প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির তিন কৌশল

ডেস্ক রিপোর্ট : সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একাদশ জাতীয় নির্বাচন, রাজনীতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি আদায় এবং দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে শেষ মুহূর্তে এসে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এ লক্ষ্যে তিনটি কৌশলকে প্রাধান্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে দলটি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজপথের আন্দোলন জোরদার করা, দেশে-বিদেশে ব্যাপক ক‚টনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং সমমনা অন্য দলগুলোকে নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্যের’ ওপরই বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। দলটির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস পাওয়া গেছে। নেতারা জানিয়েছেন, এই তিন কৌশলে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে সরকারকে সংলাপ ও সমঝোতায় আসতে বাধ্য করা সম্ভব বলে তারা আশাবাদী।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আগামী নির্বাচন- এই দুই এজেন্ডাকে গুরুত্ব দিয়েই আগামী ৩ মাসের ছক তৈরি করেছেন দলটির নেতারা। সরকারের ওপর জনমত ও আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফরম। ক‚টনৈতিক মহলের পাশাপাশি তৎপরতা চালানো হচ্ছে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের মধ্যেও। অক্টোবর মাসকে টার্গেট করেই জোরদার আন্দোলনে মাঠে নামবে তারা। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গত শনিবার নাগরিক সমাবেশের একই মঞ্চ যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে হাতে হাত রেখে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার যে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন তা যে কোনো মূল্যে সফল করতে চায় বিএনপি। সব কিছুই পরিচালিত হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর দিয়ে। লক্ষ্য হাসিলে টিম গঠনের মাধ্যমে নেতাদের দেয়া হবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব। এ ব্যাপারে একটি নীতিগত অবস্থানে পৌঁছাতে গত তিন দিন ধরেই গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে ‘ম্যারাথন’ বৈঠক করছেন সিনিয়র নেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে ক‚টনৈতিক তৎপরতা আশার আলো দেখাচ্ছে বিএনপিকে। বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ক‚টনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে চায় দলটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারবিরোধীদের তৎপরতা এখন আরো বাড়বে বলে আশা তাদের। কারণ ভোটের মাঠে ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ জোট নেতারা বড় নিয়ামক না হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের একটা পরিচিতি আছে। তা ছাড়া সম্প্রতি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ক‚টনৈতিক শিষ্টাচার মেনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে বহির্বিশে^র প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া ভারতকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে কাছাকাছি সময়ে আবারো ভারত সফর করবে বিএনপির একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি সহযোগিতা পেতে গত এক বছর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন তারা। বিএনপির ক‚টনৈতিক সংশ্লিষ্ট নেতাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৌড়ঝাঁপ, লবিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নানামুখী তৎপরতা চালিয়েছেন। এর ফল হিসেবেই গত ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরই মধ্যে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংস্থাটির রাজনীতি বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মির¯øাভ জেনকি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার পাশাপাশি ১৮টি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

সব বৈঠকেই আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে বাংলাদেশের সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণে পদক্ষেপ আশা করেন বিএনপি মহাসচিব। পাশাপাশি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি জটিলতা, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া, নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের তৎপরতা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘গায়েবি মামলা’, গুম, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন ফখরুল।

আসন্ন নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ ও বিশ^াসযোগ্য হয় সে বিষয়ে সহযোগিতার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে বিএনপি। জবাবে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে সহযোগিতার মৌখিক আশ^াসও পেয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষ দিনে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় তারা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যই তাদের বক্তব্য। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময় করেন ফখরুল। বৈঠকে উপস্থিত দলের এক নেতা বলেন, খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। অক্টোবরে বিএনপি নেতারা স্টেট ডিপার্টমেন্টে আবারো ফলোআপ বৈঠক করতে পারেন।

বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে ফের সংকট তৈরি হতে পাওে, এমন আশঙ্কায় রয়েছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। আঞ্চলিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা চিন্তা করে ওই সব দেশের ভূমিকা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও অন্তরালে সবাই সক্রিয়। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে জাতিসংঘ উদ্যোগ নিয়ে সফল না হওয়ায় এবার আরো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে থাকাকালীন অবস্থাতেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তাকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে যেমন বিশেষ দূত পাঠিয়েছিল, এবারো দূত পাঠাতে পারে।

অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে আর হেলায় সময় নষ্ট করতে চান না বিএনপির নেতারা। দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলনে নামার প্রশ্নে সব মতবিরোধ ভুলে বিএনপি নেতারা এখন ঐক্যবদ্ধ। তাই নির্বাচন ও আন্দোলনের দ্বিমুখী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। নেতাদের মতে, নির্বাচনের আগে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণের ‘সিমপ্যাথি’ কাজে লাগানোর সময় আসছে। এ অবস্থায় মোক্ষম সময় বুঝে রাজপথে নামতে পারলে সাধারণ জনগণও স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে সেখানে শামিল হবে। তখন বহির্বিশে^র পক্ষ থেকেও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হবে। এ ছাড়াও দলটির নেতাদের বিশ^াস, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে সরকারের প্রতি প্রশাসনের সমর্থনে কিছুটা হলেও আলগা হবে। আর সেই মোক্ষম সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে ভুল করবে না বিএনপি। পাশাপাশি ভোটের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। সেই লক্ষ্যে কমিটি পুনর্গঠন, যোগ্য প্রার্থী তালিকা ও ইশতেহার তৈরির কাজও এগিয়ে রাখছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

সূত্র জানায়, মূলত পাঁচটি দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে বিএনপি- ভোটের আগে দলীয় চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। তবে দাবি আদায়ে বেশ সতর্কতার সঙ্গে ৩টি ধাপে নরম থেকে গরম কর্মসূচিতে যাবে দলটি। প্রথমে ছোট ছোট কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজপথে সক্রিয় হতে চান তারা। এ ধরনের কিছু কর্মসূচি এরই মধ্যে পালনও করেছে দলটি। ধাপে ধাপে আন্দোলনের ধরন পরিবর্তন হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে রাজপথে বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ, দ্বিতীয় ধাপে দেশব্যাপী হরতাল অবরোধ ও তৃতীয় ধাপে কারাগার ঘেরাও কর্মসূচি ও চতুর্থ ধাপে দেশ অচলের পরিকল্পনা দলটির। তবে প্রথমে অবশ্যই অহিংস আন্দোলনরে পরিকল্পনা তাদের। সরকারের মনোভাব বুঝে চলমান কর্মসূচির ধরন পাল্টে যেতে পারে হুট-হাট। জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার আগে ও পরের সময়টিতে হরতাল-অবরোধ দিয়ে সরকারকে কঠোর চাপে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই মুহূর্তে জোরদার আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। তবে এখনো সময় আছে, আশা করছি সরকার সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে। অন্যথায় ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে সব দলকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে।

অন্যদিকে যে কোনো মূল্যে নির্বাচনী ঐক্য গড়তে গণফোরামের সভাপতি ড. কামালের নেতৃত্বে বৃহত্তর ঐক্যের পথে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে বিএনপি। গত শনিবার রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে হাতে হাত রেখে এ অঙ্গীকার করেন অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চেšধুরী, ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ঐক্য প্রক্রিয়ায় একমত হওয়া নেতারা। এই অঙ্গীকার ধরে রেখে বৃহত্তর এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে আরো দৃঢ়ভাবে আন্দোলন ও নির্বাচনের ঐক্যে রূপ দিতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে ১ অক্টোবর থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। সারা দেশে নেতাকর্মীদের কাছে ইতোমধ্যে সেই বার্তাও পৌঁছে দেয়া হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিএনপি বহুদিন ধরেই বলে আসছে জাতীয় ঐক্য ছাড়া সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এখন ঐক্যের মাধ্যমে একটি নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। আশা করছি আগামীতে দাবি আদায়ে আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করব। বিএনপির পক্ষ থেকে জোটকে আন্দোলন ও নির্বাচনী ঐক্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে সব ধরনের চেষ্টা থাকবে। সূত্র : ভেরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত