প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

উপ-কমিশনার সাত বছরেই ‘জমিদার’

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা কাস্টমসের সেগুনবাগিচা কার্যালয়ের উপ-কমিশনার জাহিদুল ইসলাম হাই। ২৯তম বিসিএসে ক্যাডার হয়ে ২০১১ সালে সহকারী কমিশনার (কাস্টমস) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ওই সময় থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ৭ বছরে তিনি অন্তত ২০০ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

জাহিদুলের সম্পদের তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদকের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কাস্টমসের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান বেতন স্কেল অনুযায়ী একজন উপ-কমিশনার বেতন হিসেবে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পান। এই টাকায় ঢাকা শহরে চলার পর খুব বেশি সঞ্চয় থাকার কথা নয়। সাত বছরের সঞ্চয় দিয়ে শত শত বিঘা জমি কিনে জমিদার হওয়া অসম্ভব।

পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলার ভাঙ্গুড়া বাজার গ্রামের প্রয়াত হাজি মো. রিয়াজুল ইসলামের ছেলে জাহিদুল ইসলাম। সহোদর মো.সাইফুল ইসলাম পাবনায় অবস্থিত দুদকের সমন্বিত কার্যালয়ে তার সম্পত্তি অর্জনে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

দুদকের পাবনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শহীদুল আলম সরকারের কাছে দেওয়া ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জাহিদুল ৭২টি দলিলে ২০০ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়, ‘…জাহিদুল ইসলাম (হাই) ২০১১ সালের ১ আগস্ট ২৯তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার (কাস্টমস)-এ যোগ দেন। গত ছয় বছরে বিভিন্ন দুর্নীতি করে এলাকাতে অনেক সম্পদের মালিক বনে গেছেন, যার বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। উক্ত মো. জাহিদুল ইসলাম হাই কাস্টমসের চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে পৈতৃক সম্পদ বলতে ১৫-১৬ বিঘা ভাইদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে পেয়েছিলেন। জাহিদুলের শ্বশুর মো. আলাউদ্দিন, যিনি এইচএসসি পাস একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। আর জাহিদুলের স্ত্রী সোহেলী পারভীন রুলি, যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এখন স্বামীগৃহে গৃহিণী বনে আছেন।’

‘মো. জাহিদুল ইসলাম তার নিজ মায়ের কাছ থেকে শরত নগর বাজারের (ভাঙ্গুড়া) ওপর একটা সাড়ে ১৮ শতাংশ জমির ওপর মার্কেট অন্য ভাই-বোনদের ফাঁকি দিয়ে নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। আর যার জন্য জাহিদুলের মা পরবর্তী সময়ে সহকারী জজ আদালত (ভাঙ্গুড়া) পাবনাতে একটি দলিল বাতিলের মামলা করেছিলেন, যার মামলা নম্বর- ২৮/২০১২। পরবর্তী সময়ে সে মা ও ভাইদেরকে হুমকি-ধমকি ও পুলিশি নির্যাতন করেন। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তির মালিক হওয়ার কারণে সে এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে ও পেশিশক্তির মাধ্যমে এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক মোড়লিপনার মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িত।’

কাস্টমস কর্মকর্তা জাহিদুলের বিরুদ্ধে সহোদরের এই অভিযোগের অনুলিপি দুদকের চেয়ারম্যান, দুদকের অনুসন্ধান বিভাগ, দুদকের পাবনা কার্যালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, একই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, পাবনার জেলা প্রশাসক (ডিসি), জেলার পুলিশ সুপার (এসপি), জেলা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) কার্যালয়সহ জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোতে পাঠানো হয়।

অভিযোগে সম্পত্তি ক্রয়ের হিসাব

জাহিদুল কাস্টমসে চাকরি পাওয়ার পর কোথায়, কী পরিমাণ জমি কিনেছেন, তার আংশিক হিসাব অভিযোগে দেওয়া হয়েছে। এগুলো দুর্নীতি করে কেনা হয় বলে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে থাকা তালিকা অনুযায়ী, কাস্টমসের এই কর্মকর্তা তার স্ত্রীর বড় ভাই রফিকুল ইসলাম মিঠুনের নামে পাবনার ভাঙ্গুড়ার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অধীনে বিভিন্ন সময়ে ২৮৩৩/১৭ নম্বর দলিলে ২১.৫ শতাংশ, ১১১৬/১৭ নম্বর দলিলে ২১৭ শতাংশ ও ২২৩৭/১৫ নম্বর দলিলে ৩৯ শতাংশ জমি কিনেছেন। এগুলোর বাজারমূল্য যথাক্রমে চার লাখ ৭৫ হাজার, ৮৫ লাখ ১৬ হাজার ও ছয় লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

তালিকা অনুযায়ী, জাহিদুল তার ভাগ্নে শাহিদুর রহমান সাগরের নামে একই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অধীনে ১৩০৬/১৭ দলিল নম্বরে ৯.১১ শতাংশ জমি কিনেছেন, যার বাজারমূল্য ১৮ লাখ ২২ হাজার টাকা। এ ছাড়া তিনি নিজের নামে বিভিন্ন সময়ে ভাঙ্গুড়ায় ৯.১১, ৭.০৭, ২০.৫০, ৪৬.৭৫, ২০.৫০, ১০৬, ২৩.০৫, ২.৫, ১২৪.৫, ৫, ৯২ ও ১০৯ শতাংশ জমি কিনেছেন। এগুলোর দলিল নম্বর যথাক্রমে ১১০৪/১৭, ১৫৩৭/১৭, ১৯৩৮/১৪, ১৫৫৩/১৪, ১১৯২/১৫, ৮৬/১৪, ৬৪৮/১৩, ১০৭৭/১৪, ১০৭৮/১৪, ২৪৩৫/১৭, ১৯৩১/১২ ও ২৫০৬/১২। এই জমিগুলোর মোট বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে এক কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

উল্লিখিত সম্পদের বাইরে কাস্টমস কর্মকর্তার আরও কিছু সম্পদের কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, পাবনার চাটমোহরের হরিপুরে সম্পত্তি আছে জাহিদুলের। তার নিয়ন্ত্রণে ভাঙ্গুড়ায় ইটের ভাটা ও মাছের খামার রয়েছে, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণে আছে আয়নাল শাহ ও শাহিন নামের দুজন।

পাবনার ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, গাজীপুর, রাজধানীর উত্তরা ও ঢাকার সাভারে জাহিদুলের সম্পত্তি আছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া তিনি পাবনার ভাঙ্গুড়ায় প্রায় ৪০ বিঘা জমি কিনেছেন বলে এতে বলা হয়।

অনুসন্ধানে কী পেল দুদক

জাহিদুলের সম্পত্তির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই কর্মকর্তাকে সম্প্রতি কাস্টমস সার্কেল-৯ (উত্তরা অঞ্চল) থেকে সরিয়ে সেগুনবাগিচা কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

দুদকের কর্মকর্তা জানান, সহোদরের অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমে দুদক কমপক্ষে ২০০ বিঘা জমি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এ নিয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে। সেই তদন্তে কাস্টমসের এই কর্মকর্তার প্রকৃত জমির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, জাহিদুল বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির সুযোগ করে দিয়েছেন। এর বিনিময়ে এই শিল্পগোষ্ঠীগুলো তাকে টাকা দিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় সম্পত্তি কিনেছেন। এমন দুটি বড় শিল্পগোষ্ঠীকে সম্প্রতি তলব করে দুদক।

অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, শৈশবের বন্ধু আশা ও ভাগ্নে রিয়াদ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষে আয়করের ফাইল কাস্টমসের উপ-কমিশনার জাহিদুল ইসলাম হাইয়ের কাছে আনা-নেওয়া করে থাকেন। জাহিদুলের পক্ষে তারাই ঘুষ গ্রহণ করেন। বন্ধু আশা বর্তমানে জাহিদুলের পক্ষ থেকে গাজীপুরে একটি চায়নিজ কোম্পানির কর ফাঁকির ফাইল দেখভালের কাজ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশা নিজেকে আকাশ বলে পরিচয় দেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, কাস্টমসে চাকরি পাওয়ার সময় জাহিদুলের ব্যাংক হিসাবে ছিল মাত্র ১১ হাজার টাকা। কিন্তু সেই ব্যক্তিই সাত বছরের ব্যবধানে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন।

সংশ্লিষ্ট ও জাহিদুলের ভাষ্য

পাবনা প্রেসক্লাবের একাধিক নেতা প্রিয়.কমকে জানান, কাস্টমসের উপ-কমিশনার জাহিদুলের মাধ্যমে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন তার ভাই-বোনসহ প্রতিবেশীরা। তারা বিভিন্ন অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে প্রেসক্লাবে যান।

প্রেসক্লাবের নেতারা জানান, ৭০টি দলিলে জাহিদুলের জমি কেনার প্রমাণ তারাও পেয়েছেন।

জাহিদুলের ভাই সাইফুল বলেন, উপযুক্ত মূল্য পেয়েই ভাইয়ের কাছে তারা জমি বিক্রি করেছেন। ঘুষের টাকা সাদা করতে এবং রাজস্ব না দিতে জমি কিনতে বাধ্য করেছেন জাহিদুল।

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল করা হলে কাস্টমসের উপ-কমিশনার জাহিদুলবলেন, ‘আমার ফোন নম্বর কোথায় পেয়েছেন? কে দিয়েছে? আগে তার নাম বলেন। তারপর কথা বলব।’ কথাগুলো বলেই জাহিদুল ফোন কেটে দেন।-প্রিয়.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত