প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিচারপতি সিনহার বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’
দু’বার বয়সের আগেই জজ হওয়ার প্রস্তাব ছিল

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ৬০০ পৃষ্টার সদ্য প্রকাশিত ইংরেজি ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’, অর্থাৎ ‘স্বপ্নভঙ্গ: আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় ‘স্ট্রাগল ফর সারভাইবাল’ বা জীবন সংগ্রামে যা বর্ণিত, তারই চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

স্বাধীনতাযুদ্ধের পরই দ্বিতীয় শ্রেণীতে উচ্চতর নম্বর পেয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করি। বাবা আমাকে পুরোপুরি ত্যাগ করে বললেন আইন পেশায় গেলে যেন তার পরিচয় না দেই। সিলেটে আমার থাকার কোনো জায়গা ছিল না, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অনিশ্চয়তাপূর্ণ, পারিবারিক পৃষ্টপোষকতা ছাড়া আইন পেশায় এগিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব এবং ভাল আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে তদ্রুপ চেম্বারে যুক্ত হওয়াটা ছিল জরুরি, আমার কোনোটাই ছিল না। আমার সব বন্ধুরা জীবিকার তাড়নায় নিজ এলাকার বারে যুক্ত হলেন, আমি ভাল আইনজীবি হয়ে ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে প্র্যাকটিস করবো সে আশায় সিলেটে থেকে গেলাম। ছাত্র হিসেবে কয়েকজন আইনজীবির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছিল মাত্র। তবু ইচ্ছা ছিল ভাল আইনজীবির চেম্বারে যোগ দিয়ে এটাই প্রমাণ করা যে, ‘ল’ইয়ার্স আর নট লায়ার্স’, অর্থাৎ আইনজীবিরা মিথ্যাবাদী নন। শেষটায় নিজের সিলেট ল’কলেজের শিক্ষক এবং প্রতীথযশা ফৌজদারী কোর্টের আইনজীবি সোলেমান রাজা চৌধুরীর চেম্বারে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেই। সেখানে কিছু মক্কেলসহ পরিচয় ঘটলো তার জুনিয়র মুনিরউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। চৌধুরী জানতে চাইলেন আমার উদ্দেশ্য। আমি অতি বিনয়ে নিজের ইচ্ছাটি প্রকাশ করলাম এবং দ্বিধাহীন চিত্তে বললাম আমি বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি সম্প্রদায়ভুক্ত; যারা শিক্ষকতা ও চাষাবাদের মতো সরল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এবং দেশের মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের তুলনায় দরিদ্র। এসব শুনে চৌধুরী আমাকে রাখতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন এবং অন্য সিনিয়রদের কাছে যেতে বললেন। হতবাক হয়ে বসে রইলাম। এমন সময় পরিচারক এসে মুনিরউদ্দীন ও তাকে ড্রয়িং রুমে চা-নাস্তার জন্য নিয়ে গেল। আমি ছাত্র হয়েও তা থেকে বঞ্চিত হলাম। আমি অপমানিত বোধ করলেও প্রকাশ করিনি, বরং পরদিন থেকে নিয়মিত তার চেম্বারে হাজিরা দিতে লাগলাম। না চৌধুরী ভ্রুক্ষেপ করলেন, না মুনিরউদ্দীন কথা বললেন।

আমি একটি চেয়ার নিয়ে মুনিরউদ্দীনের পাশে বসা শুরু করলাম। মাস পেরিয়ে মাস যাচ্ছিল, আর মক্কেলের ভিড় জমলে সরাসরি পেছনের বেঞ্চে বসতে বলা হত; মক্কেলরা তা দেখতো। আমি একাগ্র ছিলাম, কেননা আমার হাতের লেখা এবং ডিকটেশন নেবার ক্ষেত্রে মুনিরউদ্দীনের চেয়ে ভালো করার আত্মবিশ্বাসটি প্রবল ছিল। এভাবে এক ঝড়ো সন্ধ্যায় আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। সেদিন মুনিরউদ্দীন আসেননি, আমি এক প্রকার বৃষ্টি¯œাত হয়েই চেম্বারে গিয়েছিলাম, মক্কেলও এসেছিল। আমাকে ডিকটেশনের জন্য বলতেই রাজি হয়ে গেলাম। আমার হাতের লেখা ও ইংরেজি ডিকটেশন নেবার সক্ষমতা দেখে তিনি অভিভূত হলেন। দ্বিতীয় দিনের মতো সেদিনই আমার সঙ্গে কথা বললেন এবং চা-নাস্তা খাওয়ালেন। …দুই মাসে ১০০ টাকা পেতাম। এমন সাধাসিধে জীবন নির্বাহের মাঝে এক সময় ঢাকায় বার পরীক্ষার জন্য ৫০০ টাকা চাইতে প্রশ্নবিহীন তিনি তা দিলেন।

১৯৭৭ সালের শেষদিকে আমি উপলব্ধি করলাম বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে যেতে না পারলে আমার বড় আইনজীবি হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। এ সময় আমি তৎকালীন বাংলাদেশের সেরা আইনজীবি সবিতা রঞ্জন পাল (এস আর পাল)-এর সঙ্গে একটা ভাল সম্পর্ক গড়েছি। সেটা আমাকে অনেকদূর এগিয়ে দেয়। … এভাবেই আমি ব্যতিক্রমী হলাম। আমি সিনিয়র আইনজীবি সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, আশরারুল হোসেন, বি এন চৌধুরী, হামিদুল হক চৌধুরী, আবদুল মালেক, জুলমত আলী খান, এম এইচ খন্দকার, খন্দকার মাহবুবউদ্দীন আহমেদ, টি এইচ খান, এমনকী এস আর পালেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হলাম। … আমার সততা, অধ্যবসায় এবং পালের সঙ্গে সম্পর্ক আমাকে আইন পেশায় বিশ্বস্তজন হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এছাড়াও আইন ও আইনের দর্শনের প্রতি আমার মনোনিবেশ এবং ব্যবচ্ছেদীয় ও আইনগত বাদানুবাদসহ অপ্রতিরোধ্য সক্ষমতা আমাকে আইন পেশায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে উপনীত করে।

ই-মেইল : [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত