক্যাপিটালিজমের সমস্যাগুলো সম্পর্কে ভালো জানেন। ধারাবাহিকভাবে একটি শাসন ব্যবস্থা থাকলে ক্রনিদের একাধিপত্য বাড়ে। ধামাধরা পুঁজিবাদের ভিত্তিতেও শিল্পায়ন হয়। যেমন দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় বড় শিল্পায়ন হচ্ছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু সেই দেশেও যখন গণতন্ত্র এসেছে, তখন শিল্পপতিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বাংলাদেশে ধামাধরা পুঁজিবাদের আধিপত্য দূর করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে নিয়ম-কানুনের ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে পেশাদারিত্বে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, দক্ষতার অভাবে রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তিনি এফডিআই, কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় মনিটরিং জোরদারেরও সুপারিশ করেন তিনি।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে ঠিকই। কিন্তু জিডিপির হিসাবে এ দুটির তুলনায় গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা অনেক বেশি। কিন্তু রফতানি খাতে যেসব প্রণোদনা রয়েছে, গ্রামীণ উন্নয়নে সেসব প্রণোদনা নেই বা সেগুলোর বাস্তবায়ন নেই। অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সেগুলো সময়মতো শেষ হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তিনি সামাজিক পুঁজি গঠনের পরামর্শ দেন।

ড. সা’দত হুসাইন বলেন, দেশে সাংবিধানিক, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রীয়, বেসরকারি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা হলেও কেউই তা করছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে যার যে কাজ নয়, সে সেই কাজ করছে। এক কথায়, বাংলাদেশে সরকার ছাড়া আর কেউই স্বাধীন নয়। উন্নতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

কেএএস মুরশিদ বলেন, মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা এখন অনেক বেশি। এ কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা বেড়েছে। যার সুফল পাচ্ছে দেশ। তবে সরকারের কাজের গতি কম। দাতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন প্রকল্প যত দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, সরকারের অর্থায়নের প্রকল্প ততটা গতিশীল নয়। রুশিদান এন ইসলাম বলেন, উন্নয়ন হলেও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। এটি দুশ্চিন্তার বিষয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এর বড় কারণ।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ. কে. এনামুল হক বলেন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, টেলিযোগাযোগ কমিশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের সরাসরি জনগণের স্বার্থরক্ষায় কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব প্রতিষ্ঠান তা করছে না। এর অর্থ হচ্ছে, জনস্বার্থে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের কোনো ব্যবস্থা নেই।

ড. সেলিম রায়হান তার উপস্থাপনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর, বাণিজ্য কাঠামো, পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ, বাণিজ্যনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্র্য নিরসন, বৈষম্য বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা, রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা, ভঙ্গুর আর্থিক খাত, দুর্বল পুঁজিবাজার, উন্নয়ন রাজনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির বিষয়ে আলোকপাত করেন।

ভঙ্গুর আর্থিক খাত সম্পর্কে ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে নন-পারফর্মিং লোন ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে নন-পারফর্মিং লোনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের এ ধরনের ঋণের হার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নন-পারফর্মিং লোনের হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৩১, ১২ দশমিক ২, ৯ দশমিক ৯৮, ১০ দশমিক ৪৫, ১ দশমিক ৭, ৮ দশমিক ৪৩, ২ দশমিক ৫, ৩ দশমিক শূন্য ৭, ২ দশমিক ৫৬ ও ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, আর্থিক খাতে নন-পারফর্মিং লোন অনেক বেশি হারে বাড়ছে। শুধু নন-পারফর্মিং লোনই নয়, বরং গত কয়েক বছরে ব্যাংক কেলেঙ্কারিও বাড়ছে, যা আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতার কারণ। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের নন-পারফর্মিং লোন বেশি। উন্নয়নের জন্য পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো দুর্বল।
সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত