প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বঞ্চনার শেষ নেই শিক্ষা ক্যাডারে

ডেস্ক রিপোর্ট: মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ১৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা। তার অধীনে উপাধ্যক্ষ বশীর আহমেদ সপ্তম বিসিএসের কর্মকর্তা। শুধু এই কলেজই নয়; এমন চিত্র বেশিরভাগ সরকারি কলেজের। জুনিয়রদের অধীনে কাজ করছেন সিনিয়ররা। মূল কারণ, বিসিএসের বাকি ২৭টি ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয়। মাত্র এই একটি ক্যাডারে পদোন্নতি দেওয়া হয় বিষয়ভিত্তিক। অদ্ভুত এই নিয়মের কারণে হরদম জ্যেষ্ঠদের ‘এসিআর’ লিখছেন কনিষ্ঠরা। এমন নানা কারণে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে বঞ্চনার শেষ নেই।

সিভিল সার্ভিসের অন্যতম বড় ক্যাডার শিক্ষা। এই ক্যাডারে ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করেও সর্বোচ্চ পদ ‘অধ্যাপক’ হতে পারেন না অনেকে। সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকেই তাদের চলে যেতে হয় অবসরে। ২৮টি ক্যাডারের মধ্যে শুরু থেকেই সর্বাধিক বঞ্চিত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

এ ক্যাডারের কর্মকর্তারা মূলত সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। এর বাইরে শিক্ষা বোর্ড, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রকল্পে তারা প্রেষণেও কাজ করেন। এই ক্যাডারে মোট পদ ১৭ সহস্রাধিক। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সারাদেশের ৩৩০টি সরকারি কলেজে ১৪ হাজার কর্মকর্তা কর্মরত। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার পদ শূন্য থাকায় কর্মকর্তাদের দিতে হয় বাড়তি শ্রম।

এই ক্যাডারের কর্মকর্তা রাজধানীর ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কুদ্দুস শিকদার বলেন, তারা অনেকেই বিসিএসে চাকরির পছন্দ তালিকার প্রথমে রেখেই শিক্ষা ক্যাডারে এসেছিলেন। শিক্ষকতাকে পেশা নয়, ব্রত হিসেবে নিতে চেয়েছেন তাদের কেউ কেউ। কিন্তু ক্রমাগত বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, বৈষম্য তাদের ক্যাডারের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহাকে হ্রাস করে দিচ্ছে।

বরিশাল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবিনুল আহসান বলেন, নিয়মিত পদোন্নতি চাকরির একটি নিয়মিত, স্বাভাবিক, রুটিন ওয়ার্ক হলেও, শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি বরাবরই হয়েছে ব্যতিক্রমী ধারায়। তিনি বলেন, অন্য ক্যাডারের সঙ্গে বিসিএস প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারের বৈষম্য দীর্ঘ দিন আলোচিত হয়েছে। বৈষম্য হ্রাসের জন্য অষ্টম পে স্কেল বাস্তবায়নের আগে কর্মবিরতিও করেছিলেন অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডার এমন একটি বিচিত্র ক্যাডার, যেখানে নিজ ক্যাডারের মধ্যেও বৈষম্যের অন্ত নেই।

এ কর্মকর্তা বলেন, ১৬তম বিসিএসে যোগদান করে যেখানে মৃত্তিকা বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, সেখানে একই বিসিএসের দর্শন বিভাগের একজন শিক্ষক রয়ে গেছেন সহকারী অধ্যাপক পদেই। চাকরির পাঁচ বছরপূর্তিতে যেখানে ৩০তম বিসিএসের বাংলার একজন প্রভাষক হয়েছেন সহকারী অধ্যাপক, সেখানে ২৪তম বিসিএসের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন শিক্ষক প্রমোশনের সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, পদস্বল্পতার অজুহাতে প্রভাষকই থেকে যাচ্ছেন।

এই ক্যাডারে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বাতিল করার পর আন্তঃক্যাডার ও অন্তঃক্যাডার বৈষম্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি পাঁচ বছর চাকরিপূর্তিতে প্রশাসন ক্যাডারসহ অন্য কিছু ক্যাডার যেমন পুলিশ, পররাষ্ট্র, কৃষিতে ৩১তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সমাপ্তি, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও অন্যান্য যোগ্যতা অর্জন করেও পদোন্নতির বিবেচনায় আসছেন না শিক্ষা ক্যাডারের ৩১তম বিসিএসের ক্যাডার কর্মকর্তারা।

ফরিদপুরের সদরপুর সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ওয়াদুদ খান বলেন, একজন পূর্ণ অধ্যাপকের বেতন গ্রেড বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে তৃতীয়, কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে সেটি চতুর্থ। এখানেও বৈষম্য। কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন কিংবা মাউশি, নায়েমসহ সব অধিদপ্তরে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা মানা হচ্ছে না।

জানা গেছে, পদোন্নতি ছাড়াও শিক্ষা ক্যাডারে নিয়মিত বদলি নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। কেউ কেউ রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে চাকরি করছেন যুগ যুগ; আবার কেউ মফস্বলেই পড়ে আছেন। নীতিমালায় তিন বছর পরপর বদলির কথা বলা হলেও এর প্রয়োগ ততটা চোখে পড়ে না। বরং অভিযোগই বেশি শোনা যায়।

পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম বলেন, পদে পদে বঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের বঞ্চনা হ্রাসে সরকার বেশ কিছু পরামর্শ বিবেচনায় নিতে পারে। যেমন অন্যান্য ক্যাডারের মতো শিক্ষা ক্যাডারেও ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি চালু করা, প্রতি বছর দুইবার বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা করা, পদোন্নতিযোগ্য সবাইকে পদোন্নতি দেওয়া, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে অনার্স, মাস্টার্স কলেজে পদায়ন, কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে বা কলেজে বা প্রশাসনিক পদে তিন বছরের বেশি থাকতে না দেওয়া এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং জনস্বার্থে বদলির ব্যবস্থা করা।

২৮৩ বেসরকারি কলেজ সরকারীকরণ ও এসব কলেজে কর্মরত প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষককে আত্তীকরণ না করতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাবি রয়েছে। তারা বেসরকারি কলেজ থেকে আসা নতুনদের ‘নন-ক্যাডার’ পদে দেখতে চান।

শিক্ষা বিভাগে সরকারিভাবে ‘ভ্যাকেশন’ ডিপার্টমেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা সরকারি কলেজে সরাসরি শিক্ষকতায় সম্পৃক্ত রয়েছেন, তারা অর্জিত ছুটির আর্থিক সুবিধা থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছেন। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানা বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের যারা প্রেষণে অথবা বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে (অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ) রয়েছেন তারা প্রতি ১১ দিনে একদিন পূর্ণগড় বেতনে অর্জিত ছুটি পান। অথচ ক্লাসরুম শিক্ষকরা তা পান না। এতে অবসরের সময়ে তারা গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই ক্ষতির কথা জাতীয় শিক্ষানীতি ও সরকারি অন্যান্য নথিপত্রেও স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ৫ম গ্রেড থেকে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে যান। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে জাতীয় বেতন স্কেলের ৪র্থ গ্রেডে যান। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে অষ্টম জাতীয় স্কেল কার্যকরের আগে চতুর্থ গ্রেড পাওয়া শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা সিলেকশন গ্রেড পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে যেতে পারতেন। সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় তাদের সেই পথও এখন রুদ্ধ।

বেতন বৈষম্য নিরসনে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি এই ক্যাডারে সিলেকশন গ্রেড দিতে রাজি হলেও আজও তা কার্যকর হয়নি। এই ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। পদটি দ্বিতীয় গ্রেডের। প্রধানমন্ত্রী এ পদটিতে প্রথম গ্রেডে উন্নীতের সিদ্ধান্ত দিলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া অধ্যাপক পদে কর্মরতদের শতভাগ তৃতীয় গ্রেডে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তও থমকে আছে। এই ক্যাডারে দ্বিতীয় গ্রেডে আরও সাতটি পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন।

আলাপকালে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম গ্রেডের পদ ১টি, দ্বিতীয় গ্রেডের সাতটিসহ মোট সাড়ে ১২ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব সরকার বর্তমানে বিবেচনা করছে। যেটুকু না হলেই নয়, সেটুকুই আমরা কেবল প্রস্তাব দিয়েছি সরকারের কাছে। নতুন পদ সৃষ্টি হলে এ ক্যাডারের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

নিজ ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদে থাকলেও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষদের জন্য কোনো যানবাহন নেই। অথচ বেতন স্কেলে অনেক পেছনে থাকা বিভিন্ন ক্যাডারের জুনিয়র কর্মকর্তারা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষরা বলেন, সরকার যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের গাড়ি কেনার ঋণ দিচ্ছে। এ সুযোগ তাদেরও দেওয়া উচিত।

সার্বিক বিষয়ে এই ক্যাডারের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি’র সভাপতি ও রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আইকে সেলিম উল্লাহ খন্দকার বলেন, আসলে এই ক্যাডারের সমস্যা মানে হলো জাতীয়ভাবে শিক্ষার সমস্যা। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, নতুন পদ সৃষ্টি, ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারলে এই ক্যাডারের পাশাপাশি দেশের শিক্ষা খাতেরই উন্নয়ন হবে। সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত