প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

১৯৩ দেশই ভ্রমণ করবেন নাজমুন

ডেস্ক রিপোর্ট : লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর পথে এখনও হেঁটে চলেছেন নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। বিশ্বের বহু পথ-প্রান্তরে তার পায়ের চিহ্ন ফেলেছেন তিনি গত ১৭ বছরে। ভ্রমণ করেছেন ১০৮টি দেশ। এবার তিনি পর্যায়ক্রমে জাতিসংঘ স্বীকৃত ১৯৩টি দেশই স্পর্শ করে বিশ্বকে জয় করার পণ করেছেন। একজন নারী পরিব্রাজক হিসেবে শতাধিক দেশ ঘুরে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। সম্মাননাসহ পেয়েছেন ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি। হৃদয়ে তার বাংলাদেশ, হাতে লাল-সবুজ পতাকা। তিনি যেন বিশ্বে এক শান্তির পথচারী- তারুণ্যের পথিকৃৎ।

সম্প্রতি নাজমুন ঘুরে এসেছেন মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ- জর্জিয়া, আর্মেনিয়া কাজাখস্তান ও কিরঘিজস্তান। এর ফলে তার ভ্রমণ করা দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। তিনি জানান, খুব দ্রুতই বিশ্বজয়ের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন তিনি। তার মতে, ‘স্বপ্ন দেখলে আর সে লক্ষ্যে কাজ করলে সবই সম্ভব।’ আগামী অক্টোবরে তিনি যাবেন আজারবাইজানের বাকু শহরে। বাকু থেকে কাস্পিয়ান সমুদ্রের কোল ঘেঁষে সড়কপথে যাত্রা করবেন ইরানের রাজধানী তেহরান ও সীমান্তবর্তী মাশহাদ শহরের দিকে। এর পর যাবেন আফগানিস্তানের হেরাত শহরে।

তার পর যাবেন তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও চীনে। এর পর আফ্রিকার ভ্রমণ না-করা দেশগুলো ঘুরে এশিয়ার সিল্ক্ক রোড, পামির মালভূমি, কারাকোরাম পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে তিব্বতের দিকে যাত্রা করবেন। এ পথে তিনি আফ্রিকার ভাস্কো দা গামা রুট দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন থেকে মিসরের কায়রো পর্যন্ত আফ্রিকার বাকি দেশগুলোতে যাবেন। কেপটাউন থেকে যাত্রা করবেন নামিবিয়া হয়ে। এভাবে নাজমুন বাংলাদেশকে অদম্য স্পৃহার দেশ হিসেবে তুলে ধরবেন পৃথিবীর মানুষের কাছে।

নাজমুনের মতো নারী তো বটেই, পুরুষও বাংলাদেশে বিরল- যিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়েছেন একা একা; দেশের পতাকা হাতে। দিন-রাতের তোয়াক্কা না করে পর্বত, সমুদ্রের তলদেশ, দুর্গম জঙ্গল, বন্যপ্রাণীময় পাহাড় কিংবা অজানা আদিবাসীদের এলাকা- কোথাও যেতে ভয় পাননি তিনি। মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও পিছিয়ে আসেননি। বন্যপ্রাণীতে ভরা জঙ্গলে রাত কাটিয়েছেন, তীব্র ক্ষুধায় গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, মৃত্যুর আশঙ্কা থাকার পরও ছুটেছেন উচ্চ পর্বতশৃঙ্গের দিকে। অনেক পাহাড়ি অঞ্চলেই তাকে থাকতে হয়েছে না খেয়ে।

পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য বহু প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন নাজমুন। ১৪ হাজার ২শ’ ফুট উচ্চতায় পেরুর রেইনবো মাউন্টেনে অভিযাত্রার সময় আল্টিটিউড সমস্যায় মৃত্যুর দুয়ারে গিয়েও বেঁচে যান নাজমুন। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের সমুদ্রে স্নোর্কেলিংয়ের সময় মুখ থেকে পাইপ ছিঁড়ে যায় তার। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পেটে যাওয়ার তিক্ততা টের পান তিনি। কিউবায় আখের রস খেয়ে দিনের পর দিন কাটান তিনি। আমেরিকার ইয়েলো স্টোনের জঙ্গলে প্রচণ্ড শীতে দুটো সোয়েটার ও দুটো জ্যাকেট পরে তাঁবুতে ঘুমানো, আইসল্যান্ডের ল্যান্ড মান্নালুগারের উঁচু পাথরের উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া, বলিভিয়ার দ্বীপে অন্ধকার রাতে পথ খুঁজে বেড়ানো, মধ্যরাতে ইন্দোনেশীয় ইজেন কার্টারের ভয়ঙ্কর ভলকানিক অভিযানে যাওয়ার মতো দুর্দান্ত সব অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

অচেনা শহরের মধ্যে হারিয়ে যেতে নাজমুন ভালোবাসেন। ভালোবাসেন অচেনাকে চিনে নিতে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নাজমুন তার ভালো লাগা দেশগুলোর নাম জানান। তিনি বলেন, তার দেখা দেশগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ডই সেরা। এ ছাড়া জাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত, সোয়াজিল্যান্ডের কালচারাল ভিলেজ, লেসোথোর মাউন্ট নাইট, দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কনসো, আরবামিঞ্চ, উগান্ডার সোর্স অব নাইল রিভার, কেনিয়ার লেক নাকুরু, রুয়ান্ডার কিগালি শহর, বতসোয়ানার কাসানে আর চবে রিভার, দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়াইল্ড নেচার, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের অনেক দেশই ভালো লেগেছে তার। কিউবার হাভানা শহরের দেয়ালে দেয়ালে চমৎকার সব গ্রাফিত্তি, শহরের কোণে কোণে মিউজিক কালচার, জ্যামাইকার বব মাল্টি টাউন, ডোমিনিকান রিপাবলিকের সাওনা দ্বীপ, আর্জেন্টিনার আন্দেস্‌ মাউন্টেন, উরুগুয়ের পুন্টা ডেল এস্তা, ব্রাজিলের ফোজ ডু ইগুয়াচু জলপ্রপাত, পেরুর মাচ্চুপিচ্চু, রেইনবো মাউন্টেন, চিলির মুন ভ্যালি দারুণ লেগেছে তার। আমেরিকার ওল্ড অ্যান্ড ফেইথফুল ভলকানিক গেইসার বেসিন, সুইজারল্যান্ডের আল্‌প্স পর্বতমালা, অস্ট্রেলিয়ার হ্যাভেন বিচ, নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট কুক, গ্রিসের সান্তোরিনি আইল্যান্ড, স্পেনের পালমা থেকে ভ্যালেন্সিয়া যাত্রা, ইতালির রোম শহরের সৌন্দর্য, জর্ডানের পেট্রা, আবুধাবির শেখ জায়েদ মসজিদসহ আরও অনেক কিছু দেখার সুযোগ তার হয়েছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই কোনো না কোনো সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। দেশ ভ্রমণ প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এনে দেয়।

ভ্রমণপিয়াসী এই মানুষটির পরিভ্রমণের শুরু ২০০০ সালে, ভারতের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মধ্যে দিয়ে। সে সময় তিনি ভারতের ভূপালের পাঁচমারিতে যান, যা ছিল তার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। বিশ্বের ৮০টি দেশের ছেলেমেয়ের সামনে তখন তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন- সেই থেকে দেশের পতাকা নিয়ে পৃথিবীর পথে পথে ছুটে চলেছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে সর্বশেষ ৯৩তম দেশ হিসেবে ভ্রমণ করেন নিউজিল্যান্ড। ২০১৮ সালের ১ জুন তিনি শততম দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন আফ্রিকার জিম্বাবুয়ে পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের পথিকৃৎ এ পরিব্রাজকের জন্ম ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামে। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ আমিন ২০১০ সালে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। মা তাহেরা আমিন। তিন ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে নাজমুন নাহার সবার ছোট। দালাল বাজার নবীন কিশোর (এনকে) উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সালে স্টার মার্কসহ এসএসসি এবং লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন। ২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি সুইডেন যান। সেখানে লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত