প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

দেশবাসী তো তা-ই চায়

মহিউদ্দিন খান মোহন : পুলিশ একটি রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ। জনসম্পৃক্ত এ বেসামরিক বাহিনীটির ওপর দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব অর্পিত। সাধারণত পুলিশকে জনগণের বন্ধু বলা হয়ে থাকে। মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। ফলে, সমাজে পুলিশের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু এখন পুলিশ ওপর জনগণের অস্থার জায়গাটি আগের মতো নেই। সহজে এখন কেউ থানা-পুলিশের দ্বারে যেতে চায় না। বলা যায়, পুলিশ সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের মনে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য বাইরের কেউ দায়ি নয়। দায়ি পুলিশেরই কিছু সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।

যদি প্রশ্ন করা হয়, পুলিশের প্রতি আমাদের দেশের মানুষের আস্থা কতটুকু আছে? সন্তোষজনক জবাব পাবার সম্ভাবন নেই। কেননা, জনগণ এখন পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ, অপরাধ দমন যাদের প্রধান কাজ, তাদেরই একটি অংশ এখন অপরাধকর্মে লিপ্ত। আগে গ্রামাঞ্চলে কোনো ছিঁচকে বা সিঁদেল চুরির ঘটনা ঘটলেও মানুষ থানায় ছুটে যেত এজাহার লেখাতে। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাতে চোরাই মাল ফেরত পাওয় যাক বা না যাক, পুলিশ তৎপর হবে এবং ভবিষ্যতে তেমন ঘটনা আর নাও ঘটতে পারে। আর এখন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির শিকার হলেও কেউ সহজে পুলিশের কাছে যেতে চান না। তাদের ধারনা এতে লাভ নেই, বরং নতুন ঝামেলা হতে পারে। বলা যায়, মানুষ এখন পুলিশকে এড়িয়েই চলতে চায়। কারণ, তারা দেখছে, চোখের সামনে ছিনতাই হচ্ছে, অপহরণ হচ্ছে, খুন হচ্ছে, কিন্তু পুলিশ নির্বিকার থাকছে। অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মানুষ এখন পুলিশের ওপর আস্থাা রাখতে পারছে না।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের একটি ঘটনা। কয়েক হাজার টাকা ভর্তি মানিব্যাগ ফেলে যাত্রী নেমে গেছে। রিকশাওয়ালা ওটা হাতে নিয়ে খুলে দেখল অনেক টাকা। সে কিংকর্তব্য বিমূঢ়। কী করবে ভাবছে। প্রথমে ভাবল থানায় যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল- ওখানে গিয়ে লাভ নেই। নিজেই ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে। এমনও হতে পারে বেশি টাকা লুকিয়ে রেখে বাকিটা থানায় জমা দিতে যাওয়ার অভিযোগে হাজতও খাটতে হতে পারে। রিকশাওয়ালা চলে গেল দৈনিক ইত্তেফাক অফিসে। সেখানে গিয়ে সে সাংবাদিকদের জানালো ঘটনা। তারা জিজ্ঞেস করলেন, থানায় গেলে না কেন? জবাবে রিকশাওয়ালা পুলিশের ওপর তার আস্থাা না থাকার কথা জানিয়ে বলেছিল- আমি চাই টাকাটা যিনি মালিক তিনি যেন ফেরত পান। আপনারা পত্রিকায় খবরটা ছাপেন, মালিক চলে আসবে। থানায় গেলে এ টাকা মালিক পাবে না। খবরটি ইত্তেফাকে প্রকাশের পর হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। একজন দরিদ্র রিকশাওয়ালা সততা আর পুলিশের প্রতি তার আস্থাাহীনতা নিয়ে বেশ আলোচনা চলেছিল।

প্রায় ত্রিশ বছর আগেই যখন এ অবস্থা ছিল, এখন তাহলে অবস্থাা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলার প্রয়োজন পড়ে না। এক সময় পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা ভালোই ছিল এটা ঠিক। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে নানা কারণে সে আস্থাায় সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের ফাটল। পুলিশের প্রতি জনগণের সে হারানো আস্থা কি ফিরে এসেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো বলবেন- কেন, এরই মধ্যে এমন কি কাজ পুলিশ করলো যে আস্থাা ফিরে আসবে?

কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাা বিশ্বাস ফিরে এসেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সর মাধমে রংপুর ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটের উদ্বোধনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্যের উল্লেখ করেন। অস্বীকার করা যাবেনা, জঙ্গী তৎপরতা দমনে পুলিশ অনেকটাই সফলকাম হয়েছে। কিন্তু পাশপাশি তাদের কিছু কর্মকা- জনমনেসযে প্রচ- ক্ষোভেরও সৃষ্টি করেছে সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে কিছু পুলিশ সদস্যের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়া এবং বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের অতিমাত্রায় খড়গহস্ত হয়ে ওঠা । আবস্থাাটা এমন যে, এদেরকে এখন ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে, আর বেঁধে আনতে বললে মারতে মারতে আনে। সম্প্রতি মৃত ও বিদেশে অবস্থাানকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ককটেল নিক্ষেপ করাসহ সন্ত্রাসী কর্মকা-ের অভিযোগ এনে পুলিশের মামলা দায়েরের ঘটনা দেশবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে।

পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসুক এটা সমাজের শান্তিপ্রিয় প্রতিটি মানুষ চায়। কেননা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীটির প্রতি মানুষের আস্থাা না থাকলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরমে উঠতে পারে। আর আস্থাার বিষয়টি মৌখিক স্বীকৃতিতে নয়, প্রমাণিত হয় বিদ্যমান সামজিক পরিবেশের বিচারে। যেহেতু দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাা ফিরে এসেছে, তাই অন্তত তার কথার মর্যাদা রেখে পুলিশ বিতর্কিত কাজ থেকে বিরত থাকবে- এটাই মানুষের বিশ্বাস।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত