প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বেদেপল্লীর বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ

ডেস্ক রিপোর্ট: পিচঢালা পথের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু বেদেপল্লীতে প্রবেশের রাস্তা। এক কিলোমিটারের জলকাদার এই সরু সড়কে প্রবেশের পর দেখা মেলে পোড়া ঘরের ক্ষতচিহ্নের। যেতে যেতে পথের ধারে যে কয়েকটি ঘর দেখা যায়, তার অধিকাংশই তালবদ্ধ। বেদেপল্লী জুড়ে নিস্তব্ধতা। প্রতিদিনকার কর্মব্যস্ততার ছবিতে আচমকাই কেউ যেন ঢেলে দিয়েছে বিষণ্ণতার একরাশ কালি। তালাবদ্ধ কুটির, শূন্য রসুইঘর আর ভারাক্রান্ত উঠোনে এখনও লেগে আছে দুই সপ্তাহ আগের দুঃস্বপ্নের টাটকা স্মৃতি।

গত ১০ সেপ্টেম্বর। আচমকাই সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠে এসেছিল নোয়াখালীর পূর্ব এওয়াজবালিয়া গ্রামের বেদেপল্লী। শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই অন্য আবাস। প্রভাবশালীদের আক্রমণে জ্বলে ওঠে গোটা পল্লী। পৈশাচিক আক্রমণের কবলে পড়ে এক লহমায় নিঃশেষ হয়ে যায় অধিকাংশ পরিবার। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে নিজেদের কেনা জমিতে গড়ে তোলা কষ্টের বসতঘর। কেটে তছনছ করা হয় সবকিছু। ঘরের সব আসবাব লুটে নেওয়া হয়। বাদ যায়নি বেদেদের উপার্জনের অবলম্বন সাপও পুড়িয়ে হত্যা করা হয় দেড় শতাধিক। দুই সপ্তাহ কেটে গেছে এরই মধ্যে।

গোটা বেদেপল্লীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে আছে একরাশ হাহাকার। যে পল্লী থেকে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে দলে দলে নারী-পুরুষ বের হতেন, সেখানে এখন উড়ছে ধ্বংসের পোড়া ছাই। হামলার পর মামলার ভয়ে গোটা পল্লী প্রায় মানবশূন্য। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে প্রশাসনের তরফ থেকে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অর্থ, চাল আর টিন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বেশ কিছু গৃহহীন খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটাচ্ছে এখনও।

চোখ বাড়াতেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত সারি সারি ঘর, বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ আর আতঙ্ক ও ভয় যেন পরাধীনতার শেকলে বেঁধে ফেলেছে পুরো পল্লীকে। সেই বন্ধ শিকল ছিঁড়ে চেনা ছন্দ আর চেনা মুক্তির আশায় দিন গুনছেন বেদেপল্লীর বাসিন্দারা।

বেদেপল্লীর তাজেনা বেগম বলেন, ‘ঘটনার দিন আমার ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। বৃদ্ধ পঙ্গু স্বামী তখনও ঘরে। আমার আহাজারি কারও কানে গেল না। একপর্যায়ে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে কোলে তুলে আগুন থেকে রক্ষা করি। আমার ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হলো, সব শেষ করে দেওয়া হলো। এখন আমি কীভাবে চলব? খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। কাজে বের হতে পারছি না ভয়ে।’

ঘরের পাশেই একটি টিউবওয়েল দেখিয়ে মোক্তার আলম নামে এক বেদে বলেন, ‘ঘরে আগুন দিয়েই স্থানীয় প্রভাবশালীরা ক্ষান্ত হননি, দেখে দেখে সব টিউবওয়েলে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।’

মলিনমুখের কিছু শিশুকে দেখিয়ে আমেনা খাতুন নামে একজন বলেন, ‘বেদে পেশায় থেকেও বাচ্চাগুলোকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছি। হামলার পর থেকে তারা স্কুল-মাদ্রসায় যেতে পারছে না। পল্লী থেকে বের হলেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা শিশুদের ভয় দেখায়। শুধু শিশু নয়, জীবিকার সন্ধানে কেউই পল্লী থেকে বের হতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘এই পল্লীতে সাড়ে চার হাজার মানুষ ছিল। পিঁপড়ার মতো মানুষ দেখা যেত, শিশুদের ছোটাছুটি ছিল, ছিল রান্নাবান্নার আয়োজন। এখন কিছুই নেই। প্রতিদিন প্রভাবশালীদের হুমকিতে পল্লী ছেড়ে চলে যাচ্ছে বেদেরা।’

আজানের শব্দ ভেসে আসে পাশের এক মসজিদ থেকে। স্থানীয় মসজিদে নামাজ পড়তে না দেওয়ায় ২০১৩ সালে পল্লীতেই চাঁদা তুলে মসজিদটি নির্মাণ করে বেদেরা। মসজিদের ইমাম আব্দুল হক বলেন, ‘এখানে বসবাসরত বেদেরা বেশ শান্তিপ্রিয়। কখনই খারাপ কর্মকাণ্ড দেখিনি তাদের। মাদক বিক্রির যে অভিযোগ তুলে বেদেপল্লীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, সেই অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।’

নামাজ পড়ে বের হয়ে আসা কয়েকজন মুসল্লি বলেন, গণমাধ্যম আমাদের অভিযোগ-অনুযোগ লিখলেও তেমন কিছুই হচ্ছে না। উল্টো প্রশাসন ও স্থানীয়রা আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পল্লীর দশ একর জায়গা দখলের চেষ্টা করছে।

বেদেদের নির্যাতনে তারেক আজিজ নামে যে স্থানীয় কিশোরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো হয়, সেই তারেক আজিজকে নিয়েও বেদেপল্লীর বাসিন্দাদের নানা অভিযোগ। মো. আলমগীর হোসেন নামে এক বেদে বলেন, ‘তারেক আজিজ বেদেপল্লীতে বসেই মাদক সেবন করত। সব সময় একটি ছুরি থাকত তার কোমরে। বেদেপল্লীর মেয়েদের সব সময় উত্ত্যক্ত করত সে। ঘটনার দিন এক মেয়েকে উত্ত্যক্তের জেরেই ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে চা দোকানের তেলের কড়াই থেকে তার গায়ে সামান্য তেল পড়ে। পরে গুজন রটানো হয় সে মারা গেছে।’ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানোর খবরও অসত্য জানিয়ে আলমীগর হোসেন বলেন, ‘ঘটনার এক সপ্তাহ পর থেকেই তারেক আজিজ এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। একটি ইস্যু তৈরি করে জমি দখলের জন্যই মূলত হামলা চালানো হয়েছে।’

হামলার ঘটনায় সুধারাম থানায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। দগ্ধ যুবক তারেক আজিজের বাবা ও বেদে সর্দার জাকির হোসেন পৃথক দুটি মামলা করেছেন। বেদেদের মামলায় পুলিশ পাঁচজনকে আটক করলেও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তারা। আর তারেক আজিজের বাবার মামলায় পাঁচ বেদেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তারা জেলহাজতে।

যুবলীগ নেতা হেলাল ও ইউপি সদস্য আমিনকে বেদেরা বরাবরই দায়ী করলেও মামলার আসামি করা হয়নি তাদের। উল্টো পুলিশ হামলাকারী দুই নেতার পরামর্শ অনুযায়ী মামলায় আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার দেওয়া তালিকা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা আমিন মেম্বার ও হেলালের নাম বাদ দিয়ে কয়েকজনের নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন মামলার এজাহারে আরও যাদের নাম দেখা যাচ্ছে, তাদের আমি চিনি না।’

বেদেপল্লীর সর্দার কামাল ও মিঠু বলেন, দশ একর জমি দখলের উদ্দেশ্যে বেদেপল্লীতে বারবার হামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা আমিন মেম্বার ও হেলালের নেতৃত্বে হামলা হয়েছে এবার। ২০১৬ সালেও এই দুই নেতা হামলায় জড়িত ছিলেন। ওই সময় সব মিডিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। ওই সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও আট বছরেও আলোর মুখ দেখেনি তা। এবারের হামলার পরও অতিরিক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামাল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন ও এলাকাবাসীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে।

জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস জানান, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তা বের করার জন্য গত ১১ সেপ্টেম্বর অতিরিক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আজ রোববার তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসবে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পেশ করা হবে। সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত